default-image

গতকাল দুটি হৃদয়ছোঁয়া ঘটনার ওপর বেশ সময় দিয়েছি। ঘটনা দুটি কেউ জানে না, তা নয় বা এ বিষয় নিয়ে বিশ্বের অনেকে ভাবছে না, সেটাও নয়। তবুও আমি শেয়ার করতে চাই লেসন লার্নড কনসেপ্টের একটি অংশ হিসেবে। পৃথিবীর ধনী ও দরিদ্র সমাজের মধ্যে মূল পার্থক্য দারিদ্র্য এবং এ বিষয়ই আমার এই রিফ্লেকশনের মূল কারণ।

বহু বছর ধরে পাশ্চাত্যের একটি বিষয় আমি লক্ষ করে চলছি এবং সেটি প্রভাব বিস্তার করেছে বিশ্বের অনেক দেশে। তবে আমি তিনটি কন্টিনেন্টকে তুলে ধরব এবং চিহ্নিত করব দুটি দেশ উদাহরণ হিসেবে। যদিও এ ঘটনা বিশ্বের সর্বত্রই কমবেশি ঘটে। আমার আলোচনায় থাকবে আফ্রিকার গাম্বিয়া ও এশিয়ার থাইল্যান্ড।

প্রতিবছর পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক বয়স্ক নারী গাম্বিয়ায় বিলাসবহুল ছুটি কাটাতে যান। তাঁদের বিলাসিতার বড় সময়টি কাটে সে দেশের তরুণসমাজের সঙ্গে। বয়স্ক নারীদের বয়স বেশির ভাগই হবে ৫০ ঊর্ধ্ব, অন্যদিকে গাম্বিয়ার তরুণদের বয়স হবে ২০ থেকে ৪০–এর মধ্যে। গাম্বিয়ার দরিদ্র এই তরুণেরা পাশ্চাত্যের বয়স্ক নারী পর্যটকদের বিলাসিতা দিতে সঙ্গী হওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। বিনিময়ে যে অর্থ তাঁরা উপার্জন করেন, সেটা দিয়ে তাঁরা গাম্বিয়ায় দিব্যি সুন্দর জীবন যাপন করছেন। অনেকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় বয়সের বিশাল পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও।

অন্যদিকে পাশ্চাত্যের অনেক বয়স্ক পুরুষ থাইল্যান্ডে গিয়ে অতি অল্প বয়সী তরুণীদের সংস্পর্শে এসে বিলাসিতার সঙ্গে সেখানে ছুটি পার করছেন। তাঁদের অনেকেই ওই সব মেয়েদের বিয়ে করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়ে সংসার করছেন। অনেক মেয়ে বিয়ের পর ইউরোপে অনুমোদন পেলে বৃদ্ধকে ছেড়ে নিজ দেশের কোনো তরুণকে বিয়ে করে আবার নতুন জীবন শুরু করছেন ইত্যাদি। আমাদের সমাজে এসব ঘটনা নিন্দনীয়।

পাশ্চাত্যের মানুষের বেশির ভাগই অর্থে সচ্ছল। সে ক্ষেত্রে যে জীবন তাঁরা বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, দরিদ্র দেশের এ তরুণ–তরুণীদের নিয়ে সেটাতে তাঁরা খুশি। একইভাবে এই দরিদ্র দেশের তরুণ–তরুণীরাও এটাকে জীবনের ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে পেয়েছে এবং এতে তাঁরা সন্তুষ্ট। যে যা–ই বলি বা যেভাবেই দেখি না কেন বিষয়টি, তাতে তাঁদের কিছু যায়–আসে বলে মনে হয় না। তবে উভয় পক্ষের পার্টনারদের সঙ্গে কথোপকথনে জানা গেল, তাঁরা পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল এবং উইন–উইন পরিবেশের সম্পর্কে বিশ্বাসী।

এখন আমরা যেহেতু কটূক্তি করতে পছন্দ করি, সে ক্ষেত্রে সমাজ ও ধর্মীয়ভাবে এর নিন্দা করতে উঠে পড়ে লাগতে পারি, সবই হতে পারে। তবে তাঁদের জীবনের এ অবস্থানের পরিবর্তন করতে পারি কি? শুধু ঘৃণা, পরনিন্দা বা পরচর্চা করার জন্যই কি আমাদের জন্ম হয়েছে? আমাদের জন্মের সার্থকতা কি তাহলে কিছু না করেই? অন্যদিকে যা কিছুরই সমাধান করতে হবে বা হচ্ছে, পাশ্চাত্যের মানুষই কিন্তু সেটা করে আসছে।

এটা ছিল একটি দিক, আরেকটি দিক সেটা হলো বিশ্বে করোনা মহামারির ওপর কিছু ভাবনা। যতটুকু জানতে পেরেছি, তাতে পরিষ্কার যে দরিদ্র দেশগুলোও এর জন্য কম দায়ী নয়। সমস্যা সৃষ্টি করব অথচ সমাধান করব না, তা হবে না।

default-image

সব সমস্যা নিশ্চয় শুধু পাশ্চাত্যের মানুষ করে এমন কোনো নজিরও নেই। তাহলে শুধু তারা কেন সমাধান করবে? বর্তমান করোনা সমস্যার সঙ্গে নতুন আরেকটি ভয়াবহ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং এটি সম্ভবত আফ্রিকা থেকে শুরু হবে। সে আবার কী?
ইদানীং আফ্রিকার অনেক দেশেই প্রচুর বাদুড়ের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কারণ, মানবজাতির খাদ্যের সমস্যা দূর করতে দরকার উৎপাদন এবং তার জন্য প্রয়োজন উর্বর জমি। এখন সেটা পেতে পৃথিবীর সব জঙ্গল কেটে শেষ করা হচ্ছে। ফলে জলবায়ুর বিশাল পরিবর্তনের সঙ্গে পশুপাখি এবং মানুষের বসবাসের দূরত্ব কমতে শুরু করেছে। বাদুড়সহ অনেক বন্য পশুপাখি ইদানীং ঘনবসতি এলাকায় আসছে খাদ্যের সন্ধানে।

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীতে এখন আমরা ৮০০ কোটি মানুষ এবং তার প্রায় ৫০০ কোটি মানুষেরই পেটে খিদে। স্বাভাবিকভাবে বাদুড় থেকে শুরু করে যা কিছু চোখের সামনে পড়ছে, তা–ই শিকার করে খেতে শুরু করছি। এসব বন্য পশুপাখি নানা ধরনের ভাইরাস বহন করে চলছে তাদের দেহে যুগ যুগ ধরে, যা আমাদের ভাইরাস থেকে ভিন্ন।

আমরা মানবজাতি কখনো পশুপাখির ভাইরাস আমাদের শরীরে ম্যানেজ করে বেঁচে থাকতে পারব না। এখন আমরা যেসব বন্য পশুপাখি শিকার করে খেতে শুরু করেছি, সেসব পশুপাখির বর্জ থেকে শুরু করে রক্তে যেসব জীবাণু রয়েছে, তা আমাদের শরীরে ঢুকে মহামারির সৃষ্টি করছে এবং আগামীতেও করবে।

এখন আমাদের নিজ নিজ দেশের ভৌগলিক আইডেনটিটি, পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও এবং আমরা ধনী বা দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও একে অপরের সঙ্গে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে মিশছি, বিভিন্ন দেশ–বিদেশের খাবার খাচ্ছি। সে ক্ষেত্রে সম্ভব কি মহামারি এলে সেই বিপদ এড়িয়ে চলা? শুধু যৌনতা বা বিনোদনের কারণে যে আমরা একে অপরের সঙ্গে মিশছি তা নয়, আমরা দিন দিন একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি নানাভাবে। সে ক্ষেত্রে সময় এসেছে মানুষের ভারসাম্য রক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়ার, সময় এসেছে সবাইকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার।

ভবিষ্যতে করোনাভাইরাসের মতো সব মহামারির জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া আশু প্রয়োজন। এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে ২৩টি দেশের নেতারা আলোচনা এবং একটি চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবিত এ চুক্তিতে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী যেকোনো বিষয়ে তথ্য বিনিময়ের বিষয়ে কঠোর বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে।

default-image

গত নভেম্বরে বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক দেশগুলোর জোট গ্রুপ-২০-এর সম্মেলনে এ ধরনের একটি চুক্তির ধারণা তুলে ধরেছিলেন ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল। সেখানে মহামারিতে টিকা, ওষুধ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সর্বজনীন ও সমান অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে কথা বলেছিলেন তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক নতুন এ চুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন।

কোভিড-১৯ মহামারিতে যেসব ঘাটতি দেখা দিয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা সম্ভব হবে নতুন এ চুক্তি হলে। বিশ্ব সংস্থার সদস্য ১৯৪টি দেশের প্রতিনিধিদের এটা নিয়ে এখনই কিছু করতে হবে।

কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়েছে। ১ বছর ৩ মাসের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ২৮ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ নিয়েছে এই করোনাভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে চীনকে গোপনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। কয়েক মাস আগে চীনের উহান ঘুরে আসা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি প্রতিবেদন দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, বাদুড় থেকে মানবদেহে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো প্রাণী অন্তর্বর্তী পোষক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে বলে তাঁদের ধারণা। তবে উহানের গবেষণাগার থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে বলে যে সন্দেহের কথা বলা হয়েছিল, সেটা সঠিক তথ্য নয় এবং এর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

মহামারি মোকাবিলায় প্রস্তাবিত চুক্তিতে সম্মতি দেন ২৩টি দেশের নেতারা। দেশগুলো হলো যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, নরওয়ে, গ্রিস, ফিজি, পর্তুগাল, রোমানিয়া, রুয়ান্ডা, কেনিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চিলি, কোস্টারিকা, আলবেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো, তিউনিসিয়া, সেনেগাল, সার্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ইউক্রেন। এ–সংক্রান্ত চিঠিতে এখনো সই করেনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নেতারা এ প্রস্তাবে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক জানিয়েছেন।

আমি মনে করি, এসব কাজে বাংলাদেশের নাম শুরু থেকে থাকা উচিত। বিশ্বের উন্নত দেশের মতো প্রথম সারিতে থেকে ইনিশিয়েটিভ নেওয়া উচিত। আর কত দিন পেছনে পড়ে থাকতে হবে আমাদের? আমাদের ইনিশিয়েটিভ কেন হতে পারে না ‘বি দ্য ফার্স্ট টু বি নোন’?

এত কিছু বলার একটাই উদ্দেশ্য। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সব সময় দেশকে, দেশের মানুষকে আরামের জায়গা (কমফোর্ট জোন) থেকে বাইরে আনতে হবে, রাখতে হবে প্রচণ্ড ধৈর্য। আর চিন্তাচেতনা থাকতে হবে উদ্দেশ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে (ফোকাসড)। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ যাদের, তারা তা করতে পারলে সেটা হবে বিশাল একটি অর্জন, এ কথা বলা যায়। কারণ, এ প্রক্রিয়া চলাকালে যে শারীরিক–মানসিক কষ্ট সহ্য করতে হয়, তার সাক্ষী আমরা বাংলাদেশিরাই।

বিজ্ঞাপন

কষ্টের মূল্য সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই দেবেন। যেখান থেকেই শুরু করি না কেন, জয় আমাদের হবেই। কেননা, আল্লাহ আমাদের সহায়। আমার জীবনে এ রকম অনেক সাফল্য, পরাজয় আর পরিশ্রমের গল্প আছে, যা হয়তো মিলে যাবে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে। আহামরি কিছু নয়, তবে কেন তুলে ধরা? শুধু ইতিবাচক শক্তিটাকে ছড়িয়ে দেওয়া, এটুকুই! আমি ইতিবাচক বা পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে বিশ্বাস করি। এর একটা বিশেষ কারণ, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক করুণ অবস্থা। আর তা বারবার মনে করিয়ে দেয় আত্মীয়স্বজন পরিবেষ্টিত সমাজব্যবস্থা। আমাদের সামাজিক অবস্থান মনে রাখা উচিত। অনেকেই আমাকে বলে, বাংলাদেশের কখনো পরিবর্তন হবে না এবং বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে না। লেখালেখি করে সময় নষ্ট করা কী দরকার ইত্যাদি।

এসব অপমানজনক কথা আমার মধ্যে জিদের জন্ম দেয়, আমাকে উৎসাহ জোগায়। অন্য দেশ যদি পারে, তবে কেন আমরা পারব না? অন্যরা গাম্বিয়া ও থাইল্যান্ডে আরাম-আয়েশে ছুটি কাটিয়েও যদি বড় বড় সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে আমরা আরাম-আয়েশ পরিত্যাগ করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কেন পারব না? পারতে যে আমাদের হবেই।

*লেখক: রহমান মৃধা, সুইডেন

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন