default-image

এই দেশে আসার পর প্রথম প্রথম অদ্ভুত লাগত। নয় মাস ঠান্ডা আর তিন মাস গরম। প্রথমে সহ্য না করতে পারলেও পরে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যায়৷ এখানে বাঙালিদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে, আমরা যেকোনো দেশে যেকোনো পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারব। এখন কাউকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে মোটা সোয়েটার, তার ওপর জ্যাকেট মাথায় টুপি দেখলে ঠোঁটে মুচকি হাসি চলেই আসে। স্থানীয়রা অবশ্য একটা পাতলা টি-শার্ট পরেই বের হয়ে যায়।

মনে আছে, প্রথম ছয় মাস প্রতিটি ডলার পাই পাই হিসাব করে চলতাম। প্রতি এক ডলারের মানে ছিল বাংলাদেশি ৮০ টাকা। দেশে সেভলন ক্রিম কিনেছি ৫০ টাকায়৷ এখানে সবচেয়ে ছোট একটি সেভলন ক্রিমের দাম ৫০০ টাকা৷ তখন মনের অবস্থা কী হবে অনুমান করুন! মেলবোর্নের সবচেয়ে জনপ্রিয় দোকানগুলো হচ্ছে কোলস, সেফওয়ে ও আইজিএ। তবে কোলস দোকানটি গলির আনাচকানাচে৷ এই দোকানগুলো হচ্ছে ছোটখাটো মার্কেটের মতো। শুধু খাবার নয়, একেবারে সুঁই-সুতো থেকে শুরু করে দেয়াল ড্রিল করার মেশিন পর্যন্ত পাওয়া যায়। এদেশের সবচেয়ে ছোট দোকানেরও কাস্টমার সার্ভিস খুবই ভালো। দুই ডলারের জিনিসও ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনা যায়। কিছু কিছু দোকান কোনো কিছু কেনাকাটা না করলেও টাকা তুলতে দেয় বিনা মূল্যে! আমি যখন নতুন তখন আমার কাছে দেশ থেকে নিয়ে আসা সব ১০০ ডলারের নোট। ১০০ ডলার মানে অনেক টাকা। সাধারণত কেউ সঙ্গে বহন করে না।
মেলবোর্নের অন্যতম বড় রেল স্টেশন হচ্ছে ফ্লিন্ডার্স স্ট্রিট এবং সাউদার্ন ক্রস। প্রতিদিন সকালেই স্টেশনের বাইরে বা ভেতরে কিছু না কিছু বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। দেশের সব বড় কোম্পানি থেকে ছোট কোম্পানি তাদের পণ্যের মার্কেটিংয়ের জন্য বিনা মূল্যে ছোট ছোট পণ্য বিতরণ করে। হয়তো একদিন সকালে বিনা মূল্যে পুরো ব্রেকফাস্ট, অন্যদিন হয়তো সাবান। বিনা মূল্যে বলে নিম্নমানের ​িকছু নয়। একই জিনিস দোকানে গেলে হয়তো ৫ ডলার থেকে ২০ ডলার হবে। এই বিনা মূল্যের সামগ্রীও মেলবোর্নবাসীর নেওয়ার সময় নেই। যে যার মতো করে চলে যাচ্ছে। মেলবোর্নের বড় বড় ট্রেন স্টেশনগুলোতে সোমবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত বিনা মূল্যে খবরের কাগজ বিতরণ করা হয় এবং তা সবাই মনযোগ দিয়ে পড়ে। বিনা মূল্যের এই খবরের কাগজে এক নজর বুলালেই বড় খবরগুলো জানা যায়। কালেভদ্রে হয়তো দেখা যায় নিজের দেশের কোনো ছবি!

default-image


আর যানজট! হ্যাঁ, মেলবোর্নেও হয়! সকালে অফিসের সময় এবং সন্ধ্যায় যখন অফিস ছুটি হয়। এক্কেবারে ঢাকার মতিঝিলের মতো যানযট হয়। তবে হ্যাঁ, বড়জোর ২০ মিনিট দেরি হবে সব মিলিয়ে৷ যদি না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটে। এই দেশে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটে। পুরো অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে মেলবোর্নে গাড়ি দুর্ঘটনা সবচেয়ে কম। তার প্রধান কারণ হচ্ছে যানবাহন বিভাগের অতিরিক্ত রকম কড়াকড়ি। এখানে স্পিড আইন অমান্য করলে সর্বনিম্ন জরিমানা হচ্ছে ৩০০ ডলারের মতো এবং লাইসেন্স থেকে ৩ পয়েন্ট কাটা যাবে। যদি রাস্তায় কোনো পুলিশ তাড়া না-ও করে, বাসায় ফাইন ও পয়েন্ট কাটা গেছে এ ধরনের একটি সুন্দর চিঠি পরবর্তী সপ্তাহে পৌঁছে যায়। একজন ফুল লাইসেন্সধারীর পয়েন্ট হচ্ছে ১২৷ সব পয়েন্ট কাটা গেলে তার লাইসেন্স বাতিল।
এই রাজ্যে গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্সকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ফুল লাইসেন্স: তার গাড়ি চালানোর কোনো রকম নিষেধ নেই। প্রবিহিশন: গাড়ি চালাতে হলে তিন থেকে ছয় বছর ধরে৷ গাড়িতে সবুজ অথবা লাল রঙের ‘পি’ স্টিকার লাগিয়ে চালাতে হবে। কেউ হয়তো আলসেমো করে লাগায়নি, ধরা পড়লে তার লাইসেন্স বাতিল! এবং লারনার: এরা গাড়ি চালানো শিখছে। শুধু পাশে একজন ফুল লাইসেন্সধারী থাকলেই এরা গাড়ি চালাতে পারবে৷ অবশ্যই গাড়িতে হলুদ রঙের ‘এল’ স্টিকার লাগাতে হবে।
এদেশের অনেক বাড়ি কাঠের তৈরি। হলিউড সিনেমায় দেখে ভাবতাম, এক ঘুষিতে দেয়াল ভেঙে দেয় কীভাবে! এখন বুঝি, সম্ভব। মূলত বাইরের কাঠামো ইট বা অন্য কোনো মজবুত পদার্থে তৈরি হয় কিন্তু ভেতরের েদয়াল এক ধরনের কাঠ দিয়ে তৈরি। যদি আপনার শক্তি থাকে, তাহলে এক ঘুষিতেই দেয়াল ভাঙতে পারবেন। আর এখানে শহর ছাড়া অন্য কোথাও দুই তলার বেশি বড় বাড়ি কোথাও দেখা যায় না। সরকারের অনুমতি ছাড়া নিজের বাসাতেও অনেক কিছু করা যায় না। যদি জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির পেছন দিকের উঠান দেখা যায়, তাহলে ওই জানালায় ঘোলা কাচ লাগাতে হবে। অনেক ধরনের গাছ আছে, যা অনুমতি ছাড়া লাগানো যায় না। নিজের বাসার ময়লা, প্রতি সপ্তাহে বাসার সামনে একটি নির্দিষ্ট ময়লার ঝুড়িতে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দিতে হবে। ওই ময়লা স্বয়ংক্রিয় গাড়ি এসে নিয়ে যাবে। যে ময়লার ঝুড়ি দেওয়া হবে, তার চেয়ে বেশি ময়লা করা অস্ট্রেলিয়ার কোনো কোনো স্থানে বড় ধরনের অপরাধ!

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন