নিশাভা নদীর পার ঘেঁষেই ফোরট্রেসটি তৈরি করা হয়েছে। অটোমান শাসনামলে নির্মিত এ ফোরট্রেসটি সত্যি অসাধারণ স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। নিশ ফোরট্রেস থেকে ভেতরের দিকে একটু পা বাড়ালেই দেখা মিলবে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে নির্মিত বালি বেগ মসজিদ। বর্তমানে অবশ্য মসজিদটি পরিত্যক্ত, সার্বিয়ার সরকার সংস্কারের মাধ্যমে মসজিদটিকে আর্ট গ্যালারির রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বালি বেগ মসজিদের পাশাপাশি অটোমানদের সময়ে নির্মিত অনেক নিদর্শনও আপনি এখানে খুঁজে পাবেন। বর্তমানে অবশ্য সরকারিভাবে নিশে কেবল একটি মসজিদ রয়েছে, ১৭২০ সালে নির্মিত মসজিদটির নাম ইসলাম আগা মস্ক। তবে ২০০৪ সালে এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে মসজিদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে সংস্কারের মাধ্যমে মসজিদটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। এখনো এ মসজিদে নিয়মিত নামাজের আয়োজন করা হয়।

default-image

নিশ ফোরট্রেস থেকে আমরা স্কাল টাওয়ারের দিকে ছুটে গেলাম, মূলত এ স্কাল টাওয়ার দেখার উদ্দেশ্যেই বেশির ভাগ দর্শনার্থী নিশে হাজির হন। বর্তমানে নিশের এ স্কাল টাওয়ারে ৫৮টির মতো মাথার খুলি রয়েছে।

১৮০৯ সালে নিশের উপকণ্ঠে অবস্থিত চেগার পর্বতমালায় স্টেভান সিন্ডেলিচের নেতৃত্বে একদল বিদ্রোহী সার্ব সৈন্য একত্র হয়। সার্বিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসন থেকে মুক্ত করতে তিনি যুদ্ধের ঘোষণা দেন, তবে অটোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত সেনাবাহিনী তাঁর হাতে ছিল না। তাই অটোমান সেনাবাহিনী স্টেভান সিন্ডেলিচ ও তাঁর সঙ্গে থাকা বিদ্রোহী সেনাদলকে সহজে ঘিরে ফেলে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে স্টেভান সিন্ডেলিচ আত্মঘাতী আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন, কেননা, তিনি কোনোভাবে অটোমানদের কাছে আত্মসমর্পণের পক্ষপাতী ছিলেন না। আগে থেকে মজুত করে রাখা গান পাউডারে তিনি আগুন ধরিয়ে দেন, ফলে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয় এবং স্টেভান সিন্ডেলিচসহ আশপাশে থাকা সব বিদ্রোহী সার্ব ও অটোমান সেনাসদস্যের মৃত্যু হয়।

default-image

যদিও এ যাত্রায় তাঁদের স্বাধীনতা আন্দোলন আলোর মুখ দেখেনি, তবে বিশালসংখ্যক অটোমান সেনাসদস্যের মৃত্যু স্থানীয় গভর্নর হুরশিদ পাশাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। গভর্নর হুরশিদ পাশা তাই সেনাপতি স্টেভান সিন্ডেলিচসহ তাঁর অধীন থাকা সার্ব সেনাদের মৃতদেহ থেকে মাথাকে বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেন এবং সেখান থেকে মাথার খুলিকে অবমুক্ত করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সেগুলোকে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মেহমুদের আছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সুলতান দ্বিতীয় মেহমুদ এসব মাথার খুলিকে পুনরায় নিশে ফেরত পাঠান। পরবর্তী সময় অটোমানরা এসব মাথার খুলিকে একত্র করে একটি টাওয়ার নির্মাণ করেন। মূলত বিদ্রোহী সার্বদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে অটোমানরা এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক মতামত ব্যক্ত করেন।

স্কাল টাওয়ার থেকে আমাদের গন্তব্য ছিল বুবানি ন্যাশনাল পার্ক। নিশের দক্ষিণ-পশ্চিমে নিশ ও স্কুপিয়ের সংযোগ সড়কে এর অবস্থান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎসি বাহিনী কর্তৃক নিশ ও এর আশপাশের অঞ্চলগুলোতে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষের প্রাণবিয়োগ ঘটেছিল। বুবানির স্থানটি ছিল মূলত একটি এক্সিকিউশন স্কোয়াড, যেখানে তাদের হত্যা করা হয়েছিল ও তাদের মৃতদেহকে গণকবর দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিহত এসব মানুষকে স্মরণ করতে পরবর্তীকালে ১৯৬৩ সালে এখানে একটি মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়।

default-image

নিশের সিটি সেন্টারের আয়তনে খুব বড় না হলেও অত্যন্ত পরিপাটি। সার্বিয়াতে সিরিলিক এবং ল্যাটিন দুই ধরনের বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়। নিশের সিটি সেন্টারের মূল চত্বর ভূমিটি প্রাথমিকভাবে ‘কিং মিলান’স স্কয়ার নামে পরিচিত। ১৮৬৮ থেকে ১৮৮৯ সাল পর্যন্ত সার্বিয়ার শাসনভার তাঁর অধীন ছিল। তাঁর হাত ধরে সার্বিয়া অটোমান সাম্রাজ্যের থেকে স্বাধীনতার স্বাদ পায়। নিশের সিটি সেন্টারে তাঁর স্মরণে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। ‘কিং মিলান’স স্কয়ার থেকে সামান্য কয়েক গজ হাঁটলে ‘স্টেভান স্রেমাক অ্যান্ড কালচা মনুমেন্ট’ নামে আরও একটি বিখ্যাত ভাস্কর্য দেখতে পাবেন। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে স্টেভান স্রেমাক একজন জনপ্রিয় লেখক হিসেবে পরিগণিত হন।

আর কালচা হচ্ছে স্টেভান স্রেমাক রচিত বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইভকোভা স্লাভা’–এর অন্যতম আলোচিত চরিত্র। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৪৫০ বছরের অটোমান শাসন সার্বিয়ার স্থানীয় হস্তশিল্প ও সিরামিক শিল্পকে করেছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নিশের সিটি সেন্টারের উপকণ্ঠে অবস্থিত টিংকারস অ্যালে নামক সড়কটি অটোমান শাসনামলে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে কারুশিল্পের জন্য এক প্রসিদ্ধ স্থান হিসেবে গড়ে উঠেছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কৌচসার্ফিং–এর মাধ্যমে আগের থেকে আমার সঙ্গে নেভেনা স্টোইকোভিচ নামের এক তরুণীর পরিচয় হয়েছিল। বিকেলে নেভেনার দেওয়া লোকেশন অনুযায়ী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাই। চলবে..

*লেখক: রাকিব হাসান রাফি, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন