default-image

১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম আলো প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পরে দেশের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকার তকমা জয় করে নিল। আমরা যাঁরা বয়সে তরুণ আমরা মনে মনে আসলে এমন একটা পত্রিকায় খুঁজছিলাম, যেটা আমাদের স্বপ্ন দেখাবে। একেবারে শুরুর দিন থেকেই আমরা কুষ্টিয়ার বন্ধুরা তাই নিয়মিত পাঠক হয়ে গেলাম।  
এরপর ভর্তির সুযোগ পেয়ে বুয়েটের ড. এম এ রশীদ হলে থাকা শুরু করলাম। প্রতিটি ফ্লোরেই মাঝখানের সিঁড়ির দুপাশে ৬টা করে মোট ১২টি কক্ষ ছিল। আমাদের উইং ছিল ২০১ থেকে ২০৬ নম্বর। আমাদের ফ্লোরে ২০৩ নম্বর কক্ষে প্রথম আলো রাখা হতো। সেটাই আমরা সারা ফ্লোরের মানুষ ভাগাভাগি করে পড়তাম। আর দিন শেষে আমি আমার পছন্দের পাতাগুলো ভাঁজ করে বিছানার তোশকের নিচে রেখে দিতাম বিশেষকরে মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের সব কলাম আমি সংগ্রহে রাখতাম। এর বাইরে আনিসুল হক স্যারের গদ্যকার্টুনগুলোও সংগ্রহ করতাম। সপ্তাহের প্রতিটি দিনই মূল পত্রিকার সঙ্গে একটা করে ফিচার অংশ থাকত, সেটা ছিল আমাদের বাড়তি আকর্ষণ।

বিজ্ঞাপন
default-image

শনিবার মূল পত্রিকার ছোট বই আকারে সঙ্গে দেওয়া হতো ছুটির দিনে। সেটা নিয়ে মোটামুটি আমাদের কাড়াকাড়ি লেগে যেত। সেখানে মূল প্রতিবেদনের পাশাপাশি পাঠকের অনেক লেখা ছাপা হতো, যার বেশির ভাগই ছিল বাস্তব জীবনের কাহিনি। একবার সেখানে আমাদের কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের বন্ধু শাহরিয়ার পাভেলের একটা লেখা ছাপা হয়েছিল ‘স্যার বলতে লজ্জা লাগে’ শিরোনামে। সেই লেখা দেখে আমরা বুক ফুলিয়ে হাঁটা শুরু করলাম, কারণ লেখক সরাসরি আমাদের বন্ধু। রোববার ছিল খেলাধুলার একটা বাড়তি পাতা। সোমবার আবার বই আকারে দেওয়া হতো ‘আলপিন’ নামে একটা রম্য ম্যাগাজিন। আলপিনের প্রতিটি বিষয় ছিল আনন্দের। কার্টুন থেকে শুরু করে কৌতুক সবকিছুই আমরা ভীষণ উপভোগ করতাম। পরে একটা কার্টুন প্রকাশকে কেন্দ্র করে জটিলতা হওয়াতে আলপিনের নাম বদলে ফেলা হয়।

মঙ্গলবার দেওয়া হতো কিছু বাড়তি পাতা ‘নকশা’। এই পাতাগুলো বইয়ের আকারের না আবার মূল পত্রিকার আকারেরও না। এগুলো মূল পত্রিকার অর্ধেক আকারের। সেখানে গৃহস্থালি সবকিছু সুন্দরভাবে পরিবেশন করার উপায়ের পাশাপাশি নিজেকে কীভাবে পরিপাটি রাখা যায়, ছিল তার বিশদ বিবরণ। সেই বিবরণ পড়ে পড়ে দেখলাম হলের অনেক বন্ধু এবং বড় ভাইয়েরা নিজের ত্বকের মুখের যত্ন নিতে শুরু করে দিয়েছেন। সেগুলো দেখে আমরা মুখ টিপে হাসতাম। এবার এই নকশাতে আমাদের ভাগনি সেমন্তীর কিছু ছবি ছাপা হয়েছিল। সেগুলো দেখার পর আমার গর্বে আর মাটিতে পা পড়ে না, কারণ আমি ওদের ব্যক্তিগতভাবে চিনি। আমি তখন অনলাইনে গিয়ে সেই ছবিগুলো ডাউনলোড করে রেখে দিলাম। কিছুদিন আগে সেমন্তীর জন্মদিন উপলক্ষে সেগুলো দিয়ে ওকে সারপ্রাইজ দিলাম। সেমন্তী আর সেই ছোট্টটি নেই আর প্রথম আলোও আজ ২২ বছর পার করে ফেলেছে।

default-image

বুধবার বের হতো ‘গোল্লাছুট’। এটা কেউ পড়ত না, কিন্তু আমার খুব ভালো লাগত কিশোর গল্পগুলো পড়তে। আর শেষের পাতার নিচে একটা কার্টুন থাকত। সেটা পড়তাম সবার আগে। বৃহস্পতিবার ‘আনন্দ’। আনন্দ নিয়েও কাড়াকাড়ি লেগে যেত। দেখা যেত আমাদের প্রত্যেকেরই ক্রাশ সিনেমা বা নাটকের কোনো নায়িকা। আবার আমাদের ক্যাম্পাসেই পড়তেন তখনকার লাক্স ফটোসুন্দরী ‘অপি করিম’। তাই সব মিলিয়ে আনন্দর চাহিদা ছিল সবার মধ্যেই। দিন শেষে দেখা যেত আনন্দর কোনো একটা পাতার কোনো একটা অংশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ সেখানে কোনো এক নায়িকার ছবি ছিল। কেউই স্বীকার করত না সেটা কে কেটে নিয়েছে। শুক্রবারেও এ রকম একটা কিছু দেওয়া হতো, সেটা আর এখন মনে পড়ছে না।

প্রথম আলোর মূল পত্রিকার প্রায় সবকিছুই ভালো লাগত। তবে আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল শিশির ভট্টাচার্যের কার্টুন। সমসাময়িক ঘটনাকে হাস্যরসের মাধ্যমে এমন বুদ্ধিদীপ্তভাবে উপস্থাপন আমি আর কোথাও দেখিনি। এ ছাড়া ওপর-নিচ, বাঁ-ডান শব্দজট বা শব্দ নিয়ে ধাঁধা থাকত একটা পাতার নিচের দিকে ডান পাশে। এগুলো প্রায় প্রতিদিনই সমাধান করতাম। সমাধান করতে করতে একসময় ব্যাপারটা এমন হয়ে গেল যে আমি প্রশ্ন দেখলেই উত্তর বলে দিতে পারতাম। বন্ধুরা আমার ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে যেত। এভাবে আমার অনেক বাংলা শব্দ শেখা হয়ে গিয়েছিল। আর বইমেলার একটা মাস প্রতিদিন আমি শেষের পাতার ওপরের দিকের ডান দিকের কোনায় চোখ রাখতাম, কারণে–সেখানে প্রতিদিন বইমেলায় কোনো কোনো নতুন বই আসছে তার খবর থাকত। সেটা দেখে দেখে আমি পছন্দের বইয়ের নাম এবং প্রকাশনা সংস্থার নাম লিখে রাখতাম। তারপর একদিন সময় নিয়ে বইমেলায় খুঁজে খুঁজে সেই বইগুলো কিনে আনতাম।

এভাবে একসময় বুয়েট থেকে পাস করে চাকরিজীবন শুরু হলো। পূর্ব রাজাবাজারে বুয়েটেরই আরও কয়েকজনের সঙ্গে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে আমরা থাকতাম। সেখানেও রাখা হতো প্রথম আলো। আমরা সবাই কোনো না কোনো টেলিকম কোম্পানিতে চাকরি করতাম। আমি ছাড়া সবারই টার্গেট ছিল বিসিএস। ওরা সবাই পড়াশোনার পাতাটা মনোযোগ দিয়ে পড়ত। আমিও একসময় বিসিএস দেওয়ার জন্য মন স্থির করলাম এবং আমিও পড়াশোনার পাতা পড়া শুরু করেছিলাম। এরপর একসময় বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগও দিয়েছিলাম দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া আসার আগপর্যন্ত। এভাবেই প্রথম আলো আমাদের পরিবারের একেবারে একান্ত আপনজন।

বিজ্ঞাপন
default-image

একসময় প্রতিচিন্তা বলে একটা বইয়ের আকারের পত্রিকা প্রকাশ করা হলো। সেটারও একেবারে প্রথম সংখ্যা থেকে আমি সংগ্রহে রাখতাম। তারপর এল কিশোর আলো। কিশোর আলোর প্রথম দিকের প্রায় সবগুলো সংখ্যা আমাদের বাসায় সংগ্রহে আছে। আর প্রথম আলোর ঈদসংখ্যা ছিল আমাদের ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দিতে। এক মলাটে অনেকগুলো উপন্যাস, গল্প, কার্টুন আরও কত কী যে পাওয়া যেত। আলাদা আলাদাভাবে উপন্যাসগুলো কিনতে গেলে অনেক টাকা লাগে কিন্তু তার পরিবর্তে প্রথম আলো ঈদসংখ্যায় কিন্তু অনেক কম টাকায় সবগুলো উপন্যাস পাওয়া যেত। এরপর একসময় প্রথম আলোর সহযোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল প্রথমা প্রকাশন। আজিজ সুপার মার্কেটের এবং চট্টগ্রামের জামাল খান রোডের প্রথমা থেকে কত যে বই কিনেছি তার ইয়ত্তা নেই, যদিও প্রথমার বইগুলোকে আমার একটু বেশি দামিই মনে হতো। এখনো কেউ দেশে গেলে প্রথমার বইয়ের তালিকা ধরিয়ে দিই। এভাবেই পড়া হয়ে গেছে ‘একজন কমলালেবু’সহ আরও অনেক বই।

২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া আসার পর থেকে দেশের সব খবর সবার আগে জানার জন্য প্রথম আলো ছিল এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। প্রতিদিন ঠিক কতবার যে প্রথম আলোতে ঢুঁ মারি তার কোনো ইয়ত্তা নেই। মাঝে মাঝে গিন্নি রাগ করে বলত, তুমি যতবার প্রথম আলো পড়ো ততবার তো আমার সঙ্গে কথাও বলো না। ফেসবুকে আগে থেকেই লেখালেখির অভ্যাস ছিল। প্রবাসী হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় ফেসবুকে একটা লেখা লিখেছিলাম ‘প্রিয়জনের ওম’ শিরোনামে। সেটা পরে বন্ধু মহলের সবাই উৎসাহ দিল প্রথম আলোতে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। পাঠিয়ে দিয়ে ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ একদিন দূর পরবাস পাতা থেকে একটা ই–মেইল পেলাম যে আমার লেখাটা প্রকাশিত হয়েছে। এরপর থেকে অবিরাম লিখে যাচ্ছি গত পাঁচ বছর।

default-image

বিদেশ জীবনে আমাদের সবচেয়ে বড় অবলম্বন দেশের শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের স্মৃতি। আমার লেখার বিষয়বস্তু সেটাই। এই লেখাগুলো পড়ে অনেক মানুষ ই–মেইল করে শুভকামনা জানিয়েছেন, সময়ে–সময়ে যেটা আমাকে লেখালেখি চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে। আর এই বিদেশ বিভুঁয়েও আমি আমার বাচ্চাদের দেশের শৈশবের একটা স্পর্শ দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। সেটা দেখেও অনেকে উৎসাহিত হয়েছেন দেখে আমি আরও উৎসাহ পেয়েছি বাচ্চাদের একটা দুরন্ত শৈশব উপহার দেওয়ার ব্যাপারে।
প্রথম আলোর শুরু থেকেই সময়ে–সময়ে একটা করে স্লোগান ছিল যেমন, ‘যা কিছু ভালো তার সঙ্গে প্রথম আলো’, ‘বদলে যাও, বদলে দাও’, ‘পথ হারাবে না বাংলাদেশ’, ‘ভালোর সাথে আলোর পথে’। প্রথম আলো অনেক সামাজিক–সাংস্কৃতিক কাজের পাশাপাশি গসচেতনতা তৈরিতে কাজ করেছে যেমন—বাংলাদেশের একসময় অ্যাসিড–সন্ত্রাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই অ্যাসিড–সন্ত্রাস রোধকল্পে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি সামাজিক–সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আয়োজন করেছিল বহু কনসার্টের। এরপর একসময়ে মহামারি অ্যাসিড–সন্ত্রাস বাংলাদেশ থেকে নির্মূল হয়ে যায়। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আমার মনে হয় প্রথম আলো ধর্ষণ এবং বলাৎকার রোধকল্পে এমন একটা উদ্যোগ নিতে পারে, কারণ এগুলোর শিকার মানুষ আর কখনোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে না। আর আমাদের সমাজে ধর্ষণের শিকার মানুষদের সহজে গ্রহণও করা হয়নি। আমার মনে হয় প্রথম আলো ঠিক এই জায়গাটাতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আমাদের তারুণ্যে প্রথম আলো আত্মপ্রকাশ করেছিল। আমরা যেমন তারুণ্য, যৌবন পেরিয়ে বার্ধ্যকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, প্রথম আলোও তেমনি দিনে দিনে বিরাট মহিরুহের আকার ধারণ করছে। প্রতিষ্ঠার ২২ বছর পূর্তিতে অনেক অনেক শুভকামনা রইল প্রিয় প্রথম আলোর জন্য। প্রথম আলোর পথচলা অব্যাহত থাকুক। আমাদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ দেওয়ার পাশাপাশি অব্যাহত থাকুক তার সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড। প্রথম আলোর জন্য অবিরাম ভালোবাসা।

মন্তব্য পড়ুন 0