বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিশ্বাস তাঁর না হওয়ারই কথা। কারণ, সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় তাঁর নাম আগে কখনোই আলোচনায় আসেনি। এবারও নয়। অনেক বছর যাবৎই এমন কাণ্ড ঘটে আসছে। আগে সংক্ষিপ্ত তালিকায় সম্ভাব্য বিজয়ীদের নাম আসত আলোচনায়। চলত ব্যাপক কানাঘুষা। মিডিয়া সরব হয়ে উঠত আলোচনায়। প্রতিবছর এ তালিকায় যুক্ত হতো নতুন নতুন নাম। এ তালিকা থেকেই এদের পরিচিতির বিস্তার ঘটত সীমাবদ্ধ গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর বলয়ে। পরিচিতির ব্যাপ্তি বাড়ায় তাঁদের বই বিক্রি হতো ব্যাপক। মিডিয়াজুড়ে তাঁরা থাকতেন সরব।

কিন্তু এক যুগের বেশি সময় ধরে নির্ধারিত সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে কারও ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি, যা বোদ্ধামহলে ব্যাপক হতাশা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর ফলে বিশেষ করে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের ব্যাপারে কৌতূহলী মানুষ বা সাহিত্যমোদিরা এখন প্রায় নিস্পৃহ। এ নিয়ে তেমন প্রাণচাঞ্চল্য আর দেখা যায় না আগের মতো।
এ ক্ষেত্রে মানুষের বারবার আশাভঙ্গ হওয়ার কারণটিই মুখ্য। এর একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে, জার্মান লেখক গুন্টার গ্রাস (১৯২৭-২০১৫) বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম বিস্তৃত মাত্রায় সমাদৃত হলেও নোবেল পেয়েছেন কাঙ্ক্ষিত সময়ের প্রায় তিন দশক পর ১৯৯৯ সালে। যখন তাঁর এই পুরস্কারপ্রাপ্তি ঘটে, তখন আমার এক ল্যাটিন তরুণ সহকর্মী বলছিলেন, তাঁকে কি দ্বিতীয়বার এ পুরস্কার দেওয়া হলো?

আমার ওই সহকর্মীর ধারণা ছিল, গুন্টার হয়তো আগেও এ পুরস্কার জিতেছেন। শেষে তাঁর প্রশ্ন ছিল, ‘আমরা পেরুতে তাঁর নাম শুনেই বড় হয়েছি। সেখানে তিনি ভীষণ জনপ্রিয়। অসাধারণ তাঁর লেখা। আমি তাঁর গুণগ্রাহী পাঠক। তাহলে তাঁকে এত বছর এ পুরস্কার দেওয়া হয়নি কেন?’ এ থেকেই বোঝা যায়, প্রত্যাশার জায়গায় সুইডিশ একাডেমি বহু ক্ষেত্রে, বহুবার ছাই ঢেলে দিয়েছে। আবার ছাইয়ের জায়গায় সোনাও ফলিয়েছে সুইডিশ একাডেমি। এই যেমন সহকর্মীর দেশ পেরুর লেখক মারিও ভারগোস লোসা (জন্ম ১৯২৬) অপ্রত্যাশিতভাবে ২০১০ সালে সাহিত্যে নোবেল জয় করে তাঁকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন! প্রায় দুই যুগ ধরেই এমনটি চলে আসছে অখ্যাত ও অনালোচিত লেখকদের নিয়ে।

গত এক যুগের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম দেখলে বোঝা যাবে, কীভাবে অপরিচিত ও অপ্রত্যাশিত লেখকদের হাতে এ পুরস্কার চলে গেছে, যাঁদের নাম কখনোই আলোচনায় ছিল না বললেই চলে। অন্তত নোবেল জয়ের ক্ষেত্রে। যেমন লুইস গ্লুক (২০২০, যুক্তরাষ্ট্র), পিটার হ্যান্ডকে (২০১৯, অস্ট্রিয়া), ওলগা তোকারজুক (২০১৮, পোল্যান্ড), কাজুও ইশিমুরা (২০১৭, জাপান-যুক্তরাজ্য), সভেতলানা আলেক্সিভিচ (২০১৫, সোভিয়েত ইউনিয়ন), প্যাটরিক মোদিয়ানো (২০০১, ফ্রান্স), অ্যালিস মুনরো (২০১৩, কানাডা), মো ইয়ান (২০১২, চীন), মারিও ভারগোস লোসা (২০১০, পেরু), হিয়ারটা মুলার (২০০৯, জার্মানি), জ্যা মারি গুস্তাভ লি (২০০৮, ফ্রান্স), ওরহান পামুক (২০০৬, তুরস্ক), হ্যারল্ড পিন্টার (২০০৫, যুক্তরাজ্য), এলফ্রিয়েদা ইয়েলেনিক (২০০৪, জার্মানি)। এঁদের নামে পুরস্কার ঘোষিত হওয়ার পর সাহিত্যমোদি মহল যেমন বিস্মিত হয়েছে, তেমনি হোঁচটও খেয়েছে বিজলি চমকানোর মতো করে।

অপর দিকে অনালোচিত যাঁদের ভাগ্যে এ নোবেলের শিকে ছিঁড়েছে, তাঁরাও নোবেল প্রাপ্তির ঘোষণা শোনার পর বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছেন, ‘ঠাট্টা করছেন না তো?’
ঠাট্টা কেন হবে? সুইডিশ একাডেমি আবদুলরাজাক গুরনাহকে যোগ্য মনে করেই এ পুরস্কার দিয়েছে। তিনি তাঁর বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রখর পর্যবেক্ষণের মধ্য নিয়ে উপনিবেশবাদ ও তার দ্বারা প্রভাবিত মানুষের শিকড় থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার যে বাস্তবতা, নিপুণ শিল্পীর মতো চিত্রিত করেছেন সাহিত্যকর্মে, নিরলস অধ্যবসায় ও সাধনার ফসলই ঘরে তুলেছেন নোবেল জয় করে।

আরেকটি বিষয় এখানে চলে আসে পাঠকমহলে, যাঁরা ব্যাপক পরিচিত ও জনপ্রিয় লেখক হিসেবে সমাদৃত, তাঁদের সাহিত্যকর্ম পাঠককে এতটাই মোহাচ্ছন্ন করে রাখে যে এদের ঈপ্সিত কেউ কাঙ্ক্ষিত সময়ে নোবেল থেকে বঞ্চিত হলে লেখকের প্রতি একধরনের অবিচার বলেই মনে করেন তারাঁ। দেখা দেয় অসন্তোষ, সমালোচনা ও নানান বিতর্ক। ফলে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও তুমুল সমালোচনার শিকার হতে হয় সুইডিশ একাডেমিকে। প্রশ্ন আসে নানান আঙ্গিক থেকে পক্ষপাতদুষ্টতার!

ফলে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত বা অচেনা-অজানা লেখক পুরস্কৃত হলে অভিমানী অনেক পাঠকই তাঁর বই পড়ার ব্যাপারে ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠেন না। যেমনটি হয় গুন্টার গ্রাস কিংবা গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মারকেজের (১৯৮২, শতবর্ষের নির্জনতা) ক্ষেত্রে। অথবা তাঁদের মতো গ্রহণযোগ্য মাত্রার আলোচিত ও পরিচিত লেখকের নোবেল প্রাপ্তির পর তাঁদের বইয়ের চাহিদা রাতারাতি গগনচুম্বী হয়ে পড়ায় পাঠকের চাহিদা দ্রুত পূরণ করতে প্রকাশকেরা হয়ে পড়েন গলদঘর্ম। বাজারের চাপ সামাল দিতে প্রকাশকদের ওঠে নাভিশ্বাস। একদিকে নোবেলে আকর্ষণীয় অর্থমূল্য, অপর দিকে পৃথিবীব্যাপী বইয়ের রমরমা বিপণন লেখকের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেয়, আলাদিনের প্রদীপ প্রাপ্তির মতো।

শুধু কি তা–ই, বই বিক্রি করে প্রকাশক প্রতিষ্ঠান যেন রাতারাতি হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বনামখ্যাত এবং সাফল্যের পালকধারী, তেমনই রমরমা ব্যবসা ও অর্থ–বিত্তের বৈভবে বিত্তশালী। কোনো প্রকাশক প্রতিষ্ঠানের একটি বইয়ের ভাগ্যে নোবেলের শিকে ছিঁড়লে গগনচুম্বী হয়ে ওঠে তার নাম-ধাম। পান প্রেস্টিজিয়াস প্রতিষ্ঠানের অভিজাত মর্যাদা। নোবেলপ্রত্যাশী লেখকদের বই প্রকাশনা বা সুইডিশ ভাষায় অনুবাদকর্ম এবং বিপণনের জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় এদের পেছনে। আর তাই প্রতিটি মানসম্পন্ন প্রকাশকের স্বপ্নই থাকে, কোনো হবু নোবেল লরিয়েটের বই প্রকাশনার ভাগ্য অর্জনের।

অপরদিকে অনেক নোবেল লরিয়েটের ক্ষেত্রে ভাগ্য তেমন সুপ্রসন্ন থাকে না। হঠাৎ জ্বলে ওঠা প্রদীপ বা বিজলি চমকানোর মতো চমকে উঠেই আবার দপ করে নিভে যান পাদপ্রদীপের নিচে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই চলে যান আলোচনা ও বিস্মৃতির আড়ালে। এ প্রতিবেদনে যাঁদের নাম আলোচিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে সিংহভাগ লরিয়েট বা তাঁদের সাহিত্যকর্ম আজ নেই কোনো আলোচনায় বা খবরে, …সেই ‘কফি হাউসের আড্ডাটা আজ আর নেই’ নস্টালজিক গানটির মতোই। নোবেল প্রাপ্তির কিছুদিনের মধ্যেই পাঠকের কৌতূহল স্তিমিত হয়ে এলে বইয়ের কাটতিও আর থাকে না অথবা হয় নিম্নগামী। এর সঙ্গে সঙ্গে এই নোবেল লরিয়েটরা হারিয়ে যান বিস্মৃতির অতলে। অনেক নোবেল লরিয়েটই মারা গেছেন দারুণ অর্থকষ্টে।

হয়তো এ অভিব্যক্তি থেকেই আবদুলরাজাক গুরনাহকে যখন প্রশ্ন করা হলো, ‘এত অর্থ দিয়ে কী করবেন আপনি?’ জবাবে গুরনাহ বলেন, ‘জানি না। তবে কে জানে, হয়তো অন্য কিছুতে নিমগ্ন হয়ে পড়ব। হতে পারি রেসিং কারের চালক!’

হ্যাঁ, তা তিনি করতেই পারেন। তিনি ক্যান্টাবারির কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিয়েছেন। তাঁর অবসর কাটে লেখালেখির পাশাপাশি বাগান ও গাছগাছালির পরিচর্যায়, হেঁশেলে রান্নার কাজে, পরিবার, স্বজন, পরিজনের সঙ্গে কথা বলে এবং ক্রিকেট খেলা দেখে। এ নিয়েই তাঁর প্রতিদিনের কঠিন রুটিন। তিনি প্রায়ই ফিরে যান তাঁর শিকড়ের কাছে অতীত রোমন্থনে, পেয়ে বসে নস্টালজিয়া।

কে ভোলে আত্মপরিচয় ও শিকড়ের কথা! ৪৮ সালে ভারত মহাসাগর পরিবেষ্টিত তানজানিয়ার একটি ছোট্ট স্বায়ত্তশাসিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপ জানজিবারে জন্ম নেওয়া গুরনাহর উপনিবেশবাদের কবলে পড়া নিয়তি তাঁকে শরণার্থী হিসেবে টেনে নিয়ে যায় ইংল্যান্ডে ষাট দশকের শেষে। সেখানেই জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত ও নির্মম বাস্তবতার জীবনদর্শন, অভিজ্ঞতা তাঁকে লেখক হতে উদ্বুদ্ধ করে ২১ বছর বয়সে।

বর্তমান ৭৩ বছর বয়সী আবদুলরাজাক গুরনাহর জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। বর্তমানে অবসরে। ওলে সোয়েনকা, নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গো, সালমান রুশদির মতো উত্তর ঔপনিবেশিক লেখকদের লেখা তিনি পাঠদানের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

এ বয়সের পরিসরে তিনি লিখেছেন অনেক ছোট গল্প, রচনাসম্ভার ও ১০টি উপন্যাস। চোখে পড়া এবং হৃদয়কে নাড়া দেওয়ার মতো বড় ধরনের কাজগুলোই তিনি করেছেন এসব উপন্যাসে, গভীর অন্বেষা, অনুসন্ধিৎসা ও মননশীলতা দিয়ে। এ কারণেই তাঁর এসব সৃষ্টিশীল মৌলিক সাহিত্যকর্ম স্থান করে নিয়েছে একেকটি মাস্টারপিস হিসেবে। তারপরও বড় ধরনের কোনো পুরস্কার জোটেনি তাঁর কপালে। অনেকবার সংক্ষিপ্ত তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও ইংল্যান্ডের মর্যাদাপূর্ণ বুকার পুরস্কার চলে গেছে তাঁর নাগালের বাইরে।

ভাগ্য এত দিন সুপ্রসন্ন না হলেও বলা যায়, জহুরি জহুর চেনে। তাঁর প্রাপ্য এবং স্বীকৃত মূল্যটা তিনি পেয়ে গেছেন দূরযাত্রার শেষ প্রান্তে এসে। আর তাই তাঁকে পুরস্কৃত করতে গিয়ে নোবেল কমিটি বলেছে, গুরনাহ তাঁর উপন্যাসে শরণার্থী জীবনের টানাপোড়েন ও ঔপনিবেশিকতার প্রভাব সহানুভূতিশীল চিত্তে আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন নিখুঁতভাবে।

উপনিবেশবাদের খড়্গে পড়ে নিজের সংস্কৃতি ও মহাদেশীয় আপন বলয় থেকে শিকড়ছিন্ন হয়ে উপসাগরে শরণার্থী নিয়তির ঘাত-প্রতিঘাতপূর্ণ জীবনের বাস্তবতাকে যেভাবে মার্জিত দৃষ্টিকোণ থেকে সহানুভূতির মধ্য দিয়ে অনন্য রূপে উপস্থাপন করেছেন, তাঁর সেই অনবদ্য কর্মের ফলই নোবেল পুরস্কার।

গুরনাহর মাতৃভাষা সোয়াহিলি হলেও সাহিত্যচর্চার জন্য ইংরেজি ভাষাকেই বেছে নিয়েছেন তিনি, নিজের স্বাচ্ছন্দ্যবোধের কারণে। ২১ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে শরণার্থী জীবনে তিনি ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা শুরু করেন। মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা না করার বিষয়ে তিনি বলেন, মাতৃভাষা আমার জন্য তেমন সহজগামী ও উপযোগী মনে হয়নি। ইংরেজির ওপর অনায়াস দখল এবং এর সর্বজনীনতা আমাকে টেনে নিয়ে যায় ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়া এবং তার প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে। এ ছাড়া কোনো লেখক কোন ভাষায় লিখবেন, তা নিয়ে তো কোনো আরোপিত বাধ্যবাধকতা নেই। লেখক যেভাবে অনুভব এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তিনি তো সে ভাষায়ই লিখবেন, এটাই স্বাভাবিক এবং এতে দোষের কিছু নেই।

লেখালেখির জন্য আরবি ও ফারসি কবিতা, বিশেষ করে ‘দ্য অ্যারাবিয়ান নাইটস’ তাঁকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করলেও শেকস্‌পিয়ারের প্রতি তিনি ছিলেন ভীষণভাবে আকৃষ্ট। ২০০১ সালে নোবেল বিজয়ী টোবাগো-ত্রিনিদাদের ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইংল্যান্ডবাসী লেখক ভি এস নাইপলের (১৯৩২-২০১৮) সাহিত্যকর্ম তাঁকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল।
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় গুরনাহর প্রথম উপন্যাস ‘মেমোরি অব ডিপারচার’। তখন তাঁর বয়স ৪০ বছর। তিনি দীর্ঘ সময় নিয়ে উপন্যাসটি লেখেন। প্রকাশনার জন্য তা বেশ কয়েকবার প্রত্যাখ্যাত হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যন্ত্রণা দেওয়ার মতো বহু বিষয় ছিল আমার, যা লেখার দুর্নিবার তাগিদ ছিল মনে। জানতাম না এই যন্ত্রণা কীভাবে প্রকাশ করব! তবে আমি আমার ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের গবেষণার অভিসন্দর্ভে বিষয়টিকে তুলে ধরি এবং অবশেষে তা বই আকারে প্রকাশ করি। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয় ‘প্যারাডাইস’ (১৯৯৪), ‘অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স’ (১৯৯৬), ‘বাই দ্য সি (২০০১), ‘ডিজারশন’ (২০০৫), ‘দ্য লাস্ট গিফট’ (২০১১)–সহ অন্যান্য। গুরনাহর যন্ত্রণার বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘কোনটি আমার যন্ত্রণার বিষয় নয় বলুন? আমার যখন ১৮ বছর বয়স, তখন আমি এক বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সমাজব্যবস্থার এক দেশে শরণার্থী জীবন যাপন করছি শিক্ষা সম্পন্ন করার দুশ্চিন্তা এবং অনিশ্চয়তা নিয়ে। যাঁদের ফেলে এসেছি, সারাক্ষণ ভাবতাম তাঁদের নিয়ে। আর ভাবতাম, আমি কি কাজটা ঠিক করেছি?’

গুরনাহর চতুর্থ উপন্যাস ‘প্যারাডাইস অ্যান্ড ডিজারশন’ দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন ১৯৯৪ সালে। উনিশ শতকের শুরুতে পূর্ব এবং মধ্য আফ্রিকার পটভূমিতে তৈরি এর কাহিনি। যুবক ইউসুফের ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত ক্যারাভ্যান দিয়ে গল্পের শুরু।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় কীভাবে জার্মান ঔপনিবেশিক শক্তির সেনারা আফ্রিকানদের অমানুষিকভাবে যুদ্ধের কাজে ব্যবহারে বাধ্য করেছে, তা বর্ণনা করেছেন তিনি এই উপন্যাসে। তিনি বিশেষভাবে শিকড়ত্যাগী শরণার্থী মানুষের জীবনযন্ত্রণা, নিয়তি এবং সমাজে তারা কেমন নিগ্রহের শিকার, তারই চিত্র তুলে ধরেছেন দক্ষ চিত্রকরের মতো। সংবেদনশীল ভাষায় বলেছেন, সমাজের কিছু ক্ষমতাধর মানুষ ও রাষ্ট্রের দুর্দমনীয় লোভ ও লালসা সম্পর্কে, যাদের লোভের কারণে সমাজে এত বৈষম্য ও অনাচারের সৃষ্টি। এ লোভ না থাকলে সমাজে এমন বৈষম্য থাকত না। যারা বঞ্চিত, তাদের শোষক ও সর্বময় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর অনেক কিছুই দেওয়ার আছে। কিন্তু তারা তা করছে না।

১৯৮৬ সালে ওলে সোয়েনকার পর গুরনাহই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান, যিনি সাহিত্যে নোবেল পেলেন। তাঁর আশাবাদ, এ পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে শরণার্থীসংকট এবং রাহুগ্রস্থ উপনিবেশবাদের নিষ্ঠুর বাস্তবতা হয়তো মানুষকে আলোড়িত করবে তাদের দেখা ক্ষতগুলো নিয়ে আলোচনা করতে।

গুরনাহর সর্বশেষ উপন্যাস ‘আফটারলিভস’ বের হয় ২০২০ সালে। এর পটভূমি রচিত হয় উনিশ শতকের তানজানিয়ায় জার্মান ঔপনিবেশিক শাসনের ওপর। উপন্যাস লেখা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটি একটি কঠিন ও ব্যাপক পরিসরের কাজ। অনেক খাটতে হয়। আমি তো দশক ধরে এই কাজ নিয়ে পড়ে আছি। তাই একসময় সবই গা সওয়া হয়ে যায়। অনেক বিরক্তি ও তিক্ততা জন্মায়। তবে তার প্রভাব লেখায় এড়িয়ে যেতে হয়।’
*লেখক: সুইডেন প্রবাসী

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন