default-image

পড়াশোনার জন্য আমরা ইতালির মিলান শহরে আছি। আমরা আমাদের মাতৃভূমির বিশেষ দিনগুলো যতটুকু সম্ভব উদ্যাপন করার চেষ্টা করি, কখনো স্বল্প পরিসরে, কখনো একটু বড় পরিসরে। তবে কার্যদিবসের কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট দিনে পালন করা সম্ভব হয় না, অপেক্ষা করতে হয়, পরবর্তী সাপ্তাহিক ছুটির দিন পর্যন্ত। এ বছরের ১৬ ডিসেম্বর ছিল কার্যদিবস। আমাদের কয়েকজন ঠিক করলাম কার্যদিবস সত্ত্বেও ওই দিনেই বিজয় দিবস পালন করব। যে ভাবা সেই কাজ, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমাদের একটা ফেসবুক গ্রুপ আছে, সেখানে জানানো হলো। সপ্তাহ ঘুরে, ১৬ ডিসেম্বরের দুদিন আগে দেখা গেল অনেকের মধ্যে পাঁচ-ছয়জন কিছু করতে পারব, তাও সন্ধ্যার পরে। যেহেতু পাঁচ-ছয়জন দিয়ে অনুষ্ঠান করা সম্ভব না, তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম হাতে মুখে আমাদের প্রাণপ্রিয় লাল সবুজ পতাকা এঁকে কোনো পাবলিক স্থানে যাব, সঙ্গে থাকবে ব্যানারসদৃশ কাগজের প্রিন্ট আর এক পৃষ্ঠার বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের লিফলেট। মিলান শহরে পাবলিক স্থানের নাম বললেই প্রথমে আসবে বিখ্যাত ডুওমো চার্চ, যা

default-image

পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম এবং ইতালির সবচেয়ে বড় চার্চ। ছুটির দিন, এমনকি সাধারণ দিনেও স্থানীয় লোক ও পর্যটকদের ভিড় লক্ষ করার মতো। ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় কিছুটা দ্বিধা সংকোচ নিয়ে আমরা যার যার মতো কর্মস্থল থেকে রওনা দিলাম। ডুওমো চার্চ চত্বরে পৌঁছালাম সাতটার দিকে। ডিসেম্বর মাস, বিকেল পাঁচটার আগেই সন্ধ্যা হয়ে যায়, তার ওপর হালকা বৃষ্টি ছিল সব মিলিয়ে মানুষের উপস্তিতি ছিল একটু কম। আমরা একে অপরের হাতে মুখে ছোট আকারের লাল সবুজ পতাকা লাগিয়ে দিই এরপর ব্যানারসদৃশ কাগজের প্রিন্ট হাতে নিয়ে লাখো শহীদের উদ্দেশে এক মিনিট নিরাবতা পালন করি। কিছু উত্সুক ইতালিয়ান ও পর্যটক আমাদের কাছে এসে জানতে চায় আমরা কী করছি, অনেকে আমাদের পতাকা দেখে ‘বাংলাদেশি’ বলে সম্বোধন করে, তাঁদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করি। এরপর আমরা নিজেদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা বর্ণনা করি বিশেষত নিজেদের পরিবারে ঘটে যাওয়া বা পরিবার থেকে শোনা সত্য ঘটনা।
আস্তে আস্তে রাত বাড়তে থাকে, ডুওমো চত্বরও ফাঁকা হতে থাকে, কিন্তু তখনো জানি না আমাদের জন্য কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে। বলে রাখা ভালো, মিলান শহরে অনেক বাংলাদেশি বসবাস করেন, যাঁরা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। তেমনই কয়েকজন অপরিচিত বাংলাদেশি ভাই আমাদের পতাকা দেখে এগিয়ে আসেন এবং আমদের সঙ্গে বিজয় দিবস উদ্যাপন করতে চান। আমরা তাঁদের ছোট আকারের লাল সবুজ পতাকা লাগিয়ে দিই। এ সময় তাঁরা খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং তাঁদের অনুভূতি বর্ণনা করেন।

default-image

তাঁদের কথার সারমর্ম একটিই: দেশে থাকতে সব সময় উদ্যাপন করেছেন, কিন্তু দেশের বাইরে আসার পর তেমনভাবে সম্ভব হয় না, পত্রপত্রিকায় খবর দেখেন আর আফসোস করেন। শুধু তা-ই না, তাঁরা ওই সময়ে তাঁদের পরিচিত আশপাশে যাঁরা আছেন, তাঁদের ফোন দিয়ে ডেকে আনেন। অনেকে ব্যস্ত থাকায় দৌড়ে এসে ছোট্ট একটি পতাকা লাগিয়ে আবার দৌড়ে চলে গেলেন। ছয়জনের ছোট্ট একটি দল থেকে মুহূর্তেই ২০ ২৫ জনের দলে পরিণত হলো। প্রথমে ছয়জন থাকায় যে দ্বিধা সংকোচ কাজ করছিল, তা শেষে এসে অনাবিল আনন্দে, অসীম আবেগে ভাসিয়ে দিয়ে গেল। সেই বিজয়ের আনন্দের ছিটেফোঁটা পরিমাণ হলেও আমরা অনুভব করলাম। যে দ্বিধা সংকোচ আমাদের মনে জমা হয়েছিল, তার জন্য ধিক্কার দিলাম। আমরা তো শুধু ছয়জন না, আমাদের সঙ্গে ছিল আমাদের প্রাণপ্রিয় লাল সবুজ পতাকা। আমরা তো তাঁদের স্মরণ করতে গিয়েছি, যাঁরা জীবন বাজি রেখে, বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আমাদের এই লাল সবুজ পতাকা উপহার দিয়েছেন। তাঁরা তো হাতের কলম, জমির লাঙল, নৌকার বৈঠা ফেলে দিয়ে প্রশিক্ষিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে দ্বিধা সংকোচ করেনি। তাঁদের দেওয়া উপহার আমরা বুকে ধারণ করি, পৃথিবীর বুকে স্বগৌরবে বলি, আমরা বীরের জাতি, আমরা বাংলাদেশি। জনম জনম ধরেও তাঁদের ঋণ শোধ হওয়ার নয়। বিজয় দিবসে তাঁদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
পাদটীকা প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের ফেসবুক গ্রুপ Bangladesh Alumni & Student Association-Italy (BASAI) আর বিদেশিদের সহজে বোঝার জন্য ব্যানারসদৃশ কাগজের প্রিন্ট ইংরেজিতে লেখা হয়েছে আশা।
মো. মুক্তাদুজ্জামান
মিলান বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালি

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন