হয়তো পারি কিন্তু সেই দেশীয় আমেজে নয়। দেশে ঈদ উদ্‌যাপন হয় ভিন্নভাবে। ঈদের বোনাস পাওয়া। নাড়ির টানে ঘরমুখী হওয়া। বাসে–ট্রেনে অসম্ভব ভিড়ের মধ্যে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া, সে এক অন্য রকম শিহরণ। প্রবাসে উইকডেজে ঈদ পড়লে বিড়ম্বনা হয় আরও বেশি। আমাদের এখানকার সাধারণ কাজগুলোর শর্ত এমনই যে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’। ঈদের দিনে কাজে না গেলে তাই সেই দিনের বেতন নেই। তবু আমরা অনেকে ঈদের দিনে কাজে না গিয়ে ফ্যামিলি নিয়ে একসঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপন করি। নামাজ পড়তে যাই। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ফ্যামিলি ফ্রেন্ডসদের বাড়িতে ঘুরতে বের হই। আমি পরিবার নিয়ে ঈদের নামাজ শেষে মুসলিম কবরস্থানে গিয়ে মৃত ব্যক্তিদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি।

এখন থেকে ২২ বছর আগে কানাডায় নতুন অভিবাসী হয়ে আসার পর ঈদের দিনগুলোতে আমি দুই ঘণ্টার ছুটি নিতাম উইদাউট পেতে। ঈদের নামাজ পড়ে তারপর কাজে যেতাম। সেই সময় এখানে মসজিদগুলোতে ঈদের জামাত হতো। এখনো হয়। অবশ্য এখন সামারের সময়ে মাঠে ঈদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা হয়েছে। টরেন্টোর এক মসজিদে গিয়ে প্রথম ঈদের নামাজ আদায়ের একটা স্মৃতি আমার জীবনে আছে এবং তা আজীবন মনে থাকবে। এই দেশে তখন আমি একেবারেই নতুন। আগস্ট মাসে অভিবাসী হয়েছি। রমজান শুরু হয়েছে নভেম্বরে আর ঈদের দিন পড়েছে ডিসেম্বরে। আগের রাতে অনেক স্নো পড়েছে। জীবনের প্রথম স্নো ঝরতে দেখে খুব ভালো লেগেছিল। সকালে দেখি চারদিকে শ্বেত শুভ্র সাদা তুষারের চাদর পাতা। সে এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর দৃশ্য।

আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে মসজিদটা ছিল বেশ দূরে। যেতে হতো দুটি বাসে চেপে। স্বভাবতই একটু দেরি হয়ে গেছে যেতে। মসজিদে গিয়ে দেখি মুসল্লিতে পরিপূর্ণ। ভেতরে তিল ধারণের জায়গা নেই। নামাজও শুরু হয়ে গেছে। মসজিদের বাইরে একটা ছোট্ট প্যান্ডেল করা হয়েছে, তার নিচে পাতা হয়েছে মোটা ত্রিপল। সেই বাইরের কাতারেই শামিল হয়ে গেলাম। বরফের ওপরেই যে ত্রিপল পাতা হয়েছে, তা বুঝিনি। একটু একটু করে ঠান্ডায় আমার পা যেন জমে হিম হয়ে যাচ্ছিল। প্রথম রাকাতের পর নামাজে দাঁড়িয়ে থাকা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিল না। হুজুরও লম্বা সুরা পড়া শুরু করেছেন। দ্বিতীয় রাকাত শেষ করে সালাম ফেরামাত্রই আমি কোনোমতে দৌড়ে গিয়ে মসজিদকক্ষে ঢুকে একজনের সামনে বসে পড়লাম। হাত দিয়ে পা মালিশ করতে লাগলাম। হুজুর খুতবা শুরু করলেন। পরে জানলাম অতিরিক্ত ঠান্ডায় পায়ের আঙুলে ‘ফ্রস্ট বাইট’–এর কারণে রক্ত জমাট হতে পারত। বরফের অতিরিক্ত ঠান্ডায় ‘ফ্রস্ট বাইট’ সম্পর্কে সেই প্রথম আমার ধারণা হয়।

এখন অবশ্য স্থায়ী সরকারি চাকরি পেয়েছি। তাই আগে থেকে ঈদের দিনের জন্য পাওনা ছুটি নিয়ে নিই। আগেভাগে গিয়ে গাড়ি পার্ক করে মসজিদের ভেতর গিয়ে বসি। বাচ্চাদের স্কুলেও এদিনের অনুপস্থিতি এখন ধর্মীয় কারণে অনুমোদন করে। করোনাকালে গত দুই বছর তো ঘরেই ছেলেমেয়েসহ পরিবার নিয়ে ঈদের জামাত করেছি। ইমাম হয়েছি আমি নিজেই।

ঈদের দিনে দেশের সেই ঐতিহ্য বজায় রেখে ঘরে সেমাই রান্না হয়। মাংস–পোলাও করা হয়। বাংলাদেশি বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ছাড়াও ভিন্ন ধর্মের নিকট প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রবাসজীবনের ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হয়। দেশের সব স্বজন ও প্রিয়জনদের জন্য রইল ঈদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন