default-image

হাসতে হাসতেই তিনি আমার বারোটা বাজিয়ে দেবেন, সেটা তার হাসি দেখে আমার পক্ষে অনুমান করা সম্ভব ছিল না। ১ জুলাই ২০১৪৷ সকাল পৌনে ১০টার দিকে লস অ্যাঞ্জেলেসের ব্যস্ততম সড়ক ভারমন্ড উইলশ্যায়ারে ভারমন্ড রাস্তা পার হচ্ছিলাম। পশ্চিম পাশ থেকে রাস্তা পার হয়ে আমি পূর্ব পাশে এসে মেট্রো ট্রেনে ইউনিয়ন স্টেশনে গিয়ে আর একটি ট্রেন ধরে প্যাসেডিনা আমার কর্মস্থলে যাব। ভারমন্ডে মেট্রো র‌্যাপিড বাস থেকে নেমেই ডান-বাঁয়ে তাকালাম। ভারমন্ডের জেব্রাক্রসিংয়ে দুদিকের গাড়ি তখনো থেমে আছে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য সবুজ বাতিও জ্বলে আছে। রাস্তাটি পার হতে আট-নয় সেকেন্ড সময় লাগে এবং সবুজ বাতির স্থায়িত্ব হলো ২০ সেকেন্ড। লাল বাতি জ্বলতে তখনো পাঁচ সেকেন্ড বাকি৷ এত অল্প সময়ে রাস্তা পারাপার হওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ৷ কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম, এই সময়ের মধ্যে নিরাপদেই রাস্তা পার হয়ে যেতে পারব৷ আমি নিরাপদেই রাস্তা পার হয়েছিলাম৷ 
এদিকে অর্ধেক রাস্তা পার হওয়ার পরই দেখি, অন্য প্রা‌ন্তে একজন পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে আছে৷ হাসি হাসি মুখ নিয়ে তিনি আমাকে ডাকছেন। তিনি যেন আমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু আমার ভেতরে ভেতরে খবর হয়ে গেছে। তাঁর কাছাকাছি গিয়ে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে বললাম, আর কখনোই এমন হবে না। আমার ট্রেন চলে আসছে এবং কাজে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে৷ পাঁচ সেকেন্ড সময় থাকতে রাস্তা পার হতে নেমে আমি ভুল করেছি। প্রথমবারের মতো আমাকে মাফ করে দাও।
পুলিশটির মুখ থেকে হাসি যেন আর শেষ হয় না। সে আমার আইডি কার্ড দেখতে চাইল। আমি আইডি কার্ড দিলাম। তখনো সে হাসছে। হাসি মুখে জানতে চাইল, আইডি কার্ডের ঠিকানা অনুযায়ীই আমি বাস করছি, নাকি অন্য ঠিকানায় বাস করছি। আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে জানালাম, এটাই আমার ঠিকানা। এরপর পুলিশ অফিসার আমাকে একটি টিকিট ধরিয়ে দিয়ে পিঠ চাপড়ে বলল, এখন কাজে যাও। আমি জানতে চাইলাম, আমাকে কি জরিমানা করেছ? হাসতে হাসতে সে জবাব দিল, গতকাল এখানে একটি ঘটনা ঘটেছে। এমনভাবে সে বলল যে সে যেন আমার কাছে গতকালের ঘটনার জবাবদিহি করছে। সে আমাকে দুই সপ্তাহ পর অনলাইনে অথবা টিকিটের ওপর মুদ্রিত টেলিফোনে আমার কেসের খবর নিতে বলল। মনটা আমার খারাপ হয়ে গেল। টিকিটের ওপর কোনো জরিমানা লেখেনি। কোন ঝামেলায় পড়লাম কে জানে?

default-image

টিকিটের ওপর নম্বর দেখে দুদিন পরেই আমি ফোন করলাম। অটোমেটিক মেশিন থেকে উত্তর দিল আমার কেসের এখনো কোনো ফয়সালা হয়নি। মনটা আনচান করছে, কোনো ঝামেলায় ফেঁসে গেলাম। কয়েক দিন পর আমি ঠিকানা মোতাবেক সেই অফিসে গেলাম। অফিসে গিয়ে আমার তো আক্কেল গুড়ুম অবস্থা। এ তো দেখি অফিস নয়, সুপিরিয়র কোর্ট। প্রথমে একটু ভড়কে গেলাম। এরপর একটু সাহস সঞ্চয় করে ভেতরে ঢুকে অফিস ক্লার্ককে কাগজটা দেখালাম। অফিস ক্লার্ক কম্পিউটারে চেক করে বলল, তোমার কেসের এখনো কোনো ফয়সালা হয়নি। আমি জানতে চাইলাম, আমার কী ধরনের সাজা হতে পারে। সে জানাল, এ ধরনের কেসে কিছু জরিমানা হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। তোমার কেসের ফলাফল ডাকযোগে পাঠানো হবে। অফিস ক্লার্ক আমাকে একটি টেলিফোন নম্বর দিয়ে বলল, এই নম্বরে কয়েক দিন পর যোগাযোগ কোরো।
কয়েক দিন পর আমি সেই নম্বরে যোগাযোগ করে জানতে পারি, আমাকে ১৯৭ ডলার (বাংলাদেশি প্রায় ১৬ হাজার টাকা) জরিমানা করা হয়েছে। আবার সেই সুপিরিয়র কোর্টে হাজির হয়ে ক্লার্কের সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ করলাম, বিচারকের সঙ্গে দেখা করার কোনো সুযোগ আছে কি না। ক্লার্ক বলল, সুযোগ আছে। সে আরও জানাল, প্রায় দুই মাস পর বিচারকের সঙ্গে দেখা করা যাবে। আমি কী করব ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এমনিতে গত কয়েক দিন বিষয়টি আমাকে দুচিন্তায় ফেলে দিয়েছে। আরও দুই মাস অপেক্ষা করে বিচারকের সঙ্গে দেখা করলেই যে জরিমানাটা মাফ করে দেবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, বিচারক মর্জিমাফিক কোনো কোনো সময় মাফ করেন, কোনো কোনো সময় করেন না। আমি ঝামেলাটি আর দীর্ঘায়িত করতে চাইনি। ১৯৭ ডলার জরিমানা দিয়ে রিসিট নিয়ে নিলাম। ক্লার্ক বলল, তোমার কেস ডিশমিশ। পুলিশ অফিসারের হাসিমাখা মুখখানা আমার আর মনে পড়েনি। মাত্র কয়েক সেকেন্ড পর রাস্তা পারাপারের জরিমানা ১৯৭ ডলার। পুলিশের হাসিমাখা মুখের কথা মনে থাকে কী করে?

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন