default-image

আমরা যারা প্রবাসী, তাদের সবার কাছে না হলেও অনেকের কাছে ফেব্রুয়ারি মাস বা ২১ তারিখটি আলাদাভাবে চিহ্নিত ৷ দেশে না থাকলেও বাঙালি, বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য এই দিনটি স্বতন্ত্র তাৎপর্য বহন করে আসছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সাল থেকে মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে স্বাধিকার সংগ্রামের বীজ বপন হয় কোটি বাঙালির হৃদয় জমিনে। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে পরিষদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়ে স্বাধিকার আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। দিনটি ছিল ’৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। আগুন ঝরা দ্রোহ আর বাঙালি সত্তার জাগরণে অমর একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তী সময়ে একাত্তরে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা অর্জন। আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে আছে একুশে ফেব্রুয়ারি। বেদনার রঙে আঁকা বিবর্ণ সুখস্মৃতি। কালের বিবর্তনে এখন গোটা ফেব্রুয়ারিই যেন বাংলা ভাষার মাস। আত্মমর্যাদা বিকাশে চেতনা আন্দোলনের স্মারক।

বাঙালির দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপ অভিযানের মতোই ১৯৬২ সালে অস্ট্রেলিয়া অভিযানের শুরু। পর্যায়ক্রমে অভিবাসীদের সংখ্যার বৃদ্ধিতে প্রতিভাবানদের সারিও প্রসারিত হয়েছে। তারা জানতেন একটি জাতির ভাষার বিকাশ ঘটে চর্চা ও ব্যবহারের মাধ্যমে। প্রথমে ড্রয়িং রুম দিয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু হলেও বিন্দু থেকে বৃত্তে রূপ দেওয়ার প্রয়াসে সিডনিতে একুশে একাডেমির পথ চলা। মূলধারার সংস্কৃতির সঙ্গে সিডনিতে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিও উৎসব আমেজে পালন করল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। অনুষ্ঠিত হয়েছে একুশের প্রভাতফেরি ও বইমেলা।

default-image

নির্মল পালসহ আরও বেশ কয়েকজন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশির প্রচেষ্টায় ২০০৪ সালে গঠিত হয় একুশে পরিষদ। যার পরিবর্তিত নাম ‘একুশে একাডেমি’। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ একুশে একাডেমি অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগে বাঙালির ভাষাগত মর্যাদা ও মননের প্রতীক শহীদ মিনার নির্মিত হয় সিডনির বুকে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় অস্ট্রেলিয়ার সিডনির অ্যাশফিল্ড হেরিটেজ পার্কে শহীদ মিনারটির নির্মাণ করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে প্রাপ্ত অনুদান ও স্থানীয় বাংলাদেশিদের আর্থিক সহায়তায় নির্মিত এই সৌধ আজ প্রশান্ত পাড়ের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সম্প্রীতির বিনে সুতার মালা! বেদনাদীর্ণ হৃদয়ে মহান একুশের চেতনা মাতৃভাষাকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার। এ দিনটিকে কেন্দ্র করে বিশ্বের ছয় হাজার ৩১০টি ভাষাভাষী মানুষ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে নিজ নিজ ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, উদযাপন হয় মহান একুশে ফেব্রুয়ারি।
প্রতিবছরের মতো এবারও অ্যাশফিল্ড হেরিটেজ পার্কে উদযাপিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও বইমেলা। ‘এসো বাংলার মাটির ভাষার ছেলেরা আজকে, সেই ফাল্গুন এসেছে আবার ফেব্রুয়ারির সেই রাজপথ ক্ষুব্ধ নীরব-বাতাস বন্য, আজকে মিছিল হৃদয়ে হৃদয়ে তোমার জন্য’ জয়ধ্বনি দিয়ে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল বৃষ্টিস্নাত হেরিটেজ পার্ক। ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিসহ সর্বস্তরের অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি। এ আয়োজনে অতিথি বক্তা হিসেবে উপস্থিত

default-image

ছিলেন স্থানীয় মেয়র, এমপি ও কাউন্সিলরসহ লেবার ও লিবারেল পার্টির কর্মী ও নেতারা। পুষ্পস্তবক অর্পণ, প্রভাতফেরি ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান চলে। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে বইমেলা সেজেছিল দুই বাংলার কীর্তিমান লেখকদের অগণিত বই দিয়ে। আমাদের দেশের নামীদামি প্রতিভাবান থেকে শুরু করে নবীন লেখকদের অনেক বইই হাতছানি দিয়েছে সব পাঠক হৃদয়কে। তা ছাড়া একুশের গান, কবিতা আবৃতি, দলীয় সংগীত, একক সংগীত, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণী উৎসবসহ স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিও ছিল। আগত বাচ্চাদের জন্য আলাদা বিনোদন ব্যবস্থার জন্য ছিল জাম্পিং ক্যাসেল। আরও ছিল রকমারি মুখরোচক সব খাবারের দোকান। সবাই নিজেদের উদ্যোগে শখের বশে এগুলো করে থাকেন, তবে লাভের অংশটাও দিন শেষে কম না। আনুমানিক প্রায় ২০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশিসহ অন্যান্য ভাষার মানুষজনের আনাগোনাও চোখে পড়ার মতো।
বিকেলে একুশে একাডেমি অস্ট্রেলিয়া আয়োজিত সেলিম আল দীনের ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’ নাটক মঞ্চস্থ হয়। নির্দেশনায় ছিলেন সিডনিপ্রবাসী জনপ্রিয় অভিনেতা শাহিন শাহনেওয়াজ। নাটকটি মঞ্চায়নে আসা দর্শকদের প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে সাহিত্য সংস্কৃতির খরায় ব্যাপক জলরাশির হয়ে ধরা দিয়েছে।
রক্তরাঙা ফাল্গুনের আগুনমুখা দিন মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। শোক ও শ্রদ্ধায় অবনত বাঙালির অবিস্মরণীয় সংগ্রামের দিন। এ দিনই প্রথম খুলেছিল বাঙালির কালজয়ী সব সংগ্রামের উৎসমুখ। এ দিনটিই বাঙালিকে নতুন করে বেঁধেছে হাজার বছরের ঐতিহ্য সংস্কৃতির বন্ধনে৷

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন