default-image

নিতু চিন্তামগ্ন হয়ে বসে আছে। আমি তার কাছে গিয়ে নরম সুরে জিজ্ঞেস করলাম,
-কী ব্যাপার, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?
-প্লিজ, বিরক্ত কোরো না। আমি খুবই টেনশনে আছি। টেনশনে আমার মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে।
-ইচ্ছে করলে ছিঁড়বে। এটা কোনো সমস্যা না। আর তুমি চাইলে আমিও তোমাকে চুল ছিঁড়তে সাহায্য করতে পারি।
-কী বললা!
-রাগ করছ কেন? আমি তো শুধু তোমাকে সাহায্য করতে চেয়েছি। শোনো, এতগুলো চুল একা একা ছেঁড়া, ইটস নট আ জোক।
-শোনো, সব সময় সবকিছু নিয়ে ফান করবে না।
-আমি তো ফান করছি না, আমি সিরিয়াস। দাঁড়াও চুল ছেঁড়া শুরু করি, তাহলে ঠিকই বিশ্বাস করবে।
বলেই তার চুলে হাত দিতে গেলাম। সে একনিমেষেই উঠে দাঁড়াল। তারপর বড় বড় অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি ভয় পেয়ে হাত সরিয়ে নিলাম।
-ঠিক আছে, তুমি না চাইলে সাহায্য করব না। এখন বলো তোমার টেনশনের কারণ কী?
-আগামীকাল আমার বান্ধবী পায়েলের জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে ও বিশেষ একটা পার্টি করছে।
-পায়েল মানে ওই সুন্দরী মেয়েটি, হাসলে যার গালে টোল পড়ে?
-সর্বনাশ, পায়েলের গালের টোলও তোমার চোখ এড়ায়নি। ছি ছি ছি, তুমি আমার বান্ধবীকে এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছ?
-না, আমি তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখিনি। কথা বলার সময় যখন তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তখন আবিষ্কার করলাম হাসলে তার গালে মিষ্টি টোল পড়ে।
-ও, টোল মিষ্টি না টক, তুমি সেটাও বোঝো! আচ্ছা বলো তো আমার টোল কেমন?
-আরে তোমার তো টোলই পড়ে না। পড়লে অবশ্য তোমারটাও মিষ্টি হতো।
-শোনো, তোমাকে একটা কথা আজ সোজাসুজি বলে দিচ্ছি। এখন থেকে পায়েলের সঙ্গে কথা বলার সময় তুমি ওর মুখের দিকে ভুলেও তাকাবে না।
-ঠিক আছে তাকাব না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি যদি মুখের দিকে না তাকিয়ে শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকি, তাহলে তো উনি ভাববেন, আমার চরিত্রে সমস্যা আছে।
-তুমি শরীরের দিকেও তাকাবে না।
-তাহলে কী করব?
-চোখ বন্ধ করে কথা বলবে অথবা তুমি তোমার পায়ের দিকে তাকিয়ে কথা বলবে। আর শোনো, শুধু পায়েল না, তুমি এই পৃথিবীর কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়ে কথা বলবে না।
-আচ্ছা তা না হয় করলাম, কিন্তু তোমার বান্ধবীর জন্মদিনের সঙ্গে টেনশনের কী সম্পর্ক, সেটাই তো এখনো বুঝলাম না।
-শোনো, পায়েল বলেছে, পার্টিতে সবাইকে কালো পোশাক পরে যেতে হবে। কিন্তু আমাদের দুজনেরই তো কালো কোনো পোশাক নেই।
-কালো পোশাক পরতে হবে কেন? আমরা কি পার্টিতে যাচ্ছি, নাকি ডাকাতি করতে যাচ্ছি?
-শোনো, অত কথা বলে লাভ নেই, যেখান থেকে পারো কালো পোশাকের ব্যবস্থা করো।
-মানে কী! করোনার কারণে এখন দেশে লকডাউন চলছে। দোকানপাট সব বন্ধ। আমি কোথা থেকে ব্যবস্থা করব?
-সেটা তো আমি জানি না। তুমি আমার স্বামী। স্বামীর দায়িত্ব হচ্ছে স্ত্রীর চাহিদা পূর্ণ করা। অতএব কিছু একটা করো।

default-image

পরের দিন সকালে রিকশা করে নিউমার্কেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। উদ্দেশ্য কালো কাপড় কিনব। কিন্তু কপাল খারাপ, সায়েন্স ল্যাবের কাছে আসতেই পুলিশ কনস্টেবল রফিক সাহেব হাত তুলে রিকশা থামালেন। তিনি চোখ লাল করে জিজ্ঞেস করলেন,
-কই যান? আপনি জানেন না, এখন লকডাউন চলছে?
-জানব না কেন? অবশ্যই জানি।
-জানলে রাস্তায় বের হলেন কেন? যান, বাসায় চলে যান।
-সম্ভব না। আমাকে নিউমার্কেট যেতেই হবে। বিষয়টি অতীব জরুরি।
-কী সেই জরুরি কাজ শুনি।
-না, তা বলা যাবে না। বিষয়টি খুবই গোপনীয়।
-কিন্তু না বললে তো যেতে পারবেন না। আমি বুঝতে চাই বিষয়টি কতটুকু জরুরি। জরুরি হলে যেতে পারবেন।
-ঠিক আছে তাহলে আপনাকে খুলেই বলি। প্লিজ কাউকে বলবেন না। ভাই শোনেন, করোনার কারণে আয়–রোজগার একেবারে কমে গেছে। তাই আমি ঠিক করেছি এখন থেকে নিয়মিত ডাকাতি করব। আমার স্ত্রী খুবই জ্ঞানী মহিলা। সে বলেছে কালো কাপড় পরে রাতে ডাকাতি করতে গেলে মানুষ আমাকে দেখতে পাবে না। সে জন্য কালো কাপড় কিনতে নিউমার্কেট যাচ্ছি। ইচ্ছে আছে আজ রাত থেকেই ডাকাতি শুরু করব।
-আপনি কি আমার সঙ্গে মশকরা করছেন? খবরদার, পুলিশের সঙ্গে মশকরা করবেন না। বাংলাদেশের পুলিশ মশকরা পছন্দ করে না।

বিজ্ঞাপন

-ভাই, মশকরা করব কেন? আমি সিরিয়াস।
-শোনেন, আপনার ফালতু সিরিয়াসে পুলিশের কিছু যায়–আসে না। আপনি এখন নিউমার্কেট যেতে পারবেন না। আপনি বাসায় চলে যান।
-তাহলে আপনি আমাকে যেতে দেবেন না? ঠিক আছে আমি বাসায় চলে যাচ্ছি। তবে যাওয়ার আগে আমি কি আপনাকে একটি দরকারি প্রশ্ন করতে পারি?
-বলেন, কী প্রশ্ন?
-আচ্ছা ভাই, ডাকাতি পেশায় আয়-রোজগার কেমন? মানে ডাকাতি করে কি সচ্ছলভাবে সংসার চালাতে পারব?
কনস্টেবল রফিক সাহেব ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর সরাসরি আপনি থেকে তুইয়ে নেমে গেলেন। দাঁত-মুখ খিঁচে বললেন,
-ডাকাতি করবি তুই, আর তার পরামর্শ নিবি পুলিশের কাছ থেকে! বেটা বদমাশ, আমি কি ডাকাত, যে তুই আমার কাছে ডাকাতের আয় জানতে চাস?
-ভাই, রাগ করছেন কেন? আসলে আপনার চেহারার মধ্যে একটা ডাকাত ডাকাত ভাব আছে, তাই আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।
-এই, তোরে না বলছি পুলিশের সঙ্গে মশকরা করবি না। পুলিশ কি তোর দুলাভাই যে তুই মশকরা করিস? পুলিশের সঙ্গে মশকরা করলে কী হয়, তা তুই এখন হাড়ে হাড়ে টের পাবি।
-ভাইজান, আমার আসলে বুঝতে একটু ভুল হয়ে গেছে। আমি এবার খুব ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, আপনার চেহারার মধ্যে আসলে এসপি এসপি একটা ব্যাপার আছে।
-একটু আগেই না তুই বললি আমার চেহারার মধ্যে ডাকাত ডাকাত ভাব আছে। আর এখন বলছিস এসপি। তুই কি এখন আমারে তেল দিচ্ছিস? শোন, তুই আমারে এখন পুলিশের আইজি বানায় দিলেও তোরে আমি ছাড়ব না।
এ কথা বলে কনস্টেবল রফিক সাহেব আমার ফোন কেড়ে নিলেন। এরপর তিনি আমাকে কড়া রোদের মধ্যে তিন ঘণ্টা ফুটপাতে বসিয়ে রাখলেন। ঠিক তিন ঘণ্টা পর রফিক সাহেব আমাকে ফোন ফেরত দিয়ে বললেন,
-আশা করি পুলিশের সঙ্গে আর কখনো মশকরা করবেন না। যান এখন চুপচাপ সোজা বাসায় চলে যান।
আমি তাঁকে সবিনয়ে বললাম,
-জি ভাই, আমার শিক্ষা হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে জীবনেও আর মশকরা করব না। তা ভাই, বাসায় যাওয়ার আগে আর একটা দরকারি প্রশ্ন করতে পারি?
-করেন। তবে খবরদার ফালতু প্রশ্ন করবেন না। তাহলে খবর করে দেব।
-না ভাই, ফালতু প্রশ্ন না। খুবই দরকারি প্রশ্ন। ভাই ভেবেছিলাম দা-বঁটি নিয়ে ডাকাতি করতে যাব। কিন্তু আপনার হাতের বন্দুক দেখে এখন মনে একটা খায়েশ জাগছে। মনে হচ্ছে, ডাকাতির সময় সঙ্গে একটা বন্দুক থাকলে ভালো হয়। তাহলে মানুষ একটু সম্মানের চোখে দেখত। যেকোনো পেশায় সম্মানটা খুবই জরুরি, কী বলেন ভাই?
রফিক সাহেব এবার চোখ-মুখ-ভুরু সব একসঙ্গে কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি তাঁকে আবার প্রশ্ন করলাম।

default-image

-আচ্ছা ভাই, সেকেন্ডহ্যান্ড বন্দুক কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারেন? ভাবছি একটা খরিদ করব।
-ওই, তুই আবার শুরু করছোস? তোরে না বলছি পুলিশের সঙ্গে মশকরা করবি না।
-ভাই, বিশ্বাস করেন আমি মশকরা করছি না। আমি সিরিয়াস। ডাকাতি করতে যাব, হাতে একটা বন্দুক থাকবে না, এটা কেমন কথা? ভাই যদি অনুমতি দেন, তো আর একটা দরকারি প্রশ্ন করি?
-তোর দরকারি প্রশ্নের গুষ্টি কিলাই। বেটা বদমাশ, তুই দূর হ আমার সামনে থেকে।
-ভাই প্লিজ, এটাই শেষ প্রশ্ন।
আমি রফিক সাহেবের অনুমতির অপেক্ষা না করেই নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলা শুরু করলাম,

-ভাই, আপনার হাতে যে বন্দুকটা আছে, সেটা কি আমার কাছে ভাড়া দেবেন? শোনেন, এ বিষয়টা আমার আর আপনার মধ্যে গোপন থাকবে। কাকপক্ষীও টের পাবে না। দিনের বেলা এ বন্দুক নিয়ে আপনি ডিউটি করবেন, আরে রাতে আমি এই বন্দুক দিয়া ডাকাতি করব। বলেন ভাই, ঘণ্টাপ্রতি কত টাকা ভাড়া চান?
-তুই পুলিশের বন্দুক ভাড়া নিয়া ডাকাতি করবি! তুই এত বড় ডাকাত হইছোস? যা তুই আরও তিন ঘণ্টা রোদের মধ্যে বসে থাক।
বলেই রফিক সাহেব আবার আমার ফোন নিয়ে নিলেন। আমি নরম সুরে বললাম,
-রফিক স্যার, আমি এবার আরও ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, আসলে এসপি না, আপনার চেহারার মধ্যে সেনাবাহিনীর মেজর মেজর একটা ভাব আছে।
-শোন, তুই আমারে এখন সেনাবাহিনীর চিফ বানায়ে দিলেও কোনো লাভ হবে না। তোরে আমি তিন ঘণ্টা আগে ছাড়ব না। যা চুপচাপ বইসা থাক।
ঠিক তিন ঘণ্টা পর রফিক সাহেব আমাকে ছেড়ে দিলেন। তবে আমার প্রশ্নের ভয়ে উনি আর আমার কাছে এলেন না। অন্য একজন কনস্টেবলের হাতে আমার ফোন ফেরত পাঠালেন। আর দূর থেকে হাত ইশারা করে উনি আমায় চলে যেতে বললেন। ভাবলাম যাওয়ার আগে রফিক সাহেবকে আর একটা প্রশ্ন করে যাই। আমি রফিক সাহেবের দিকে এগিয়ে যেতেই উনি চিৎকার করে বললেন,
-খবরদার, তুই আমার কাছে আসবি না। আমি আর তোর কোনো প্রশ্ন শুনতে চাই না। তোর যেখানে ইচ্ছে সেখানে যা। তুই এখন স্বাধীন।
-ভাইজান, আপনি না বলেছিলেন লকডাউনে কোথাও যাওয়া যাবে না।
-আমি ভুল বলেছি। আসলে সরকার লকডাউন দিছে মানুষের জন্য, তোর মতো পাগলের জন্য না। তুই লকডাউনের আওতামুক্ত।
-ধন্যবাদ। ভাই, ছোট্ট আর একটা দরকারি প্রশ্ন ছিল। আচ্ছা...
কথা শেষ করতে পারলাম না। রফিক সাহেব আমার বুক বরাবর বন্দুক তাক করলেন। তারপর চিৎকার করে বললেন,
-খবরদার তুই মুখ খুলবি না। মুখ খুললেই আমি কিন্তু তোরে গুল্লি কইরা দিমু।
এরপর উনি উনার সাবইন্সপেক্টরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-স্যার, এই বেটারে এখান থেকে যাইতে বলেন। এর মাথায় সমস্যা আছে। এ বেটা উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে আমার মাথা খারাপ করে দিছে। আমি কিন্তু এরে গুলি কইরা দিমু।

default-image

সাবইন্সপেক্টর আমাকে চলে যাওয়ার জন্য ইশারা করলেন। আমি সাবইন্সপেক্টরের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-স্যার, আমি যাচ্ছি। তবে দরকারি একটা প্রশ্ন করার ছিল।
-কী প্রশ্ন বলেন।
-স্যার, প্রশ্নটা রফিক সাহেবকে করতে হবে। খুবই দরকারি প্রশ্ন।
এ সময় রফিক সাহেব চিৎকার করে বললেন,
-স্যার, আমি ওর কোনো প্রশ্ন শুনব না। ওর কোনো প্রশ্নই দরকারি না।
-আরে শুনেই দেখেন না, উনি কী বলতে চান।
-স্যার, আপনি ওরে চেনেন না। আমার ধারণা, ওই বেটা এখন সেকেন্ডহ্যান্ড ট্যাংক কোথায় কিনতে পাওয়া যায়, সেই ঠিকানা আমার কাছে জানতে চাইবে।
ঠিক সে সময় নিতুর ফোন পেলাম। তাড়াতাড়ি ফোন রিসিভ করতেই নিতু চিৎকার করে উঠল,
-তোমার সমস্যা কী? তুমি আমার ফোন ধরছ না কেন?
-কীভাবে ফোন ধরব? পুলিশ আমার ফোন কেড়ে নিয়ে গত ছয় ঘণ্টা আমারে ফুটপাতে বসায়ে রাখছে।
-কেন! কী করছ তুমি?
-আমি কিছুই করিনি। আমি শুধু পুলিশকে একটা ভালো প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা ওদের পছন্দ হয়নি।
-কী প্রস্তাব দিয়েছিল তুমি!
-আমি পুলিশকে বন্দুক ভাড়া দেওয়ার জন্য একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম।
-মানে কী! তুমি বন্দুক দিয়ে কী করবা!

বিজ্ঞাপন

-তেমন কিছু না। হঠাৎ কেন জানি ডাকাতি করতে ইচ্ছে হচ্ছে।
-তুমি কি আমার সঙ্গে মজা করার চেষ্টা করছ? শোনো, আমাকে বানিয়ে বানিয়ে উল্টাপাল্টা গল্প বলবে না।
-তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছ না? ঠিক আছে, তুমি রফিক স্যারের সঙ্গে কথা বলো, তাহলে সব বুঝতে পারবে।
আমি হাত লম্বা করে ফোনটা রফিক সাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললাম,
-স্যার, আমার স্ত্রী আপনাকে একটা খুবই দরকারি প্রশ্ন করতে চাইছে। নিন, ওর সঙ্গে একটু কথা বলুন। মনে রাখবেন, সে খুবই জ্ঞানী মহিলা।
-অসম্ভব। তোর মতো পাগলের কোনো ব্যাপারেই আমি আর নেই। শোন ভাই, আমি তোরে রিকশা থেকে নামায়ে অনেক বড় ভুল করছি। তুই আমারে এবারের মতো মাফ কইরা দে। আমি তোরে জীবনেও আর আটকাব না।
বলেই রফিক সাহেব এক দৌড়ে পুলিশ বক্সের ভেতর ঢুকে পড়লেন।
সারা নিউমার্কেট ঘুরে মাত্র একটি কাপড়ের দোকান খোলা পেলাম। দোকানদার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য তাঁর দোকান খুলেছিলেন। ওই দোকান থেকে আমার আর নিতুর জন্য দুটো কালো পোশাক কিনে নিলাম।
বাসায় ফিরে পোশাকের ব্যাগটা নিতুর হাতে দিলাম। সে ব্যাগটি হাতে নিয়ে মিষ্টি করে বলল,
-তুমি আসলেই ওয়ার্ল্ডের বেস্ট হাসবেন্ড। আই লাভ ইউ। ইউ আর মাই হিরো।
স্ত্রীর ভালোবাসামাখা কথায় আবেগে চোখ ভিজে গেল।
নিতু শপিং ব্যাগটি নিয়ে বেডরুমে চলে গেল। ঠিক ২০ সেকেন্ডের মধ্যেই সে আবার ফিরে এল। এসে কোনো কথা না বলে ভুরু কুঁচকে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
-জান, এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? কোনো সমস্যা?
-তুমি আমার জন্য এটা কী আনছ?
-শোনো, এটা একশত ভাগ কালো পোশাক। আর এটা সৌদি আরব থেকে ইমপোর্ট করা।
-আমি তো তোমার কাছে এত ব্যাখ্যা চাইনি। আমি প্রশ্ন করেছি, এটা কী আনছ?
-বোরকা।
নিতু রাগ কন্ট্রোল করে নরম স্বরে প্রশ্ন করল,
-বোরকা আনার কারণ।

default-image


-শোনো, পুরো নিউমার্কেটে মাত্র একটা দোকানই খোলা পেয়েছি। আর সেটা একটা বোরকা স্টোর। ওখানে বোরকা ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যায় না। তো আমি কী করব?
-তাহলে আনতে না। বোরকা পরে কি কেউ পার্টিতে যায়? তোমার ব্যাগটা দাও তো। দেখি তুমি তোমার জন্য কী আনছ?
ব্যাগটি না দিয়ে আমি আমার পেছনে লুকিয়ে ফেললাম। তারপর মিনমিন করে বললাম,
-না, এটা দেখানো যাবে না। সমস্যা আছে।
সে আমার কাছে এসে জোর করে ব্যাগটি কেড়ে নিল। তারপর প্যাকেট খুলে চিৎকার করে উঠল,
-এটা কার জন্য!
আমি ঢোঁক গিলে বললাম,
-আমার জন্য।
-শয়তান বেটা, আমার জন্য বোরকা কিনছোস বুঝলাম। তাই বলে তুই তোর জন্যও বোরকা কিনবি!
-বললাম না ওই দোকানে বোরকা ছাড়া অন্য কিছু নেই। নিতু শোনো, দুজনে আজ বোরকা পরেই পার্টিতে যাব। তুমি দেইখো খুব একটা খারাপ লাগবে না।
-আচ্ছা তুমি বলতে পারো, দুনিয়ায় এত মানুষ থাকতে তোমার মতো পাগলরে আল্লাহ কেন আমার কপালে জোটাইছে?

-সেটা আমি কীভাবে বলব? শোনো, আল্লাহর হিসাব তো তুমি-আমি বুঝব না।
-খবরদার, ভাষণ দিবা না। এখন আমার একটা কথা মন দিয়ে শোনো। আমি এখন পায়েলকে ফোন দেব। কিন্তু আমি কথা বলব না, কথা বলবে তুমি। বলবে নিতু একটু অসুস্থ, তাই আমরা যেতে পারব না। ঠিক আছে?
-নো প্রবলেম। তুমি টেনশন কোরো না, আমি সুন্দর করে গুছিয়ে বলব।
নিতু ওর ফোন থেকে পায়েলকে ফোন দিল। এরপর ফোনটা আমার হাতে দিল। পায়েল হ্যালো বলতেই আমি বললাম,
-পায়েল আপা, আপনি কেমন আছেন?
-ভালো।
-পায়েল আপা, একটা সমস্যা হয়ে গেছে। যার কারণে আজ আমরা আসতে পারছি না।
-কেন? কী সমস্যা?
আমি গলায় আবেগ মিশিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললাম,
-আপা, নিতু অনেক অসুস্থ। ওর করোনা হয়েছে। আপনারা ওকে মাফ করে দিয়েন। ও এখন ভেন্টিলেশনে আছে। যেকোনো সময় ভেন্টিলেটর খুলে নিয়ে ওকে মৃত ঘোষণা করা হ...
কথা শেষ করতে পারলাম না। নিতু একঝটকায় আমার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে লাইন কেটে দিল। তারপর আবারও ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
-নিতু, তোমার সমস্যা কী? আমি সব সময় লক্ষ করে দেখেছি, আমি যখনই কোনো কথা বলি, তখনই তোমার ভুরু দুটো কুঁচকে যায়। এর কারণ কী? শোনো, স্বামীর সব কথায় এভাবে রিঅ্যাকশন দেওয়াটা কিন্তু ঠিক না। এতে স্বামীর আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
-বদমাশ বেটা, তোর আত্মবিশ্বাসের গুষ্টি কিলাই। তোকে আমি বললাম কী, আর তুই করলি কী?
-মানে কী, তুমিই তো বললা ফোন করে বলতে তুমি অসুস্থ।
-তোমারে কী আমি এত বাড়ায়ে বলতে বলেছি। তুমি তো আমারে মাইরাই ফেললা। আর এই দুনিয়ায় করোনা ছাড়া অন্য কোনো রোগের নাম তোমার জানা নেই?
-থাকবে না কেন? অবশ্যই আছে। আমি ভাবলাম, এটা লেটেস্ট একটা অসুখ, তো এটাই বলি। আচ্ছা এক কাজ করি, আবার ফোন দিয়ে বলি, তোমার করোনা না, তোমার যক্ষ্মা হয়ে...
এ পর্যন্ত বলেই থেমে গেলাম। কারণ দেখলাম, নিতু আবারও ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। না, এই মেয়ের সামনে কোনো কথাই বলা যাবে না। আমি যাই বলি, তাতেই ভুরু কুঁচকে ফেলে। আজব মেয়ে, স্বামীর সব কথাতেই দোষ ধরে। এটা তো খুবই অন্যায়।


*লেখক: ইমদাদ বাবু, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র। [email protected]

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন