প্রবাসজীবনে তিনটি ঈদ

বিজ্ঞাপন
default-image

জীবন চলার পথে আবেগকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে, জীবনকে নিয়ে যাওয়া হয় এক অনিশ্চয়তার দিকে। স্বদেশের প্রতি অনুরাগ, মানুষের প্রতি প্রেম মোর তরে এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো আমার চলার পথে কিছুটা ত্রুটিও ছিল। আশার আলো আলেয়া হয়ে যায়। যে পথে পা ফেলি, সেই পথে কাঁটা। এই জগতে নিতে চায় সবাই, দিতে নাহি চায় কোনো কিছু। পাওয়া যায় না মমতা। যেটুকু ভাগ্যে মেলে, সেটুকুও বঞ্চনা। এই হলো আমাদের সমাজব্যবস্থা। আমাদের ব্রত।

জীবন নামের গাড়িটাকে ঠেলতে ঠেলতে হাওয়ায় জাহাজে উড়ে স্থির হতে হয় প্রবাসজীবনে এসে। যে মানুষটি একবার গাঁয়ের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ দিয়ে হাঁটলে দুবেলা না খেলেও, তার কোনো খিদে লাগত না। যে মানুষটি স্বদেশের বুকে ঘুরে বেড়াত প্রাণ খুলে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, রাঙামাটি আদিবাসীর জীবন, বান্দরবানের পাহাড়, খাগড়াছড়ির সাদা মেঘ এসব প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য দেখে যে মানুষটি স্বদেশের প্রতি ঠেকাত শির। যার মন নিরন্তর গাইত, ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার তরে ঠেকাই মাথা...’।

সেই মানুষটি আজ বাস্তবতার কাছে অতি অসহায় হয়ে প্রাণধারণ করছে বাংলাদেশ থেকে সুদূরে সিঙ্গাপুরে। গত (২০১৯) জুন মাসের একেবারে শেষ প্রান্তে সিঙ্গাপুরে আসা। এসেই যেন দেখে রঙিন জগতের আবির্ভাব। পরিচিতজনদের দেখা মেলতে থাকে। এখানে যাওয়া, ওখানে যাওয়া এ যেন দ্বিতীয় আরেকটা বাংলাদেশে এসে পড়েছে। প্রথম দিকে গ্যালাইন-১২ তে ‘ভিউ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল’ নামের একটা আবাসিক হোটেলে থাকা হতো।

প্রবাসজীবনের প্রথম ঈদটি উদযাপন করা হয় গ্যালাইনে থাকাকালীন। ঈদুল আজহার ছুটি ছিল দুই দিন। সঙ্গে পরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন রোববার। সেই তিন দিন ছুটে বেড়িয়েছি সিঙ্গাপুরে। আরব সাগরের তীর ঘেঁষে ইস্ট কোস্ট পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, মেরিনা, শান্তুসাসহ ঘুরেছি সিঙ্গাপুরের দর্শনীয় স্থানগুলোয়। প্রবাসজীবনের প্রভাবটা বুঝতে পারিনি প্রথম দিকে। মাস দুয়েক বাদে মালিকের কথামতো চলে আসতে হয় ক্রাঞ্জি ডরমিটরিতে। এখানে এসে প্রিয়জনদের আরও নিকটে পেলাম। আনন্দের আর সীমা থাকল না।

দ্বিতীয় ঈদ বলতে, তেমন কোনো আনন্দ ছিল না। সিঙ্গাপুরে কোভিড-১৯–এর প্রাদুর্ভাবের ফলে সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী হোম কোয়ারেন্টিনের জীবন যাপন করতে হয়। বন্দিজীবনে ঈদে যতটুকু ভালো থাকা যায়। পরিচিত–স্বজনের দেখা আর মেলে না। বাতাসের যন্ত্রের মাধ্যমে মাঝেমধ্যে কথা হয়। শুধু বুকের মধ্যে একটা চাপা কষ্ট অনুভব করা হয়। বারবার আশান্বিত মনে ভাবা হয়, এই বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে।

প্রবাসজীবনের তৃতীয় ঈদ ৩১ জুলাই সিঙ্গাপুরে (ঈদুল আজহা) উদযাপিত হবে। প্রায় চার মাস ধরে একই কক্ষে আছি। সেখানেই ঈদ! অর্থাৎ দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঈদ একই পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে। এই হলো আমার প্রবাসজীবন। যে জীবনে সবচেয়ে আনন্দের তিনটি উৎসবের মাঝে দুটিতে গৃহবন্দী অবস্থাতে থাকতে হয়েছে। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। মাঝেমধ্যে মনে হয়, ঈদ কী? কত দিন ধরে ঈদের আনন্দ উপভোগ করি না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন