default-image

ছবির এই মানুষটার নাম আন্না কুমারী বিশ্বাস, আমার কর্তা, আমার দাদি। নিজের দাদির বাইরে এই মানুষটা এবং ওনার জা রেখা রানী বিশ্বাস ছিলেন আমার কাছে নিজের দাদির চেয়েও আপন। নদীভাঙনের পর যখন আমরা কুষ্টিয়ার শহরতলি বাড়াদীতে চলে এসেছিলাম, স্বভাবতই দাদি ছোট দুই চাচার সঙ্গে চরভবানীপুর থেকে গিয়েছিলেন। তখন আমাদের জীবনে দাদির অভাব পূরণ করেছিলেন এই দুজন মানুষ।

দের স্বামীরা যথাক্রমে বলাইচন্দ্র বিশ্বাস ও কেশরীচন্দ্র বিশ্বাসকে আমরা ডাকতাম দাদু।

বলাই দাদু আমার দেখা সবচেয়ে মজার মানুষের একজন। ওনার কাছ থেকে আমরা কত রকমের যে ধাঁধা শিখেছিলাম, তার ইয়ত্তা নেই। একটা ধাঁধার কথা এখনো মনে আছে। উনি একদিন হঠাৎ আমাদের ডেকে বললেন, মরা গরু হাঁটি যাতি দেখিছিস? আমরা বললাম, ধুর দাদু, খালি হেঁয়ালি করো। মরা গরু আবার হেঁটে যায় নাকি? উনি বললেন, যা, এক দিন সময় দিলাম। এই ধাঁধার উত্তর খুঁজে নিয়ে আয়। আমরা সারা দিন এই ধাঁধা মাথায় নিয়ে ঘুরলাম। কোনো কাজে মন দিতে পারলাম না। এমনকি রাতে ঘুমও হলো না ঠিকমতো। পরদিন সকালবেলা আমরা দল বেঁধে দাদুর কাছে হাজির।

বিজ্ঞাপন

দাদু বললেন, তোদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না। শোন, মরা গরু রাস্তার পাশে পড়ি আছে, আমি হাঁটি যাওয়ার সময় দেখিছি। আমরা তো রেগে আগুন। এটা কোনো ধাঁধা হলো। দাদুর শুধু হেঁয়ালি। এভাবে প্রায়ই দাদুর কাছে আমাদের ‘সবজান্তা দাদুর আসর’ বসত। দাদুর গায়ের রং ছিল দুধে আলতা যাকে বলে তাই। দাদু খুব সুন্দর খোল বাজাতে পারতেন। দাদু যেকোনো কীর্তনের আসরে খোল বাজানোর দায়িত্ব নিতেন। খোল বাজানোর সময় দাদু খোলের শব্দের তালে তালে মাথা নাড়তেন। দাদুর মাথা নাড়ানো ছিল আমাদের কাছে একটা শিল্প। সেই তুলনায় ওনার ছোট ভাই কেশরীচন্দ্র একটু চুপচাপ স্বভাবের ছিলেন। অবশ্য আমাদের সঙ্গে ঠিকই মজা করতেন।

এবার আসি কর্তাদের কথায়। ওনারা সত্যিকার অর্থেই পরিবারের কর্তা ছিলেন। দাদুরা তো সামান্য উপার্জন করেই দায়িত্ব শেষ করতেন। সংসার চালানোর গুরুদায়িত্ব ছিল কর্তাদের ওপর। কর্তা দুজন আমাদের দলটাকে প্রচণ্ড স্নেহ করতেন। কেন জানি আমাদের দুভাইকে একটু বেশি আদর করতেন। হয়তোবা আমরা দুষ্টুকুল শিরোমণি ছিলাম—এ কারণে। প্রতিটি পূজাপার্বণে আমরা ছিলাম ওনাদের অনিমন্ত্রিত অতিথি। আর কোনো সময় যদি আমরা মিস করতাম, তাহলে আমাদের বাসায় এসে খাবার দিয়ে যেতেন। ওনাদের গাছের আম, কুল আমরা সবাই দল বেঁধে পেড়ে দিতাম। আবার দরকার হলে রাতের আঁধারে চুরিও করতাম।

আমরা অনেক বয়স হওয়ার পর জেনেছি, ধর্মীয় উৎসবগুলো আলাদা আলাদা। তার আগপর্যন্ত ঈদ, পূজা—সবকিছুতেই আমাদের ছিল সমান অংশগ্রহণ। মসজিদে আসরের নামাজ পরেই আমরা বাড়ির পেছনের অবারিত মাঠে হাঁটতে চলে যেতাম। ফিরতাম মাগরিবের আজানের সময়। তারপর একবারে মাগরিবের নামাজ পরে বাড়ি ফিরতাম। তখন তো আর এত ঘড়ির চল ছিল না। সন্ধ্যার সময় কর্তারা শঙ্খে ফুঁ দিয়ে একটা পূজা দিতেন। আমরা কান খাড়া করে রাখতাম কখন উনারা ফুঁ দেবেন। তার মানে হলো কিছুক্ষণের মধ্যেই মাগরিবের আজান দেবে। আর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ঘরে ধূপ জ্বালিয়ে মশা তাড়ানো ছিল নিত্যদিনের রুটিন। তখন সারা পাড়া ধূপের গন্ধে ভরে যেত।

default-image

একটা ঘটনা এখনো আমার মনে দাগ কেটে আছে। যত দূর মনে পড়ে, আসরের নামাজ পরে আমরা বাইরে বের হয়েছি। দেখি, মসজিদের বাইরে রাস্তার ওপর রেখা কর্তা ওনার এক নাতনিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতের টিনের গ্লাসে পানি। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কী করছ এখানে? উনি বললেন, নাতনির শরীরটা একটু খারাপ। তাই ভাবলাম হুজুরের কাছ থেকে একটু পানিপড়া নিয়ে আসি। একটু পরে হুজুর মসজিদ থেকে বের হয়ে প্রথমে কর্তার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে দিলেন। এরপর ওনার নাতনির মাথায় হাত রেখে দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দিয়ে দিলেন। এটা আমার কিশোর মনে রেখাপাত করেছিল, তাই এখনো চোখ বন্ধ করলে রেখা কর্তাকে দেখতে পাই। আর আমাদের ঠান্ডা–কাশির একমাত্র ওষুধ ছিল কর্তাদের তুলসীগাছের পাতা। হিন্দু–মুসলমান বন্ধনের এমন আরও অনেক উদাহরণ আমার স্মৃতিতে আছে।

ফিরে আসি কর্তাদের কথায়। বলাই দাদু গত হয়েছেন অনেক আগেই। রেখা কর্তাও গত হয়েছেন। এখন বেঁচে আছেন কেশরী দাদু আর আন্না কর্তা। দেশ ছাড়ার আগে ওনাদের আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলাম। মনপ্রাণ ভরে দোয়া করেছিলেন। দেশ ছেড়ে আসার পর প্রথম দিকে প্রায়ই কথা হতো। কর্তা আমাদের সময়ের পার্থক্য শুনে খুবই অবাক হয়েছিলেন। কদিন ধরে কর্তার শরীর খারাপ ছিল। তাই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন। আজ সনৎ কাকুর মেসেঞ্জারে ফোন দিয়ে কথা হলো। সেই নির্মল হাসি। সেই আবেগপ্রবণ কান্না। আমি বললাম, আমার দাদি তো ফাঁকি দিয়েছেন, তুমিই তো আমার দাদি। টিকিটও কাটা ছিল, কিন্তু করোনার কারণে মনে হয় এবারও আসা হবি না। দোয়া করি তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো।

শুনেই কিশোরীর মতো কেঁদে দিলেন। আমি অনেক কষ্ট করে নিজেকে সামলে রাখলাম। যাই হোক, আমাদের মাথার ওপর থেকে একটা একটা করে ছায়া সরে যাচ্ছে। যে মানুষগুলোর নিঃস্বার্থ আদরে বেড়ে উঠেছিলাম, তারা সবাই একে একে বিদায় নিচ্ছে। আন্না কুমারী বিশ্বাস বাংলাদেশ সময় ২৩ ফেব্রুয়ারি ১১টা ৫০ মিনিটে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন। মাথার ওপর থেকে একটা একটা করে ছায়া সরে গেল। দাদি, কর্তা বলে ডাকার আর কেউ থাকল না।

বিজ্ঞাপন

এটা আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষত। আমাদের যত সব দস্যিপনার উৎসাহদাতা ও আশ্রয়দাতা ছিলেন আমাদের দাদি আর কর্তারা। ওনাদের সাহস পেয়েই জীবনের সব অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলাম আমরা কিন্তু নিঃস্বার্থভাবে মনের শক্তি জুগিয়ে যাওয়া এসব মানুষ একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় হয়তোবা আমরাও হারিয়ে যাব কালের গর্ভে। কর্তা যেখানেই থাকো, ভালো থেকো—এই দোয়া করি। তোমার মুখের কোণে লেগে থাকা এক চিলতে নির্মল হাসি আর দেখতে পাব না ভেবেই মনটা ভারী হয়ে যাচ্ছে।

কর্তাকে শেষবারের মতো আর দেখতে পারলাম না। আপাতত ছোট ভাই পথিকের পাঠানো ছবি দেখেই মনটাকে প্রবোধ দিতে হলো। যতবারই ছবিগুলো দেখছিলাম, ততবারই দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল। এভাবেই দূর পরবাসে বসবাসকারী আমাদের সঙ্গে শিকড়ের বাঁধনগুলো একে একে আলগা হয়ে আসছে। আর আমরা আবার বোবা কান্নাটা বুকের মধ্যে আটকে রাখছি। একদিন আমরা একা হয়ে যাব এবং একদিন আমাদের নিজেদেরও বিদায়ঘণ্টা বেজে উঠবে। তবু মন মানতে চাই না। সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে থেকে প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখতে না পারার আক্ষেপটা বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে বাকি জীবন আর মাঝেমধ্যে বুক থেকে বেরিয়ে যাবে এক একটা দীর্ঘশ্বাস।

*মো. ইয়াকুব আলী, মিন্টো, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন