default-image

আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় নানা মত, নানা পথ থাকে। কোনোটি ভালো, কোনোটি ভালো না। কোনোটি টেকসই বা টেকসই না। সবাই যেমন ভালোটি বেছে নেয় না, আবার ভালোটি নিলেও টেকসই হয় না। আবার কখনো টেকসই হলেও তা ধরে রাখতে ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিতে হয়।

১.
ইসলামপুর গ্রামের কৃষক আমিনুল। আমিনুল একজন সৎ ও ভালো মানুষ হিসেবে গ্রামে পরিচিত। লেখাপড়া দশম শ্রেণি পর্যন্ত। পারিবারিক অনটনে জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষার গণ্ডি পেরোনো হয়নি। কৃষিকাজই তাঁর একমাত্র পেশা। আমিনুল প্রথমে নিজ এলাকায় বেগুনের নতুন জাত চাষ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। শীতকালীন জাত, ইসলামপুরী। ফলের শ্বাস মোলায়েম ও সুস্বাদু। বীজ বাছাই, পলি ও দোআঁশ মাটি বাছাই, বীজ ছিটানো, সেচ দেওয়া ও পরে বীজতলায় চারা তৈরি প্রভৃতি কাজ আয়ত্তে আনলেন। যেহেতু তাঁর পড়ালেখা বেশি নেই, তাই যত সম্ভব নিজের সদিচ্ছা ও অভিজ্ঞতার আলোকে যত্নসহকারে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করার চেষ্টা করলেন। পরে সেখান থেকে চারা মূল জমিতে লাগানো হলো। লাগানোর সময় বেছে বেছে রোগবালাই নেই, ভালো চারাগুলো নেন। তারপর, যখন পানি দেওয়ার দরকার পানি, সার দরকার সার, বেড়া দরকার বেড়া নানা বিষয় খেয়াল করেন।

নতুন শস্য, তাই পরম যত্নে সব নিয়মকানুন মেনে এক বিঘা জমিতে আবাদ করলেন। বাম্পার ফলন হলো। সবার বাহবা কুড়াল। পরের বছর একটু বাড়তি উৎসাহ নিয়ে তিন বিঘা জমিতে আবার আবাদ করলেন। আবার বাম্পার ফলন হলো। ভালো আয়ও হলো।

অনেক উৎসাহ, প্রশংসা কুড়াল। এত উৎসাহ, উদ্দীপনা থাকার পরও পরের বছর আর তিনি বেশি জমিতে আবাদ করেননি। তিনি মনে করতেন, এত বেশি জমিতে লাগালে দেখভাল করার মতো সামর্থ্য তাঁর এ মুহূর্তে নেই। ভাবেন, ধীরে ধীরে এগোবেন।

বিজ্ঞাপন

২.
মফিজুর সাহেব একটু অবস্থাপন্ন। একই এলাকায় বসবাস করেন। বেশ শিক্ষিত, ব্যবসায়িক শিক্ষা থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা। মফিজুর সাহেব আমিনুল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রথম বছর ৫ বিঘায়, পরের বছর ১০ বিঘায় বেগুন আবাদ করেন।

বাম্পার ফলন হয়। পরের বছর ২০ বিঘাতে। ব্যবসা বাড়তে থাকে। চারদিকে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন শহর থেকে পাইকারেরা এসে তাঁর শস্য নিয়ে যান।

পত্রিকায়, টেলিভিশনে সাফল্যের ইন্টারভিউ প্রচার হয়। মফিজুর সাহেব কৃষি খাতে সাফল্যের জন্য সরকারি বিভিন্ন পদকও পেয়ে থাকেন। উৎসাহ বেড়ে যায়, আরও বেশি ব্যবসা করতে চান। মফিজুর সাহেবের ব্যবসার কাছে মার খেয়ে যান কৃষক, স্বল্পশিক্ষিত আমিনুল। আগের তিন বিঘা থেকে আধা বিঘায় নেমে যায় তাঁর আবাদ। শুধু নিজের জন্য আবাদ করেন। বেগুন কিনে খেতে চান না, নিজের হাতে যত্ন করে আবাদ করা টাটকা বেগুন খেয়ে তৃপ্তি পান। অন্যদিকে ব্যবসা বাড়াতে গেলে আরও মূলধন চাই মফিজুর সাহেবের। ব্যয় কম করে, মুনাফা বেশি করার চেষ্টা করতে থাকেন প্রতিনিয়ত।

টাকা আসে মূলত বেগুন বিক্রি থেকে। মফিজুর সাহেবের দৃষ্টি থাকে বেগুনের দিকে। একসময় বীজ বাছাই, মাটি বাছাই, নিড়ানো, সেচ দেওয়া এসব থেকে ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বেগুন। আগের ধাপগুলোয় অবহেলা বাড়তে থাকে। কারণ, ধাপগুলো সব ব্যয়ের মধ্যে পড়ে। আর তিনি চাচ্ছেন ব্যয় কমাতে। তাঁর বেগুন পেলেই হলো।

এত দিনে তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদাও বেশ হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রতিটি অনুষ্ঠানে ডাক আসে। বেশ কয়েক বছর জমজমাট ব্যবসা করার পর এক ঝোড়ো বৃষ্টিতে সব বেগুনখেত লন্ডভন্ড হয়ে গেল। কোনো ফলন হলো না। অনেক কর্মচারীর বেতন, ব্যাংক লোন, ছেলেমেয়েদের শিক্ষার খরচ এসবের কথা ভেবে মুষড়ে পড়েন মফিজুর সাহেব। নানাবিধ দেনা–পাওনায় এতটাই জর্জরিত কাদের সাহেব যে পরের বছর আবাদ করার মতো আর পুঁজি থাকে না। এত দিনের অভিজ্ঞতা ছেড়ে অন্য কোথাও নতুন ব্যবসায় যেতে চান না। নতুন করে আর ঝুঁকিও নিতে চান না। ভাবেন, আবার ছোট করে হলেও বেগুন আবাদই শুরু করবেন। এবার করলেন শুরুর সেই পাঁচ বিঘায়। কিন্তু ফলন আর আগের মতো হলো না। পরপর তিন বছর আশানুরূপ ফলন পান না। মফিজুর সাহেব দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন, পরের বছর আবার বেগুন চাষ করবেন কি!

৩.
যে বছর ঝোড়ো বাতাস হলো, মফিজুর সাহেবের খেত লন্ডভন্ড হলেও আমিনুলেরটা টিকে ছিল। ফলন একটু কম হয়েছে বটে, কিন্তু তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। পরের বছরগুলোতে আমিনুল স্বাভাবিক ফলন পেলেও মফিজুর পাননি। মফিজুর সাহেব আর এই ব্যবসায় ফিরে আসবেন বলে মনে হয় না। আগের মতো এত উদ্যম নেই। বীজ, চারা, সেচ—এসব ছোট ছোট কাজে মন থাকে না মফিজুর সাহেবের।

মফিজুর সাহেবের কারণে তাঁর ব্যবসা সংকুচিত হলেও তাঁর জন্য খারাপ লাগে আমিনুলের। মফিজুর সাহেব আর বেগুন আবাদে ফিরে আসেন না। আমিনুল আবার জোরেশোরে বেগুন আবাদে ফিরে আসবেন কি না, চিন্তা করেন। তাঁর আত্মবিশ্বাস আছে, শুরু করলে ভালো করতে পারবেন। কিন্তু তাঁর তো বয়স হয়েছে, পঞ্চাশোর্ধ।

ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে ২৫টি বছর। তাঁর ছেলেমেয়েরাও এখন আর গ্রামে থাকেন না। পড়াশোনা করে ছোট মেয়ে তিশা গার্মেন্টসে ও বড় ছেলে জাহাঙ্গীর মার্কেটিংয়ে চাকরি করেন।

আমিনুলের বয়স বেশি হওয়ায় আগের মতো পরিশ্রম করতে পারেন না। তিনি যে নিজে বড় পরিসরে কিছু করবেন, তা আর পেরে উঠবেন না। অন্যদিকে মার্কেটিং চাকরিতে খুব ভালো কিছু না হওয়ায়, অনেক ভেবে বাবার অনুরোধে গ্রামে ফিরে আসেন জাহাঙ্গীর। বাবার খুব কাছ থেকে বেগুন চাষের প্রতিটি ধাপ শিখেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। শুরু করেন নতুন উদ্যমে। মফিজুর সাহের যে ভুল করছেন, সে ভুল করেন না জাহাঙ্গীর। বীজ, জমি, চারা, সেচ, সার ধাপগুলোতে অনেক গুরুত্ব দেন। কাজকে ভালোবাসেন, গাছকে ভালোবাসেন। প্রতিদান হিসেবে পান শস্য। কয়েক বছরের মধ্যে জাহাঙ্গীরের ব্যবসা জমজমাট হয়ে ওঠে। জাহাঙ্গীরের ছোট বোন তিশাও গ্রামে ফিরে ভাইয়ের ব্যবসায় সহযোগিতা করতে থাকেন। ব্যবসা বাড়ে বছর বছর। নামডাক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, কিন্তু মফিজুর সাহেবের মতো হারিয়ে যান না জাহাঙ্গীর।

আমাদের চারদিকে ফলনির্ভতার সংস্কৃতি ভয়াবহভাবে জেঁকে বসেছে। সেটা কি শিক্ষা, কি নির্বাচন, কি সংস্কৃতি—সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এহেন সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমিনুলদের মতো যুগের পর যুগ হারিয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম থেকে।


*লেখক: গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নিউব্রান্সউইক, কানাডা।

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন