default-image

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও বাঙালির সম্পর্ক গভীর এবং নানা দিকে বিস্তৃত। এর ইতিহাস শতবর্ষের অধিক পুরোনো এবং প্রায় অজানা বললেই চলে। যেমন পাল ও শিমোনাকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা কজনই বা জানি! পাল মানে একদা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী বাঙালি বিচারপতি ও শিক্ষাবিদ ড. রাধাবিনোদ পাল (১৮৮৬-১৯৬৭। শিমোনাকা ইয়াসাবুরোও (১৮৭৮-১৯৬১) জাপানের শীর্ষস্থানীয় মর্যাদাসম্পন্ন প্রকাশনা সংস্থা হেইবোনশা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বনামধন্য একজন শিক্ষাবিদ।
পাল জন্মেছিলেন বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়া ইউনিয়নের সলিমপুর গ্রামের এক অতিদরিদ্র পরিবারে। শিমোনাকা হিয়োগো প্রিফেকচারের তাকিগুন কোনদাচোও নামক গ্রামের এক অতিদরিদ্র পরিবারের সন্তান। দুজনই শিশুকাল থেকে কঠোর পরিশ্রম করে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। পরিণত বয়সে পালের কর্মস্থল ছিল বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, ভারতের নয়াদিল্লি ও কলকাতায়। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ১১ বছর গণিতের অধ্যাপক ছিলেন। তারপর করেন দিল্লিতে সরকারি চাকরি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেগোর ল প্রফেসর, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। আর শিমোনাকার কর্মস্থল ছিল ওসাকা ও টোকিও। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা। ১৯১৪ সালে হেইবোনশা প্রকাশনা সংস্থার প্রতিষ্ঠা। বিশ্বশান্তির আবেদনকল্পে সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা। এশিয়ার দুই প্রান্তের দুজন ব্যক্তির সাক্ষাৎ ঘটেছিল জাপানে ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট’ সংক্ষেপে ‘টোকিও ট্রাইব্যুনাল’ (১৯৪৬-৪৮) চলাকালে। আমৃত্যু তাঁদের ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের পুরোহিত ছিলেন শিমোনাকার একনিষ্ঠ শিষ্য শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ তানাকা মাসাআকি (১৯১১-২০০৬)। তানাকা ছিলেন বিচারপতি পালের পুত্রসম ভক্ত। জাপানে পাল-শিমোনাকা কিনেনকান তথা পাল-শিমোনাকা স্মারকভবন, যেটি এখানে আলোচ্য বিষয়, সেটি ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, মূলত তানাকা মাসাআকির উদ্যোগেই। স্থাপনাটির বয়স এ বছর ৪০ হলো।

default-image


পাল-শিমোনাকা কিনেনকানের খোঁজ পেয়েছিলাম ১৯৯৯ সালে, যখন আমি হেইবোনশা প্রকাশনা কোম্পানির সংযুক্ত ফটো প্রিন্টিং কোম্পানিতে চাকরি করি। বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের ওপর একটি প্রবন্ধ লেখার জন্য একটি গ্রন্থ আমি বেশ কিছুদিন ধরে খুঁজছিলাম। গ্রন্থটি তানাকা মাসাআকি রচিত ‘নিহোন মুজাইরোন’ বা ‘জাপান নির্দোষ রায়’ যা টোকিও ট্রাইব্যুনাল-সম্পর্কিত। একদিন ফটো প্রিন্টিংয়ের গ্রন্থাগারেই হঠাৎ করে খুঁজে পাই সেটা। বইটি ছিল বেস্ট সেলার্স অনেক বছর ধরে এবং সেই সংস্করণটি ছিল ২৭তম। সেটাতে লেখকের নাম, ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর মুদ্রিত ছিল।
একদিন কোম্পানি থেকে ফোন করলাম তানাকা সেনসেইকে (সেনসেই অর্থ স্যার)। তিনি ফোন ধরলে আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী, বললাম। ‘পা-রু হানজি’ তথা ‘বিচারপতি পালের দেশের মানুষ আমি পরিচয় দিলে খুবই খুশি হলেন, যেতে বললেন। এক রোববার সকালে টোকিওর কিচিজোওজি শহরে তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হলাম তখন ডিসেম্বর মাস প্রচণ্ড শীত।
তানাকা সেনসেই ও তাঁর স্ত্রী আমাকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন। তাঁর বয়স তখন ৮৮ বছর। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে তাঁর দুটি হাতই কম্পমান। তিনি বেশ উত্তেজিত, কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-৭৫) নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর এই প্রথম তিনি কোনো বাঙালির সঙ্গে হাত মেলালেন! আমি দারুণ কৌতূহলী হলাম মনে মনে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কি তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল?

default-image

তাঁর স্ত্রী সবুজ চা এনে রাখলেন টেবিলে। বারবার মাথা নত করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বললেন, ‘বিচারপতি পালের দেশের মানুষ তুমি, কী সৌভাগ্য আমাদের, আজকে তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো! তিনি তো ঈশ্বর, তিনি জাপানকে নবজীবন দিয়েছেন।’ মাথা নেড়ে নেড়ে তানাকা সেনসেইও সমর্থন করতে লাগলেন তাঁর স্ত্রীকে। কী অদ্ভুত শ্রদ্ধা-ভক্তি-সমীহ তাঁদের কণ্ঠে, আমি তো বিস্মিত! কী বিশাল জায়গা নিয়ে অধিষ্ঠিত আছেন বিচারপতি পাল, সে দিন প্রায় দেড় ঘণ্টা তানাকা সেনসেইয়ের কাছে নানা ঘটনার কথা শুনে অনুধাবন করলাম!
প্রথমেই তিনি আমাকে তাঁর বাড়ির বৈঠকখানায় সাজিয়ে রাখা বেশ কিছু ছবি দেখালেন। সেখানে গান্ধী, নেতাজি, রাসবিহারী বসু, রবীন্দ্রনাথ, বিচারপতি পাল প্রমুখের ছবি তো আছেই, পালের সঙ্গে তাঁর একাধিক ছবিও বিদ্যমান। তারপর তাঁর লিখিত বেশ কিছু গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকা আমার সামনে রাখলেন। ক্রমাগত বলে যেতে লাগলেন সেই মনীষী ওকাকুরা তেনশিন (১৮৬৩-১৯১৩) ও রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) ঠাকুরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থেকে শুরু করে বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর (১৮৮৬-১৯৪৫) জাপান আগমন, গুরু তোওয়ামা মিৎসুরু (১৮৫৫-১৯৪৪) কর্তৃক বিহারী বসুকে বাঁচানো, তাঁর জাপানে বিয়ে, সংগ্রাম, মৃত্যু; সুভাষচন্দ্র বসুর (১৮৯৭-১৯৪৫) আগমন, প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোওজোওর (১৮৮৪-১৯৪৮) সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ করা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে; ইম্ফল অভিযান, জাপানের পরাজয়; টোকিও ট্রাইব্যুনাল, বিচারে পালের ভূমিকা, বিচারপতি পালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, তাঁর গুরু শিমোনাকাকে পালের সঙ্গে পরিচিত করা, বিচারপতি পালের সঙ্গে জাপান ভ্রমণ ১৯৫২, ১৯৫৩ ও ১৯৬৬ সালে; বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সমর্থন, বঙ্গবন্ধুকে জাপানে আমন্ত্রণ জানাতে ঢাকা গমন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা পর্যন্ত একনাগাড়ে দীর্ঘ ইতিহাস বলে গেলেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনলাম, কিছু নোট করলাম। তিনি এতটাই উত্তেজিত ছিলেন যে তাঁর শোবার ঘরে পর্যন্ত নিয়ে গেলেন আরও ছবি দেখাবেন বলে। গিয়ে তাঁর বালিশের কাছে ছোট্ট একটি ফ্রেমে বাঁধানো ছবি দেখে হতবাক হয়ে গেলাম! ছবিতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে করমর্দনরত তানাকা মাসাআকি! ছবিটি ১৯৭২ সালে ঢাকায় গৃহীত। রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী হায়াকাওয়া তাকেশিসহ (১৯১৬-৮২) তিনজন বাংলাদেশে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে জাপানে আমন্ত্রণ জানাতে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তানাকা কাকুয়েইয়ের (১৯১৮-৯৩) প্রতিনিধি হিসেবে। অজানা এক ইতিহাস উঠে এল সে দিন। ভাগ্যক্রমে ফ্রেমে দুটি ছবি ছিল, তাই একটি ছবি আমাকে তানাকা সেনসেই উপহার দিলেন। দিলেন স্বরচিত একটি গ্রন্থ স্বাক্ষর করে। আরও দিলেন রাধাবিনোদ পাল সম্পর্কে ৪০ পৃষ্ঠার একটি অমূল্য সম্পদ ‘পা-রু হাকুশি নো কোতোবা’ বা ‘বিচারপতি পালের বক্তব্য’ নামে একটি পুস্তিকা। সেটাও তাঁরই লেখা শিমোনাকা জাইদান ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত ১৯৯৫ সালে। এটি ‘পাল-শিমোনাকা মেমোরিয়াল হল’ নামের একটি প্রচারপত্র জাপানি ও ইংরেজি ভাষায় মুদ্রিত। পুস্তিকাটিতে অসামান্য সব তথ্য ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ধৃত আছে বিচারপতি পালের ১৯৫২, ১৯৫৩ ও ১৯৬৬ সালে জাপান সফরের সময়কার। তানাকা সেনসেইয়ের কাছ থেকে আমি দুটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজ পেলাম, একটি পাল-শিমোনাকা কিনেনকান এবং অন্যটি য়োকোহামা বন্দরনগরের ‘ওওকুরায়ামা কিনেনকান’। সেখানে পেয়েছি রবীন্দ্রনাথ-জাপান সম্পর্কের অজানা ইতিহাসের আরেক খনি!

default-image


১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে তানাকা সেনসেইয়ের সহযোগিতায় হেইবোনশার সঙ্গে যোগাযোগ করে এক রোববার খুব সকালে শিনজুকু শহর থেকে ওদাওয়ারাগামী ট্রেনে চড়ে কানাগাওয়া-প্রিফেকচারের হাকোনে শহরে নামলাম। সেখান থেকে বাসে করে মোতো হাকোনে নামক স্থানে পাহাড়ের ওপ​র ‘পাল-শিমোনাকা কিনেনকান’ ভবনের কাছে পৌঁছালাম। তারপর খানিকটা নির্জন পাহাড়ি রাস্তা হেঁটে একটি মাঝারিগোছের উদ্যানের মতো জায়গায় গেলাম। পাশেই দেখলাম বসতবাড়ি, দালান ভবন একাধিক। উদ্যানে রয়েছে একাধিক স্থাপনা; যথাক্রমে পাল-শিমোনাকা কিনেনকান, পাল-শিমোনাকা কিনেনকান হি, পাল ও শিমোনাকা নো হি, শাকুসোন সেইরেইদেন, শুপ্পান হেইওয়াদোও, সেইদোওবা হোনবু, সেইদোওবা কাইকান, গ্যারেজ ও টয়লেট। উদ্যানের প্রবেশমুখেই স্মারকভবনের নামফলক। তারপর বাণীর পাথুরে ফলক। এর সামনে দিয়েই হেঁটে গিয়ে মুখোমুখি হলাম ‘শুপ্পান হেইওয়াদোও’ বা ‘প্রকাশনা শান্তিভবন’ নামক একতলা একটি স্থাপনার, তারই বাঁ দিকে কংক্রিটের দোচালা বাড়ি, সেটাই পাল-শিমোনাকা কিনেনকান। ফটক খোলা রাখা হয়েছিল। সাধারণত এটা বন্ধই থাকে। কেউ দেখতে যাওয়ার আগে যোগাযোগ করে যেতে হয়, তখন তদারককারী তালা খুলে রাখেন।

default-image

স্মারক ভবনে প্রবেশ করেই দেখলাম সামনে রয়েছে দেয়ালে সাজানো দুজনের দুটি ছবি, বিশ্বমানচিত্র, তার ওপর বিচারপতি পাল ও শিমোনাকার দুটি বাণী। নিচে দুটি ফলকে খোদাই করা এই স্থাপনার উদ্দেশ্য। দুটি সিঁড়ি দুদিকে দোতলার দিকে উঠে গেছে। এটা দোতলা ভবনই কিন্তু বাইরে থেকে বোঝা যায় না। নকশা অসাধারণ! নিচতলায় রয়েছে নিচু টেবিলে অসংখ্য ফাইল, ছবির অ্যালবাম, পত্রিকার কাটিং, বইপত্র, দেয়ালে ছবি, দুজনের জীবদ্দশাকালের কর্মকাণ্ডের বৃত্তান্ত বর্ণিত বোর্ড, দুজনের ছবি ও ঘটনার সচিত্র বিবরণী বোর্ড, টোকিও ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি পালের ব্যবহৃত চেয়ার ইত্যাদি। দোতলা দুটি ভাগে বিভক্ত। একদিকে বিচারপতি পালের অন্যদিকে শিমোনাকার। পালের রয়েছে ব্যবহৃত জিনিসপত্র, পোশাক, ট্রাইব্যুনালে ব্যবহৃত পোশাক, জুতা, পাসপোর্ট, কলম, চশমা, চিঠিপত্র, ছেলেবেলা, যৌবন ও বার্ধক্য জীবনের আলোকচিত্র, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও সাক্ষাৎকারের কাটিং, নিহোন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত সম্মাননাপত্র, পালের স্বলিখিত বিভিন্ন প্রবন্ধ, বক্তৃতার পাণ্ডুলিপি ও বক্তব্য-বাণী ইত্যাদি। অন্যদিকে শিমোনাকারও একই জিনিস রক্ষিত আছে, অতিরিক্ত হচ্ছে তাঁর তৈরি মাটির বিভিন্ন তৈজসপত্র কারণ, তিনি খ্যাতিমান মৃৎশিল্পীও ছিলেন। এ ছাড়া রয়েছে টোকিও ট্রাইব্যুনালের ইতিহাস ও বিভিন্ন দুর্লভ গ্রন্থ ও ম্যাগাজিন। (আগামী পর্বে সমাপ্য)৷
প্রবীর বিকাশ সরকার
জাপান প্রবাসী লেখক ও গবেষক

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন