default-image

হুট করেই বাবাকে খুব মনে পড়ছে৷ এই মুহূর্তেই তাঁকে দেখতে ইচ্ছা করছে। বাবাকে ঘিরে কিছু কথা বারবার নাড়া দিয়ে যাচ্ছে মনটাকে। আমি, বাবা আর মা তিনজনই মেঝো৷ তাই আমাদের মাঝে বোঝাপড়াটাও বেশ ভালো।
অনেক দিন আগের কথা। আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। একদিন খুব সকালে আমরা তিনজনই বের হলাম যশোর যাব বলে। গন্তব্য ফাতিমা হসপিটাল। আমি আবার খুব বেশি মাত্রায় রোগশোকে ভুগতাম৷ আর বাবা-মার চিন্তার মাত্রা কয়েক ডিগ্রি বাড়িয়ে দিতাম। আমরা এত সকালে বের হলাম যে, ভোরের আলো সবেমাত্র ফুটেছে। আমাদের গ্রাম থেকে বের হলে বেশ বড় বাঁশবাগান আর তার পরেই পড়ে ছোটখাটো কিন্তু আমাদের চোখে বেশ বড় একটা নদী। নদীতে পানি কম থাকলে বাঁশের সাঁকোই ভরসা আর বেশি থাকলে নৌকা আর মাঝির ওপরই নির্ভর করতে হয়।
সেদিন সকালে গিয়ে দেখি কোনো মাঝি নেই আর একটা ভাঙা নৌকা কূলে বাঁধা। আমরা ভাবছি, ভালো নৌকা কোথায় গেল? খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল কিছু দুষ্টু ছেলে সেটা ধৈঞ্চার খেতের মাঝে নিয়ে গিয়ে রেখেছে৷ যে জায়গায় রাখা সেখানে অনেক পানি। আমাদের গ্রামে তখন নতুন বাজার বসেছে আর সেই বাজারে রাতভর ভাব আর বাউল গানের আসর বসত, বাজারটাকে ঠিকঠাকমতো জমানোর জন্য। সেই গান শেষ করেই ফেরার পথে এই অপকর্ম করেছে ছেলেগুলো। আমার তো কোনো চিন্তাই নেই৷ বাবা তো আছেনই৷ তাই যত চিন্তা সব বাবার। বাবা থাকলে আসলে কোনো ভয়ই কাজ করে না৷ ঠিক যেন ছায়াময় কোনো বটবৃক্ষ। বাবার কথায় বিন্দুমাত্র অমত না করে আমি আর মা সেই ভাঙা নৌকায় গিয়ে বসলাম। কি আজব! একটু নড়াচড়া করলেই ডুবে যেতে চায় নৌকাটা। সমানে পানি উঠছে, চারদিকে অথই পানি কিন্তু সত্যি বলতে এতটুকু ভয় পাইনি। দুনিয়ার সব থেকে বিশ্বাসযোগ্য দুইজন সঙ্গে থাকলে বোধ হয় এ রকমই আত্মবিশ্বাসী হওয়াই যায়।

বাবা ওই দিন শক্তপোক্ত মাঝি হতে বাধ্য হয়েছিলেন আমাদের জন্য। একসময় কূলে ভিড়ল নৌকা। আমরা নামলাম আর বাবার পিছুপিছু ছুটলাম পরবর্তী পদক্ষেপে। বাবা সারাটা জীবন এভাবেই একটা সংসার নামের ভাঙা নৌকা ডুববে জেনেও কূলে ভিড়িয়ে গেলেন হাসিমুখে, সব মুখে হাসি ফোটানোর জন্যে। সবকটা বিপদে বুকে আগলে রেখেছেন নির্ভীক নাবিকের মতো। তোমার কথাই ঠিক বাবা, আমরা বড় অকৃতজ্ঞ, তোমাকে ভুলই বুঝে গেলাম। খুব কান্না পাচ্ছে। হুট করেই তোমাকে খুব মনে পড়ছে বাবা। সবাই বাবাকে ভয় পায়, একহাতে এতটা বড় সংসার সামলানোর জন্য এ ভয়টা খুব জরুরি আর এ ভয়ের মাঝেই কোথায় যেন লুকানো আছে নির্ভেজাল ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। যদিও সে ভয় ছুঁতে পারেনি আমাকে, সেই সুযোগ তুমি দাওনি। আমাকে একটু অন্য চোখেই দেখো সারাটা জীবন। এতটা দূর থেকে তোমাকে জানানোর মতো কোনো ভাষাই আর অবশিষ্ট নেই জেনে এখানেই লিখলাম। তুমি ভালো থেকো।

(লেখক শিক্ষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ৷ বর্তমানে Wageningen University and Research, Wageningen, The Netherlands-এ অধ্যয়নরত)

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন