বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আর সিডনির অধিবাসীদের মধ্যে রঙের বাহার তো বিশ্ববিদিত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে সিডনিতে এসে বসবাস করছে। এ ছাড়া প্রতিবছর হাজারো মানুষ বিনোদনের জন্য বেড়াতে আসেন সিডনিতে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের বসবাসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এখানে সারা বছরই কোনো না কোনো উৎসব লেগেই থাকে। আর তারই সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিডনির রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে ইমারতগুলোও সেজে ওঠে। এ ছাড়া সিডনির নিজস্ব কিছু উৎসব থাকে বছরজুড়ে। বিশেষ করে শীতকালের নির্জীব সিডনিকে সজীব রাখতে আয়োজন করা হয় চোখধাঁধানো এক আলোক উৎসবের। এই আলোক উৎসব ‘ভিভিড সিডনি’ নামে পরিচিত। এভাবেই সিডনি হয়ে উঠে রঙের নগরী।

কিন্তু গত প্রায় দুই বছরের লকডাউনের ফলে সিডনির কোনো উৎসবই আলোর মুখ দেখেনি। এর ফলে সিডনি যেন তার রং হারিয়ে একেবারে শীতকালের গাছের মতো ধূসর বর্ণ ধারণ করে ছিল। অবশেষে করোনার টিকা গ্রহণের নির্দিষ্ট হার অর্জিত হওয়ার পর লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। যদিও সিডনির অধিবাসীদের দেখলে মনে হবে যেন লকডাউন পুরোপুরি উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। অবশ্য এখনো জনসমাগমের স্থান, যেমন শপিং মল ও জনপরিবহনে মাস্ক বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সব জায়গাতেই পরিপূর্ণ টিকাদানের ছাড়পত্র ও কিউআর কোড স্ক্যান করে প্রবেশ করতে হচ্ছে। কিন্তু এতে করে উৎসবপ্রিয় সিডনিবাসীকে আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তারা মুক্তির আনন্দে বের হয়ে এসেছে। উৎসবের ছোটখাটো অনুষঙ্গকে কেন্দ্র করেই আনন্দ করছে।

default-image

গত ২৫ অক্টোবর থেকে লকডাউন শিথিল করার পর আমরা ৩০ অক্টোবর প্রথম বের হয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল হারবার ব্রিজে যাওয়া। অবশ্য হারবার ব্রিজ আর অপেরা হাউস কাছাকাছি হওয়াতে একই সঙ্গে দুটিই দেখা হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের এবারের লক্ষ্য ছিল হারবার ব্রিজের শুরুর জায়গাটা যেটাকে বলা হয় ‘দ্য রকস’। নেটফ্লিক্সের বর্তমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিজ ‘স্কুইড গেম’–এর প্রথম খেলা ‘রেড লাইট, গ্রিন লাইট’, যেটা অনেকটা বাংলাদেশের বরফ পানি খেলার মতো। এই সিরিজে দেখানো হয়েছে একটা হলুদ রঙের পুতুল এই খেলা পরিচালনা করে। সেই পুতুলেরই একটা রেপ্লিকা স্থাপন করা হয়েছে দ্য রকসে। সার্কুলার কিয়ে স্টেশন থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটাপথ।

default-image

স্টেশন থেকে বের হয়েই আমরা যেন জনস্রোতে মিশে গেলাম। অনেক দিন পর একসঙ্গে এত মানুষ দেখে খুবই ভালো লাগছিল। আর ৩১ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়াজুড়ে উদ্‌যাপিত হবে ‘হ্যালোইন’ উৎসব। তাই তরুণ–তরুণী থেকে শুরু করে শিশুদের পোশাক–আশাকে ছিল তার ছোঁয়া। তারা বাহারি সব সাজে সেজে চলাচল করছিল। যার ফলে মনে হচ্ছিল যেন গত দুই বছরের ধূসর সিডনির গায়ে একটু একটু করে রঙের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। যাওয়ার পথে সিডনি অপেরা হাউসকে পেছনে রেখে আমরা একটি গ্রুপ ছবি তুলে নিলাম। যেমন প্রথমবার কেউ সিডনি এলে সবাই ছবি তুলে। অতিমারির সময় পেরিয়ে আমরাও যেন সিডনিকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এরপর ‘স্কুইড গেম’–এর পুতুলের সঙ্গে ছবি তুলে আমরা উদ্দেশ্যহীন হাঁটা শুরু করলাম।

এই উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটিও আমরা খুবই উপভোগ করছিলাম। পথে পথে মানুষের কলরব। আহা কত দিন পর সেই পুরোনো কোলাহলে ফেরা। অনেকেই ছবি তুলছেন পরিবারের সঙ্গে। আমরা যেমন অনেকের পারিবারিক ছবি তুলে দিতে সাহায্য করলাম, ঠিক তেমনি অনেকেই আমাদেরও সাহায্য করলেন। এভাবেই হাঁটতে হাঁটতে ক্ষুধা পেয়ে গিয়েছিল সবার। তখন রাস্তার একটা স্প্যানিশ টংদোকান থেকে বাংলাদেশের খিচুড়ির মতো একটা খাবার কিনে উদরপূর্তি করে খেয়ে নেওয়া হলো। পাশাপাশি বড়দের জন্য কফি আর ছোটদের জন্য নেওয়া হলো আইসক্রিম। এভাবেই একসময় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত হয়ে গেল, কিন্তু আমাদের ফেরার কথা মনে ছিল না। মানুষের এই মুখর পদচারণ যেন জীবনের প্রতিচ্ছবি। অতিমারির দমবন্ধ সময় পেরিয়ে মানুষ যেন একটু বুক ভরে নিশ্বাস নিচ্ছে। পথে পথে মানুষের কোলাহল যেন গেয়ে চলেছে নবজীবনের জয়গান।

default-image

প্রকৃতির নিয়মে সময়ের ডানায় ভর করে সিডনিতে এসেছে শীতের পর বসন্ত। গাছে গাছে নতুন পাতা আর ফুলের মেলা। অস্ট্রেলিয়ার বসন্তের সিগনেচার ফুল জ্যাকারান্ডা ফুটতে শুরু করেছে। শীতের নির্জীব গাছে পাতা আসার আগেই বেগুনি রঙের এই ফুল ফুটে গাছটাকে একেবারে পুরোপুরি বেগুনি রঙের চাদরে ঢেকে দেয়। পাখির চোখে তখন সিডনি শহরকে দেখলে মনে হবে যেন কোনো নিপুণ শিল্পী মনের আনন্দে সিডনি শহরকে বেগুনি রঙে রাঙিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য বসন্তের একেবারে শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ফুল ‘দ্য ইয়েলো ওয়াটল’ ফুটে তখন চারপাশটা সোনালি রঙে ছেয়ে যায়। এর পাশাপাশি আরও হাজারো রকমের ফুল ফোটে গাছে গাছে। ‘ফ্লেম ট্রি’ বলে একধরনের গাছে আসে আগুন রঙের লাল ফুল। বাংলাদেশের যেমন ‘পলাশ–শিমুলবনে আগুন লাগে’, এখানে ঠিক তেমনি পাতাবিহীন ফ্লেম ট্রিতে আগুন লেগে যায়। এ জন্যই হয়তোবা এই গাছের এমন নামকরণ।

default-image

আমাদের আশা, সিডনি তথা পুরো বিশ্বই খুব দ্রুত যেন অতিমারির এই প্রকোপ কাটিয়ে উঠে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। রং লাগবে বিশ্বে, রং লাগবে সিডনিতে। প্রকৃতির রঙের পাশাপাশি মানুষের উৎসবমুখর পদচারণে আবার মুখর হয়ে উঠবে সিডনির পথঘাট, বিপণিবিতান থেকে শুরু করে সব জায়গা। আবার প্রাণ ফিরে আসুক সিডনিতে। আবার সিডনি হয়ে উঠুক রঙের শহর।

default-image
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন