আজ সকালে ফেসবুকে চোখ রাখতেই মনটা বিষণ্নতায় ভোরে গেল। আমার স্কুলজীবনের বান্ধবী মণির একপোস্টে আমার মন আর চোখ দুটিই একসঙ্গে কেন্দ্রীভূত হলো। মণি লিখেছে, আমাদের এক প্রাণের সহপাঠী পলি কোভিড–১৯–এর সঙ্গে লাইফ সাপোর্টে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পাঞ্জা লড়ছে ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালের কোনো এক কেবিনে। দেরি না করে বান্ধবী মণিকে ফোন দিলাম। মণির সঙ্গে কথায় বেশি দূর এগোতে পারলাম না। অন্য সময় ঘণ্টা পেরিয়ে যায় মণির সঙ্গে কথা বলতে বলতে। আজ আর কথা বলতে ভালো লাগছে না। কী বলব কী করব কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। রিয়াদে বসবাসরত পলির ছেলেকে ফোন দিলাম। ছেলেটা ভীষণ মুষড়ে পড়েছে, সান্ত্বনা দেওয়ার মতো তেমন কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। আজ সংসারের কোনো কাজে আমার মন বসছে না। এই তো গতবার দেশে গিয়ে দেখে এসেছি পলি কেবল সংসারটাকে গুছিয়ে এনেছে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ছিমছাম একটা জীবনের পথে। আর এরই মধ্যে ওর বিদায়ের মতো অবস্থা হবে, এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। যত ভাবছি, ততই পলিকে হারানোর ভয় আমার মনোজগৎকে শক্ত করে ঘিরে ফেলছে।

আমার মনের মধ্যে হাজারো স্মৃতি কথার মালা ছড়িয়ে পড়ছে। বাস্তবতার নিরিখে যে যেখানেই থাকি না কেন, মনের মধ্যে দোলা দিয়ে যায় অন্য মানুষের মনোমুগদ্ধকর আচরণের প্রতিচ্ছবি। পলির প্রাণোচ্ছল হাসিখুশি ভরা মায়াময় মুখোচ্ছবি স্মৃতির চাদরে ফুটে থাকে সব সময়। সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারার ক্ষেত্রে ওর আছে এক অতুলনীয় গুণ। ওর এই জীবনবোধের জ্ঞান আমাকে বরাবর স্পর্শ করে। যার যার জীবনযাত্রার ব্যস্ততায় আমার একে অপরের থেকে দূরে থাকি। কিন্তু প্রতিবারই দেশে গেলে যখন দেখা হয় পলির সঙ্গে, ওর কোমল আবেগী চিত্ত আর অভিমানের পসরা সাজানো কান্নামিশ্রিত কণ্ঠ আমার মন যেন ছুঁয়ে যায়।

পলির এই সংকটময় অবস্থায় আমার স্কুলজীবনের শৈশব–কৈশোরের দলা বাঁধা স্মৃতির পাণ্ডুলিপিগুলো একের পর এক আবরণ খুলে ভেসে বেড়াচ্ছে আমার মনের আঙিনায়। রিমি, সুম্মি, পলি, মণিসহ মোট ৩০ জন আমরা একসঙ্গে ভর্তি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ঝিনাইদহ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলাম। স্কুল শুরুর এক মাসের মধ্যেই আমরা পাঁচজন—রিমি, আমি, সুম্মি, পলি আর মণি গাঢ় বান্ধবী হয় গেলাম। চতুর্থ শ্রেণিতে আরও কিছু নতুন সহপাঠীরা এল, আবার কেউবা পরিবারের সুবিধার্থে বদলি নিয়ে চলে গেল। আজ কারও কারও নাম ভুলে গেছি, আবার কেউ কেউ মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে আমরণ সাক্ষী হয়ে আমার সেই চিরচেনা স্কুল আঙিনায়। কী সুন্দর আবেশে ভরা আমাদের সেই মনোরম দিনগুলো ছিল। সবুজ ফ্রকের সঙ্গে সাদা জুতা পরা আমাদের স্কুলের ইউনিফর্মে আমার স্মৃতিতে আমার অনেক সহপাঠীরা অম্লান হয়ে আছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি আমরা স্কুলমাঠে ছি বুড়ি, গোল্লাছুট বউচি, আর কানামাছি খেলতাম। কতই না আনন্দের ছিল স্কুলের সেই সোনালি দিনগুলো।

সময় এবং বয়সের পরিবর্তনের সঙ্গে এখন বুঝি পলি বরাবরই খুব অতিথিবৎসল ছিল। মনে পড়ে স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে ওদের বাড়িতে যেতাম আর ওর খাবারে ভাগ বসতাম। এখনো যখন নিজের সংসারে পালং শাক রাঁধি; সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যায় পলির মায়ের হাতের খুবই মজাদার পালংশাক দিয়ে পুঁটি মাছের তরকারির কথা। আমার নিজের সংসারে কত পালংশাক রাঁধি, কিন্তু পলির মায়ের সেই রান্নার স্বাদ আজও আমার কাছে মুখরোচক হয়ে আছে। ওদের রান্নাঘরের মেঝেতে কাঠের পিঁড়িতে বসে দুজনে হাপুসহুপুস করে খেয়ে আবার একছুটে স্কুলে এসে পঞ্চম পিরিয়ড ধরতাম। এখনো দেশে গেলে ওর বাসাতে খাওয়ার নিমন্ত্রণ থাকবেই। কোনো যুগে কোনটা খেতে পছন্দ করতাম, ওর সব মনে থাকে। আর সেই অনুযায়ী চেষ্টার ত্রুটি রাখে না খাবারের টেবিলটা সাজাতে। খেতে বসে সংসারের সুখ-দুঃখের গল্প, স্কুলের বান্ধবী ও শিক্ষকদের গল্প, ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থন, আরও কতশত গল্প। এর মধ্যেও বারবার মনে করিয়ে দিতে ওর সজাগ দৃষ্টি থাকে, যেমন তুই এটা খেলি না অথবা আর একটু বেশি করে নাও, প্লিজ। এই জীবনে চলার পথে অনেক মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। তবে কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড জীবনে এতটাই প্রভাব ফেলে যে আমরা নিজের মনের অজান্তেই তাদের অনুসরণ করে থাকি। তাদের মধ্যে পলির নাম তো অবশ্যই সামনের সারিতে চলে আসে।

default-image

অন্যান্য বান্ধবীর কথাও মনে পড়ে, তবে বিশেষ করে নবম শ্রেণিতে উঠে রিমি (নাহিদ শিরিন) আর সুম্মি চলে গেল ওদের বাবাদের চাকরির স্থলে। রিমি এখন আমার ফেসবুকে আছে, তবে সুম্মিকে আজও খুঁজে পাইনি। এর মধ্যে রিতা, পলি, মণি, বেলী, নাহার, চম্পা, জেসমিন, রিমির (নুরুন নাহার) সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হলো। শৈশব ছাড়িয়ে কৈশোরের বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা আজও মনে বাজে সুরের ঝংকার তোলে। আমাদের স্কুলটার একটা সাইড ছিল জামে মসজিদের দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া। আর ওই দেয়াল ঘেঁষে ছিল সারি সারি নারকেলগাছ। টিফিন পিরিয়ডে আমরা বান্ধবীরা সবাই বসতাম স্কুলের সিঁড়িতে নারকেলগাছের ছায়ায়। ছায়াঘেরা মৃদুমন্দ হিমেল বাতাসে নারকেলের পাতার ঝিরিঝিরি শব্দে সেখানে এক অভূতপূর্ব ভালো লাগা বিরাজ করত। যার যার বাড়িতে ভোরে কুড়িয়ে রাখা বকুল, বেলি আর শিউলি ফুল স্কুলে এনে মালা গাঁথা। আর সেই মালা চুলের বিনুনিতে জড়ানো। কী যেন এক সুখ সুখ অনুভূতিতে হেসে গড়িয়ে পড়তাম আমরা একে অপরের ওপর। আমার স্কুলের সবকিছুর সঙ্গে পলির নাম জড়ানো। পলির কালো মোটা চুলের বিনুনিতে বকুল/শিউলি ফুলের মালার দুলুনি আর খল খল হাসি আমার চোখে অনিন্দ্যসুন্দর মনে হতো। পাশেই মসজিদ থাকায় আমরা কথাবার্তায় বেশ সাবধানতা অবলম্বন করতাম। কেউ একজন উচ্চ শব্দে হাসি দিলে, আমরা সেটা শুধরিয়ে দেওয়ার জন্য সচেতন হতাম। সেই সঙ্গে চলত আমাদের গুনগুনিয়ে গানের জটলা। মণি বরাবরই বেশ বড়মাপের গানের শিল্পী ছিল। পাশাপাশি আমরাও সবাই গুনগুনিয়ে কণ্ঠ মেলাতাম মণির সঙ্গে। পলির কণ্ঠে এই গানটা আমার আজও মনে বাজে, ‘চতুর দোলাতে চড়ে দেখ ঐ বধূ যায়, স্বপ্ন সুখে তার চোখ দুটি যে উছলা।’ এই বন্ধুত্ব চলতে থাকল কলেজের গণ্ডি পর্যন্ত। এরপর একেকজন একেক জায়গায় পড়তে চলে গেল। কারও আবার বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু বহু বছরের ব্যবধানেও পলি, মণি, রিতা ও নাহারের সঙ্গে আমার আজ ও বন্ধুত্ব অটুট রয়ে গেছে।

এরই মধ্যে পলিকে হারানোর ভয় এক অজানা আতঙ্কে ভরিয়ে তোলে আমাকে। পলির এই কঠিন সময়ে নতুন–পুরোনো কতশত স্মৃতি জেগে ওঠে মনের গহিনে। না–জানি ওর কত কষ্ট হচ্ছে! জানি না ও আর ফিরে আসবে কি না। ওর স্বামী-সন্তানদের কতই না উৎকণ্ঠায় সময় পার করতে হচ্ছে। পলির মতো আরও কত হাজারো মানুষের অবস্থা দেখে শঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই! এরই মধ্যে তছনছ হয়েছে কত সংসার, আরও কত হবে জানি না। জানি না কবে এই করোনাভাইরাসের বিষণ্ণতার কালো মেঘ কেটে যাবে। আর উৎকণ্ঠাহীন জীবনযাপনের ঝলমলে রশ্মি ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীব্যাপী। আসুন, করোনার প্রাদুর্ভাবে মুখ থুবড়ে পড়া এই পৃথিবীকে টেনে তুলতে সৃষ্টিকর্তার নিয়ামতের অপেক্ষার পাশাপাশি আমরাও সচেতন হওয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হই। দোয়া করি, পলিসহ যে যেখানে বিপদে আছে, সবাইকে সৃষ্টিকর্তা রক্ষা করুন। আর পৃথিবী থেকে এই মহাবিপদ অনতিবিলম্বে কোনো এক রাতের আঁধারে বিলীন হয়ে যাক।

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন