default-image

আমাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনা দেখে ইদানীং আমার একজন পাগলের কথা খুব বেশি করে মনে পড়ছে। পাগলটার নাম শাহজাহান, সবাই বলত ‘শাজাহান পাগলা’। কিছু দুষ্ট ছেলে যখন পাগলটার সাথে মশকরা-দুষ্টমি করত, তখন ওই পাগলটা বলত, ‘ওই পাগলামি করিস না।’
আমার জন্ম টাঙ্গাইল জেলার করটিয়াতে। তখন আমি করটিয়া হাইস্কুলের ছাত্র। সময়টা ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সন পর্যন্ত। পাগলটাকে দেখতাম স্কুলের আশপাশের কোনো এক কোনা-কামছিতে ঝিম মেরে বসে বা শুয়ে থাকতে। সে কাপড়ের মধ্যে পরত ছেঁড়া লুঙ্গি আর নোংরা একটা গেঞ্জি। মানুষের সঙ্গে তেমন একটা মিশত না, একা একাই থাকত সারা দিন। কারও কোনো ক্ষতি করত না। তার পরও কেউ কেউ তাকে অনেক জ্বালা-যন্ত্রনা দিত ।
কখনো কখনো পাগলটা মানুষজনের কাছে দুই-এক টাকা চাইত। কোনো জোর জুলুম করত না। পাগলটাকে দেখে আমার খুবই মায়া লাগত। আমি তার সঙ্গে কখনোই দুষ্টমি করতাম না৷ আর সম্ভব হলে দুই-এক টাকা দিতাম । তাকে আমি আজও ভুলতে পারিনি কারণ, সে আমার ডাক নামটা ধরে ডাকত। আমি অবাক হয়ে যেতাম, একটা বদ্ধ পাগল কীভাবে আমার নামটা মনে রাখত! আমার সঙ্গে দেখা হলেই বলত, ‘রিপন কেবা আছো?’ বাবার চাকিরর কারণে টাঙ্গাইল ছেড়েছি বহু বছর আগে, কিন্তু কখনোই ভুলতে পারিনি আমার কৈশর জীবনের দেখা শাজাহান পাগলাকে।

default-image

একবার ঘটল এক বড় অঘটন৷ ভাড়া নিয়ে এক ছাত্রের সঙ্গে কথা–কাটাকাটি হয়৷ একপর্যায়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে বাসের হেলপার আর কন্ডাকটর মিলে নাকি সেই ছাত্রকে মারধর করেছে। আর যায় কোথায়৷ কলেজে সংবাদটা পৌঁছামাত্র শত শত ছাত্র সড়ক অবরোধ করল আর আটকে দিল বাস, ট্রাকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল। কিছু ছেলে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলে পড়ল বেশ কিছু বাসের ওপর আর ভাঙচুর শুরু করে দিলে। মনে হচ্ছিল, অনেকেই খুব মজা পাচ্ছে বাসগুলোর গ্লাস ভাঙা দেখে।আমাদের স্কুলের পাশেই ছিল ঐতিহ্যবাহী সরকারি সাদত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। তখন স্কুল আর কলেজের মাঝ দিয়ে ছিল ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক। দেখা যেত, যেকোনো একটি ঘটনা ঘটলেই কলেজের কিছু ছাত্র সড়ক অবরোধ করত। কোন একজন ছাত্রের সঙ্গে হয়তো ভাড়া নিয়ে সামান্য ঝামেলা হয়েছে, আর কথা নেই, কিছু ছেলে রাস্তায় নেমে যেত আর সড়ক অবরোধ করে রাখত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাঝেমধ্যে হামলা করত বাসগুলোতে। এটা ছিল এক নিয়মিত ঘটনা।
এমন সময় দেখলাম, একটি বাসে কে বা কারা অগ্নিসংযোগ করেছে । মুহূর্তের মধ্যেই জ্বলে উঠল বাসটি। দাউ দাউ করে জ্বলছে বাস। শুনলাম দুই–একজন বলছে, একটু পরেই জ্বলবে টায়ারগুলো, আর তখন ভীষণ শব্দ হবে। অনেককেই খুব মজা নিতে দেখলাম । তারা যেন অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছে কখন প্রচণ্ড শব্দ করে ফাটবে টায়ারগুলো আর ওই লোকগুলোকে আনন্দে ভাসিয়ে দিবে।

এমন সময় দেখলাম শাজাহান পাগলাকে দৌড়াদৌড়ি করতে। তাকে খুব চিন্তিত মনে হলো। সে জ্বলন্ত বাসের চারপাশ দিয়ে পাগলের মতো ছুটছে আর বলছে, ‘আগুন লাগছে রে, পানি দে পানি দে।’ মনে হচ্ছিল, বাসটা যেন তার। অনেকেই পাগলটাকে জ্বলন্ত বাসের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে বলছিল৷ কেননা যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে বাসের টায়ারগুলো। কিন্তু পাগলের তো আর সেই জ্ঞান নেই। দেখতে দেখতে লেলিহান শিখায় জ্বলে উঠল পুরো বাস আর প্রচণ্ড শব্দে ফেটে গেল টায়ারগুলো৷ কেউ কেউ প্রচণ্ড উল্লাসে মেতে উঠল। পাগলটা জ্বলন্ত বাসের কাছে গিয়ে তার দুই পা গেড়ে বসে পড়ল আর কেঁদে কেঁদে বলে উঠছিল, ‘হায় হায় কী করলি তোরা এইডা, বাস জ্বালাইয়া দিলি! ওরে তোরা আর পাগলামি করিছ না, ওরে তোরা গাড়িতে আগুন দিস না৷’
(রুহুল খান, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, ভ্যানকুভার, কানাডা)

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন