default-image

আজ ট্রেনিংয়ের শেষ দিন ছিল মহুয়ার। অধরা রংধনু ধরে ফেলেছে সে। ছোটবেলা থেকে মানুষের জন্য জীবনটা উৎসর্গ করে দেবে বলে পণ করে চেষ্টা চালিয়ে গিয়ে অবশেষে সফল হয়েছে। বাংলাদেশ আর আমেরিকার যৌথ স্পনসরশিপে সে–সহ একঝাঁক তরুণ–তরুণী ট্রেনিং পেয়েছেন হাই প্রোফাইল সাংসারিক ঝামেলা বের করে সমাধান করার জন্য। মহুয়াকে বাছাই করা হয়েছে যেকোনো লেভেলে কাজ করতে। প্রজেক্টের নাম সিলভার লাইনিং।

এর মধ্যে বাংলাদেশে সোশ্যাল ওয়ার্কার আর সাইকিয়াট্রিস্টদের নিয়ে স্ট্রং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে মহুয়া। কাউন্সেলিং খুব দরকার কিছু কেসে। দম ফেলার সময় নেই। পৃথিবীর অন্য সব দেশে কাজ করতে হবে সলো। উচ্চপদস্থ সরকারি পর্যায়ের কিছু মানুষ ছাড়া কেউ তার পরিচয় জানবে না। ক্লিয়ারেন্স নেওয়া আছে সাহায্যপ্রার্থী দেশগুলোয়।

প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট পড়েছে সুইডেনের স্টকহোমের ক্যারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটে। অ্যানোনিমাসভাবে এক অধ্যাপক, যিনি কিনা শোনা যায় নোবেল প্রাইজ সিলেকশনের সঙ্গে জড়িত, তিনি তাঁর কলিগ ওরফে প্রাণপ্রিয় বন্ধুর (অধ্যাপক এরিকসন) মাস কয়েক ধরে ব্যবহার নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে আছেন। সিলভার লাইনিংয়ের ফান্ড রেইজিংয়ের অন্যতম দাতাও তিনি। সাহায্য চেয়েছেন খারাপ কিছু ঘটে যাওয়ার আগে। মহুয়ার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট এটা। স্যানহোসে থেকে সে অধ্যাপক এরিকসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সুইডেনে ক্যারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটে কয়েকটা সেমিস্টার রিসার্চ করতে উৎসাহী বলে। এরিকসন রাজি হয়েছেন আর একটা স্কলাশিপেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

জানুয়ারির প্রচণ্ড শীতে অরলান্ডা এয়ারপোর্টে নামল মহুয়া। ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছে গেল স্টুডেন্টদের জন্য ফার্নিস্ট অ্যাপার্টমেন্টে। ফরেন স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজার চাবি দিয়ে জিম কোথায় দেখিয়েছেন, বাস বা ট্রেনের মাসিক কার্ড করতে সাহায্য করেছেন, সময়সূচি দিয়ে দিয়েছেন সবকিছুর আর ছয়টার পর মোটামুটি সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়, এটাও বলে দিয়েছেন। বাসে করে সেভেন ইলেভেনে নেমে রাতের খাবার আর কফি নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরেছে সে। এরপর ডুবে গেছে অধ্যাপক এরিকসনের সেরা আবিষ্কারের ওপর পাবলিকেশন্স নিয়ে।

পরদিন ভোরে উঠে একগাদা কাপড় পরে বাসে করে সময়মতো পৌঁছে গেল ক্যারোলিন্সকা। অধ্যাপক এরিকসনের ল্যাবে পৌঁছাতেই খুব আন্তরিক হ্যান্ডশেক দিয়ে বরণ করে নিলেন তিনি। পরিচয় করিয়ে দিলেন তাঁর ল্যাবে কাজ করতে আসা সবার সঙ্গে। লেয়া, নোরা, রিক, এমিলি, কার্টার সুইডিস, এরিক জার্মান, মুস্তফা ইরাকী, স্যাম ফিনিশ আর মহুয়া যোগ হলো আমেরিকা থেকে। এরিক কাজ দেখিয়ে দিলেন কিছু, ঘণ্টা বাজিয়ে কফি খাওয়ার সময় ঘোষণা করল লেয়া। টুকটাক কাজ শিখে এভাবেই মাস তিনেক চলে গেল।

মহুয়া খেয়াল করল, যেকোনো মিটিংয়ে লেয়া অধ্যাপকের পাশে বসবে সব সময়। সারা দিন কয়েকবার বলবে, অধ্যাপক এরিকসন কত হ্যান্ডসাম। লাঞ্চ আওয়ারে সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে বসলেও লেয়া প্রায়ই অধ্যাপককে নিয়ে বাইরে চলে যায়। ছয় মাস পর মহুয়ার প্রথম পেপার পাবলিকেশন হওয়া উপলক্ষে অধ্যাপকের বাসায় সবাই ডিনার করতে গেল গামলাস্তান নামক অভিজাত এলাকায়। মহুয়া অধ্যাপকের বউকে এই প্রথম দেখল। বয়স ষাটের কাছে কিন্তু এখনো অপরূপ রূপসী। খাবারগুলো তাঁর নিজ হাতে করা। মহুয়া শিখতে চায় শুনে তিনি এককথায় রাজি। কথায় কথায় ও জানল তাঁদের একমাত্র মেয়ে নাকি ছিল স্বভাবে অনেকটা মহুয়ার মতোই কিন্তু এক কালো ছেলেকে বিয়ে করে পাড়ি জমিয়েছে নিউইয়র্কের জ্যামাইকায়। কী এক অভিমানে বহু বছর হয়েছে কোনো যোগাযোগ নেই তাঁদের সঙ্গে।

default-image

প্রথম পরিচয়ের পর থেকেই ছুটির দুই দিন অধ্যাপকের বাসায় চলে যেত মহুয়া তাঁর বউ লিন্ডার রিকোয়েস্টে। সারা দিন ঘুরে সন্ধ্যায় তাকে বাসায় নামিয়ে তিনি চলে যেতেন। অধ্যাপক ব্যস্ত থাকতেন ল্যাবের কাজ নিয়ে। এভাবে একদিন স্কানসেন ওপেন জুতে ঘুরতে ঘুরতে ওরা দেখল, অধ্যাপক এরিকসন আর লেয়া ঘুরে বেড়াচ্ছে হাত ধরে। তাদের দেখে লেয়া গম্ভীর হয়ে গেল আর অধ্যাপক হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে এলেন। অল্প কথার পর তারা চলে এল। আসার পথে কাঁদতে কাঁদতে লিন্ডা বলে গেলেন গত দেড় বছরে অধ্যাপক এরিকসনের বদলে যাওয়ার কথা। আরও একদিন লেয়ার সঙ্গে টি সেন্টাল মলে অধ্যাপককে ঘুরতে দেখেছে মহুয়া, দেখেছে মাছ ধরতে লেকে। লিন্ডা এই প্রথম দেখলেন দুজনকে একসঙ্গে।

মহুয়ার দ্বিতীয় পেপার পাবলিকেশন হওয়ার পরে সে বলল, কত দিন আর কাজ করবে জানে না। হয়তো আমেরিকায় চলে যাবে। সিলিয়া লাইন বলে ক্রুজ আছে, সুইডেন থেকে ফিনল্যান্ড যায়। শুধু অধ্যাপক আর লিন্ডার সঙ্গে সে যেতে চায়। তাঁরা রাজি হয়ে গেলেন। সিলিয়া লাইন ছাড়ল বিকেলে। তারা ডিনার করল একসঙ্গে। তারপর নাচের ফ্লোরে চলে গেল সবাই। অধ্যাপক নাচতে চাচ্ছিলেন না কিন্তু মহুয়া বলে বসল, আপনাদের মেয়ে আপনাদের একসঙ্গে নাচতে দেখতে চাইলে না করতে পারতেন? তাঁরা নাচলেন একসঙ্গে তারপর অনেকক্ষণ। তারপর চাঁদনী রাতে ডেকে হাত ধরে বসে রইলেন তাঁরা আর মহুয়া ঘুমাতে চলে গেল।

পরদিন ফিনল্যান্ড পৌঁছে সারা দিন ঘোরে তারা, সঙ্গে মহুয়া। এস্কিমোদের বরফঘরের সামনে গিয়ে দুজনই দাঁড়িয়ে পড়লেন। লিন তাঁদের মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওর দুই বাচ্চা নিয়ে। ভালোবাসার কত রং মহুয়া দেখে নিল এরপর চোখের জলে শেষ বিকেলের আলোতে। লিন ওর বাবা–মার বুকে, বাচ্চাগুলো তারপর তাঁদের কোলে, সবার চোখে পানি কিন্তু সবাই হাসছে। বসকে স্যানহোসেতে এই প্রথমবারের মতো টেক্সট করল মহুয়া ধন্যবাদ জানিয়ে অধ্যাপক আর লিন্ডার মেয়েকে খুঁজে বের করার এবং ফিনল্যান্ডে আসার ব্যবস্থা করার জন্য।

তারপর সবাই ফিরে চললেন সুইডেনের পথে সিলিয়া লাইন জাহাজে। অধ্যাপক এরিকসন নিজের ভুল বুঝে সব খুলে বললেন, স্ত্রী আর মেয়েকে। বললেন ভুলেই গেছিলেন মোহের বসে তাঁর আজীবনের ভালোবাসাকে হারিয়ে ফেলছিলেন ধীরে ধীরে। লিন্ডা সুইডিসে বললেন, তিনি আকাশ খুলে বসে আছেন তাঁর প্রথম আর শেষ ভালোবাসার জন্যে। তাঁর সময় না দেওয়া অবহেলা, তাই এত কষ্ট দিয়েছে তাঁকে।

সুইডেনে ফিরে মহুয়া আমেরিকা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অধ্যাপক এত দিনে বুঝে নিয়েছেন লেয়া তাঁকে সরিয়ে ল্যাবের সব দায়িত্ব নিজে নিতে চাচ্ছে। ক্যারোলিন্সকা কর্তৃপক্ষ তাদের মহাক্ষতি হবে বলে তাতে সায় দেয়নি। লেয়া একদিন তাঁর অফিসে ঢুকে উচ্চস্বরে অধ্যাপককে রেজিগনেশন লেটার সাইন করতে বলছে, শুনল মহুয়া। ১১২ নম্বরে (ওদের দেশীয় পুলিস) কল করে ঢুকে গেল, সেও অধ্যাপকের রুমে। বলল, লেয়া, চলে যাও প্লিজ। মাথা না থাকলে গায়ের জোরে বা নোংরামি করে সবকিছু পাওয়া যায় না। লেয়া ছুরি বের করে তেড়ে এল মহুয়ার দিকে। রাইট ফ্রন্ট কিক পেটে, লেফ্ট রাউন্ড হাউস কোমরে আর টিজার গানের ছোট্ট একটা শক কখন লেয়া খেল, টেরই পেল না। লেয়া মাটিতে, পুলিশ ঢুকল তখনই। আইডি বের করে দেখিয়ে বিনা বাধায় মহুয়া চলে গেল বাসায়, সব গুছিয়ে চলল প্লেন ধরতে। বসকে ছোট্ট টেক্সট জানাল অপারেশন সাকসেসফুল। বসও জানালেন জলদি বাংলাদেশে চলে যাও। সিলভার লাইনিংয়ের নুতন কেস ঢাকাতে। ভীষণ জরুরি। চলবে...

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0