বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

তারপর এপার থেকে ওপারে চলে যাই। কখনোবা পাড়ের কংক্রিটের বাঁধ বেয়ে ওঠার চেষ্টা করি আমরা। এমনকি রায়ানও চেষ্টা করে ওপরে ওঠার।
আমরা কাগজের নৌকা বানিয়ে একদিন নদীতে ভাসাব, যদিও এখন পর্যন্ত সেটা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। একটু পরপর ব্রিজের ওপর দিয়ে যখন রেলগাড়ি যায়, তখন রায়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে দুই পাশ থেকে দুটি রেলগাড়ি এসে পড়লে আমরা বের করার চেষ্টা করি কোনটা আগে অন্যটাকে অতিক্রম করবে। কিন্তু তার আগেই রেলগাড়ি দুটি চলে যায়। পানির শব্দ রায়ানকে খুব টানে। সে একেবারে কিনারে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করে সেই শব্দের উৎস কোথায়? আমি কিছু বলি না, কিন্তু ওর মা মানা করে, কারণ, কখন আবার কোন দুর্ঘটনা ঘটে। ক্রিকের পাড়ের বড় বড় ঘাস রায়ানের খুব পছন্দ। সে ঘাসগুলোর মধ্য দিয়ে আপনমনে হাঁটে আর হাত দিয়ে ঘাসের পাতা ছেঁড়ার বৃথা চেষ্টা করে। তাহিয়া কাঠের রেলিংয়ে উঠে এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ভারসাম্য রেখে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করে। বেশির ভাগ সময়ই পারে, তবে মাঝেমধ্যে পড়ে যায়। বিকেলে এলে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায় কিন্তু আমাদের খেলা আর শেষ হতে চায় না। কিন্তু তবু একসময় আমাদের ফিরে আসতে হয়।

default-image

২. মাঝেমধ্যে রায়ানকে ঘুম পাড়ানোর অজুহাতে আমরা গভীর রাতে আউটিংয়ে যাই। বাসার পেছনের রাস্তায় আমরা একটা ঢালু জায়গা আবিষ্কার করি। রাস্তার গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। কিন্তু ১০০ কিলোমিটারে বেগে গেলে রোলার কোস্টারে যেমন মানুষ মাঝেমধ্যে নিজেকে ওজনহীন মনে করে, এখানেও তেমনি একটা অনুভূতি হয়। তাহিয়া অনেক মজা পেয়ে যায় সেটাতে। আমরা বাসায় ফেরার পথে মাঝেমধ্যে সেই রাস্তায় গিয়ে মহাকাশযানের একটু স্বাদ নিয়ে আসি। সেই রাস্তা ধরে একটু এগোলেই একেবারে পুরোদস্তুর অস্ট্রেলিয়ান গ্রাম পাওয়া যায়। অনেক বড় বড় বাগানবাড়ি। আর তার চারপাশে বিভিন্ন রকমের খেত। এ ছাড়া কোনো কোনো বাড়িতে ঘোড়া বা ছাগলের খামারের দেখা মিলে। এ ছাড়া কিছু মানুষ জমি লিজ নিয়ে পাশের সাব-আর্ব থেকে এসে চাষাবাদ করেন। একেবারে হুবহু বাংলাদেশের খেত পাহারা দেওয়ার সেই কুঁড়েঘর। কৃষকের মাথায় সেই বাঁশের চলার তৈরি মাথাল। আলোর জন্য আছে হ্যাজাক বাতি। সেই সব খেতে একই সঙ্গে চাষ হচ্ছে কলা, আলু, আখ, কচু, ঢ্যাঁড়স, মিষ্টি আলু।

default-image

একদিন দুই খেতের মালিকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। রাস্তার পাশের প্রথম খেতের মালিক ‘হেতি’ আর পাশেরটা তার বোন ‘পলি’র। আমার মায়ের বয়সী দুজন। ওনারা খেত করতে এসেও মাথায় ফুল ও পাতার সমন্বয়ে তৈরি অনেক সুন্দর মালা পরেন। ওনাদের গায়ের রং আমার কাছাকাছি হওয়ায় আমি বললাম, তোমরা তো আসলে বাংলাদেশে ফেলে আসা আমার মা। তারপর তাঁদের সঙ্গে অনেক সময় ধরে আড্ডা দেওয়া, তাঁদের খেতের খুঁটিনাটি জানা হলো। আমি যখন বললাম, আমরাও বাংলাদেশে ঠিক একই উপায়ে চাষাবাদ করি, তাঁরা শুনে খুব অবাক হলেন। তারপর ওনাদের সঙ্গে যখন ছবি তুলতে গেলাম, তখন ওনারা এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেন আমরা ওনাদের পরিবারের সদস্য। আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন তুমি এখানে বসো, তোমার বউকে এখানে বসাও, মেয়েকে এখানে বসাও, ছেলেকে এখানে বসাও। বারবার আমার চোখ ভিজে যাচ্ছিল। মানুষ বড্ড মায়ার কাঙাল। একটুখানি মায়া পেলে মুহূর্তেই মনে হয় আমিই বোধ হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।

default-image

৩. একই রাস্তা ধরে আরও কিছু দূর এগোলে একটা আঁকাবাঁকা রাস্তা পড়ে। রাস্তার বাঁকগুলো এমন যে সামনে কিছু দূর গিয়ে মনে হয় রাস্তাটা শেষ হয়ে গেছে আর দুই পাশে ঘন বন। দিনের বেলায় গেলে তেমন একটা ভয় লাগে না কিন্তু রাতের বেলায় গেলে কেমন যেন একটা গা–ছমছমে ভাব কাজ করে। তারপর বন শেষ হয়ে রাস্তটা আবার একটা রাস্তায় গিয়ে মিলেছে। সেই রাস্তা ধরে কিছু দূর এগোলে রাস্তাটা ভূতের গলির মতো একটা জায়গায় শেষ হয়ে গেছে। সেখান থেকে আবার বন শুরু হয়েছে। সাইনবোর্ডে লেখা আছে সামনেই একটা নদী। আমরা একদিন বিকেলে গিয়ে নদীটাকে খোঁজার করার চেষ্টা করলাম। পাহাড়ি পাথুরে রাস্তা। হাঁটতে বেশ বেগ পেতে হয়। উপরন্তু অনেক বেশি ঢালু। ওই দিকে আবার সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল, তাই আমরা বিফল মনোরথে ফিরে এসেছিলাম সেদিন।

শিগগিরই হয়তোবা আবার আমরা নদীটাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ব। এই আঁকাবাঁকা রাস্তাটুকু আমাদের খুবই প্রিয়। কেমন জানি একটা দুরন্ত অভিযানের অনুভূতি কাজ করে তখন মনে। আর রাস্তাটা যেখানে শেষ হয়ে গেছে, সেখানের বেশ খানিকটা জায়গায় কোনো গাছপালা নেই। গোলাকার বৃত্তের মতো একখণ্ড আকাশ দেখা যায়। ওখান থেকে আকাশের তারাগুলোকে বড্ড বেশি কাছের মনে হয়। আর চাঁদটাকে দেখায় আরও বেশি অপূর্ব। তখন মনে মনে গুনগুন করে গেয়ে উঠি: আমি দিই চাঁদকে পাহারা ততক্ষণ তারা নিংড়ানো আলোয়...এখানে মাত্র তিনটা ঘটনার কথা বললাম। পরবর্তী সময়ে আবার হয়তো কোনো দিন একে একে বাকিগুলো বলব।

৪. পাড়া বেড়ানো আমাদের দৈনন্দিন বিনোদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীরা সারা দিন সংসারের ঘানি টানার পর বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ সময়টায় একটু অবসর পান। তখন আশপাশের বাড়ির প্রতিবেশীদের খবর নিতে যান। আমার কাছে মনে হয়েছে, গ্রামীণ জীবনের বিনোদনের সবচেয়ে বড় উপকরণ মানুষের এই পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া। এতে পুরো গ্রামটা হয়ে যায় একান্নবর্তী পরিবার। সবার সমস্যা ও সুবিধার কথা সবাই জানে। ঠিক এ কারণেই মা–বাবা সাত দিনের কথা বলে ঢাকায় এসে তিন দিনের মাথায় ফিরে যেতে চাইতেন। আমিও উত্তরাধিকারসূত্রে অভ্যাসটা পেয়েছি। গ্রামে থাকতে সব বন্ধুরা মিলে মাঠে চলে যেতাম, ফিরতাম সন্ধ্যায়। বুয়েটে থাকাকালে বন্ধু সাজ্জাদ আর আমি ছুটির দিনে বিকেলে বেরিয়ে পড়তাম। চাকরিতে থাকাকালে যখন বাংলাদেশের আনাচকানাচে ঘুরে বেড়াতাম, তখনো বিকেলে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়তাম। এভাবেই প্রায় প্রতিটা শহরের স্পেশালিটি নিয়ে একটা ধারণা পেতাম।

default-image

হেঁটে বেড়ানোর সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো সেই এলাকা সম্বন্ধে একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। এরপর মেয়ে তাহিয়াকে নিয়ে ঘুরতাম আর এখন আমাদের দলে যোগ দিয়েছে রায়ান। এভাবেই ওরা পাড়া বেড়ানোর অভ্যাসটা রপ্ত করে ফেলেছে। দিনের অন্য সময় সবাই ব্যস্ত থাকলেও বিকেলের সময়টা সবাই বাসার সামনের আঙিনায় এসে দল বেঁধে আড্ডা দেন। আমরা আসা–যাওয়ার পথে কুশল বিনিময় করি। এভাবে আমরা আমাদের অনেক প্রতিবেশীকে চিনে ফেলেছি এবং তাঁরাও আমাদের চেনেন। আর আশপাশের সব রাস্তা ও চোরাগলি এখন আমাদের নখদর্পণে। বের হতে হতে আজ একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল। বাইরে বসন্তের নাতিশীতোষ্ণ বাতাস। আর সন্ধ্যার আবছা আলোয় পরিচিত বাসাগুলো অনেক রহস্যময় ও অপরিচিত লাগছিল। সবার জন্য ফাগুনের আগুনঝরা শুভেচ্ছা।
আমাদের জীবনে হয়তো প্রাচুর্য নেই, কিন্তু যেটা আছে, সেটা হলো মানসিক প্রশান্তি। আমরা আমাদের সব অপূর্ণতাকে উপভোগ করতে শিখে গেছি। তাই পৃথিবীর কোনো অপূর্ণতাই আমাদের বেশিক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে না। আমরা আবার আমাদের সেই পুরোনো জীবনযাত্রায় ফিরে যায়। গিন্নির ভাষ্যমতে, আমাদের বাসা একটা চিড়িয়াখানা। যদিও এটা সে মজা করে বলে কিন্তু সত্যিকার অর্থেই আমরা চিড়িয়া হয়ে বাঁচতে চাই। কারণ, পৃথিবীর বুকে মানুষ আজ বড় অসুখী।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন