default-image

জাতিসংঘের এক তথ্য অনুসারে ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে ২২ কোটি মানুষ অভিবাসনের বিভিন্ন মাধ্যমে পৃথিবীর বহু দেশে অভিবাসন করেছেন, যার মধ্যে অভিবাসনের একটি অন্যতম পথ হচ্ছে ব্যবসায়িক অভিবাসন, যা নতুন এক দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে হয়ে থাকে। অভিবাসনের নতুন ঠিকানার দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা।

অস্ট্রেলিয়ান অভিবাসন পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৮-১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ১০ হাজার ৫৩৪ জন মানুষ অভিবাসন করেছেন যুক্তরাজ্য থেকে, যা অস্ট্রেলিয়ায় আগত অভিবাসন তালিকায় তৃতীয় দেশ। কানাডার পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৬ষ্ঠ দেশ হিসেবে ৫ হাজার ৬৬৩ জন অভিবাসী এসেছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং ১০ম দেশ হিসেবে ১০ হাজার ৯০৭ জন অভিবাসী এসেছেন যুক্তরাজ্য থেকে।

অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় ব্যবসায়িক অভিবাসনের জন্য আবেদনকারীদের মধ্যে কোটিপতি উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীরা অন্তর্ভুক্ত, যাঁরা উন্নত বিশ্বের এসব দেশে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে অভিবাসন করে ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক সফলতা এনেছেন। উন্নত দেশগুলো থেকে এ জাতীয় ব্যবসায়িক অভিবাসনও যে হচ্ছে তা অবাক করার মতো নয় কি?

এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা দেখতে পাই, বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশ্বায়নের যে ক্রমশ ধারাবাহিকতা হয়ে আসছে, তাতে ব্যক্তিগত ও পেশাদার কারণে কোটিপতি উদ্যোক্তারা নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সীমানা প্রসারিত করে নিতে চাচ্ছেন।

ইআইইউ (ইকনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) এবং আরবিসি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের গবেষণায় দেখা যায় যে, ৮৮% কোটিপতি উদ্যোক্তা অভিবাসনের জন্য জীবনের গুনগতমান বা লাইফস্টাইলকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন আর ৭৯% ব্যবসায়ী অভিবাসনকে তাঁদের পারিবারিক প্রয়োজনীয়তার কারণ বলে উল্লেখ করছেন। এ ছাড়া অনেক কোটিপতি উদ্যোক্তা তাঁদের গোপনীয়তা বা ব্যক্তিগত সুরক্ষার উদ্বেগকেও একটি বড় কারণ বলে মনে করেন।

বিজ্ঞাপন

একই গবেষণায় আরও দেখা যায়, উচ্চবিত্ত অভিবাসীদের ৬০% তাঁদের বেশির ভাগ সম্পদ নতুন অভিবাসিত দেশেই তৈরি করেছেন। এর মধ্যে ৩২% ব্যবসায়ী তাঁদের নব্যনির্মিত সম্পদ নিজ দেশেই পুনরায় বিনিয়োগ করেন। এ ছাড়া এই অভিবাসন নেওয়া কোটিপতি উদ্যোক্তারা তাঁদের নিজ দেশের কোটিপতি উদ্যোক্তাদের তুলনায় অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকখানি এগিয়ে আছেন। মজার বিষয় হলো, গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী নিজ দেশের কোনো প্রকার উচ্চ আয়কর, অভিবাসনের কারণ হিসেবে দেখা যায়নি।

default-image

ওপরের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, এসব কোটিপতি উদ্যোক্তার শীর্ষ গন্তব্য হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, যা পরিবারসহ বসবাসের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ একটি দেশ। পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতিকে বৈশ্বিকভাবে অন্যতম শক্তিশালী হিসেবে গণ্য করা হয়।

এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় কোনো উত্তরাধিকার শুল্ক নেই, যা এ জাতীয় উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের তুলনায় অষ্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যসেবায় কম ব্যয় অভিবাসনের ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়া সপ্তম বৃহত্তম ধনী দেশ হওয়ার ক্ষেত্রে ফ্রান্স এবং কানাডার চেয়ে এগিয়ে যাওয়াটা কোটিপতি উদ্যোক্তাদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক অভিবাসনের দৃশ্যপটে বাংলাদেশ
তুলনা করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায়িক অভিবাসন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় কম। অথচ ব্যবসায়িক অভিবাসন এবং বিনিয়োগ যদি সঠিকভাবে করা যায়, তাহলে এর সুপ্রভাব ও সুবিধাগুলো অভিবাসিত দেশের পাশাপাশি নিজ জন্মভূমির দিকেও বেশ ইতিবাচক হয়ে উঠতে পারে।

সাম্প্রতিক ‘ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট লেনদেন (ওভারসিজ ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট) বিধি, ২০২০’ খসড়া অনুসারে, বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিদেশি দেশগুলোতে বিনিয়োগ করতে উত্সাহিত করছে।

সরকার বর্তমানে কয়েকটি বড় বড় মুষ্টিমেয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগের অনুমতি দিয়েছে। যদি বিনিয়োগের এই অনুমতি ছোট এবং মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলিকেও (এসএমই) দেওয়া হয়, তাহলে তারাও এই নতুন নীতি ও নির্দেশিকা অনুযায়ী উদ্ভাবনী হতে পারবেন এবং অবদান রাখতে পারবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ম্যাক্কানসি অ্যান্ড কোং অনুসারে, প্রতিবেশী দেশ ভারত ষাটের দশকেই এই জাতীয় বিনিয়োগের নীতি বাস্তবায়ন করেছিল, যা আফ্রিকায় তাদের বিনিয়োগগুলোর সাম্প্রতিক ফলাফল গবেষণা করে দেখা যায় যে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত ১৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উপার্জন করবে। এই বিনিয়োগের ফলাফল এত উৎসাহজনক ছিল যে, ২০১৬ সালে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক স্বতন্ত্রভাবে একজন ব্যক্তি দ্বারা বিদেশে বিনিয়োগের জন্য এর পরিমাণ দ্বিগুণ করে প্রতিবছর ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারে নির্ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ এবং এখানকার ব্যবসায়ীরাও আগামী এক–দুই দশকে একই ধরনের ফলাফল ভোগ করতে সক্ষম হবে যদি ব্যবসায়িক অভিবাসন এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনাগুলোতে বিস্তৃত গবেষণা করে সকল উদ্যোক্তাদের এগিয়ে যেতে উত্সাহিত করা হয়।

পরবর্তী অভিবাসী সাফল্যের গল্পের উৎস কি বাংলাদেশ

অভিবাসী ব্যাকগ্রাউন্ডসহ কিছু বিশিষ্ট বিলিয়নিয়ারদের মধ্যে রয়েছেন টেসলা এবং স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলোন মাস্ক, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করে চলে এসেছিলেন।

অন্যান্য উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্ম নেওয়া গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন এবং হাঙ্গেরি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো বিশিষ্ট বিনিয়োগকারী ও দানবীর জর্জ সোরোস। আরও অনেক বিখ্যাত অভিবাসী আছেন, যাঁদের মানবতার প্রতি অবদান অপরিসীম।


ইআইইউয়ের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, বিশ্বের এমন সৌভাগ্যবানরা স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় নিজ দেশ থেকে স্থানান্তরিত বা অভিবাসন হয়ে থাকুক বা না থাকুক, তাঁদের ভাগ্যের দ্বার কিন্তু ব্যাপকভাবে উম্মোচিত হয়েছে অভিবাসনের পরই। ধরা যাক, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও এভাবে অভিবাসন করেছেন অথবা তাঁরা যাতে সহজে অন্য দেশে অভিবাসন করতে পারেন, এ রকম সহজ কিছু নীতি প্রণয়ন করে তাঁদের উৎসাহিত করা হলো, সে ক্ষেত্রে, ইলন মাস্ক ও জর্জ সোরোসের মতো বাংলাদেশের সাফল্যের গল্পগুলোও ভবিষ্যতে খুব বেশি দূরে নয় বলেই মনে হচ্ছে।

  • লেখক: রেগুলেটেড এবং লাইসেন্সড অস্ট্রেলিয়ান এবং নিউজিল্যান্ড ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট। kazi.ahsan@eduaid.net


সূত্রসমূহ–
1. https: //www. un.org/sites/un2.un.org/files/wmr_2020.pdf
2. https://www. homeaffairs.gov.au/research-and-stats/files/report-migration-program-2018-19.pdf
3.https://www.canada.ca/content/dam/ircc/migration/ircc/english/pdf/pub/annual-report-2019. pdf
4.https: //eiuperspectives. economist. com/economic-development/wealth-through-prism-culture-and-mobility
5.https: //www. theguardian. com/inequality/2017/nov/20/if-you-tax-the-rich-they-wont-leave-us-data-contradicts-millionaires-threats
6.https: //www. visualcapitalist. com/global-migration-of-millionaires/
7.https: //www. smh. com. au/business/the-economy/millionaires-are-fleeing-their-homelands-and-australia-is-their-no-1-choice-for-a-new-life-20190501-p51itn. html
8.https: //tbsnews. net/economy/govt-plans-allow-exporters-invest-abroad-130225
9.https: //www. ibef. org/economy/indian-investments-abroad
10.https: //www. thehindu. com/business/Economy/indians-can-invest-up-to-250000-annually-overseas/article6852407. ece
Regarding writer:
11.https: //www. mara. gov. au/search-the-register-of-migration-agents/registered-migration-agent-details/? id=50cb9bd8-a152-e311-9402-005056ab0eca
12.https: //iaa. ewr. govt. nz/PublicRegister/View. aspx? BusinessName=eduaid&search=1&p=1&adviserNumber=201002327

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0