default-image

মাঝেমধ্যে কিছুদিনের জন্য একা থাকাটা দরকার। এটা আমার নিজস্ব মত। বিশেষ করে স্বামী–স্ত্রীর মাঝেমধ্যে একা থাকা উচিত। একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা উচিত নয়। একাধারে যদি দিনের বেশির ভাগ সময় একসঙ্গে থাকা হয়, তবে কখনো কখনো ভালোবাসা বৃদ্ধির বিপরীতে কিছু একঘেয়েমি, কিছু ভুল–বোঝাবুঝি, কিছু রাগ, অভিমান শেষমেশ ঝগড়াঝাটি পর্যন্ত হয়। আমার মনে হয়, স্বামী–স্ত্রীর নিজেদের আলাদাভাবে একটু জায়গা দরকার। একেবারে একান্তই তাঁদের আলাদা কিছু সময় দরকার। তাতে নিজেদের জীবনে অন্যজনের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে। আমার সঙ্গে অনেকেই দ্বিমত করতে পারেন, তবে আমার এটাই মনে হয়েছে।

খুব বেশি দিন একসঙ্গে দিনরাত থাকার যেমন সুবিধা আছে, অনেক ক্ষেত্রে অসুবিধাও আছে। একসঙ্গে থাকলে মাঝেমধ্যে চরম বিরক্তি এবং পরস্পরের প্রতি অনাগ্রহ আসতে পারে। তবে এমন নয় যে ভালোবাসা আসে না। এটা সবার ক্ষেত্রে নয়, তবে অনেকের ক্ষেত্রে এমন হয়।

গত লকডাউনের সময় স্বামী–স্ত্রীরা একটা দীর্ঘ সময় কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেয়েছেন। শুরুর দিকে ব্যাপারটা বেশ সাবলীল ও রোমান্টিক হলেও আস্তে আস্তে বিরক্তির কারণ বেড়েছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা দিন দিন হারিয়েছে। নানা ক্ষেত্রে ভুল–বোঝাবুঝি ব্যাপক হারে বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদে গিয়ে নিষ্পত্তি হয়েছে।

একটা পরিসংখ্যান দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। শুধু রাজধানীতেই স্বামী-স্ত্রীর বাক্‌বিতণ্ডায় প্রতি ঘণ্টায় একাধিক সংসার ভেঙে যাচ্ছে। প্রতি মাসে বিচ্ছেদ হচ্ছে ৮৪৩টির বেশি দম্পতির। এর মধ্যে বিচ্ছেদে এগিয়ে রয়েছেন নারীরা। এই পরিসংখ্যান আরও জানাচ্ছে, ঢাকার তুলনায় অন্যান্য বিভাগীয় অঞ্চল মোটেও এই বিচ্ছেদের সংখ্যায় পিছিয়ে নেই।

বিজ্ঞাপন
default-image

২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিচ্ছেদের নোটিশ প্রেরণকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী। মানে নারীরাই সবচেয়ে বেশি বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করছেন। এই ৭০ শতাংশের বাইরে সামাজিকতার কারণে, বাচ্চাদের কারণে, নিরাপত্তার কারণে অনেকেই বিচ্ছেদের পথে হাঁটেননি। কিন্তু এর সংখ্যা নেহায়েত কম নয় বরং বেশ উদ্বেগজনক।

২০২০ সালের ইংরেজির পরিসংখ্যান অনুযায়ী যদি ঢাকার দিকে তাকানো যায়, তবে দেখা যায়, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের হিসাবমতে, সে বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাস হলেও লকডাউনে এক মাস বন্ধ ছিল। বাকি পাঁচ মাসে দুই সিটিতে বিচ্ছেদ চেয়ে আবেদন জমা পড়েছে ৪ হাজার ২১৬টি। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ২ হাজার ২০০ এবং দক্ষিণে ২ হাজার ১৬টি। আবেদনকারীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৩০ শতাংশ আর নারী ৭০ শতাংশ।

একটা জাতীয় দৈনিকে ছাপা হওয়া অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীরা বর্তমানে ঝুঁকিতে রয়েছেন। বর্তমানে মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রতি হাজারে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী বিবাহবিচ্ছেদ করছেন। এর বিপরীতে প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পুরুষ বিচ্ছেদ করছেন। বিচ্ছেদের আবেদনকারীদের মধ্যে যাঁরা উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন, তাঁদের সংখ্যা বেশি (হাজারে ১ দশমিক ৭ জন)। স্বল্পশিক্ষিতদের মধ্যে এই হার হাজারে দশমিক ৫।

অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে বিচ্ছেদের হার যেখানে হাজারে এক দশমিক তিন শতাংশ, সেখানে শহরে এই হার হাজারে দশমিক ৮ জন। এ ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষ সবচেয়ে বেশি আবেদন করছেন। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, গ্রামের দম্পতিরা শহরের দম্পতিদের তুলনায় বিবাহবিচ্ছেদে বেশি আগ্রহী। এর মধ্যে দেশের বিভাগীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি রাজশাহী এলাকার মানুষ (প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে) বিচ্ছেদের আবেদন করেন।

এরপর বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে খুলনা (প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৪ শতাংশ)। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটে বিবাহবিচ্ছেদের হার দেশের অন্য বিভাগের তুলনায় কম (প্রতি হাজারে তা দশমিক ৫ শতাংশ)। তথ্যানুযায়ী ২৫ থেকে শুরু করে ২৯ বছর বয়সী নারী-পুরুষেরা বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করেন সবচেয়ে বেশি।

সিলেট প্রবাসীসমৃদ্ধ এলাকা। সেখানে এমন কোনো পরিবার নেই, যেখানে একজনও প্রবাসী নেই। বেশির ভাগ পুরুষ প্রবাসী। সেখানে বাংলাদেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় বিচ্ছেদের হার কম। চট্রগ্রামেও বিচ্ছেদের হার কম।

default-image

প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব এলাকার অনেকেই জানিয়েছেন, প্রবাসী হওয়ায় দম্পতিদের খুব কাছাকাছি থাকা হয় কম। কেউ কেউ বছরে চার–পাঁচ মাস থাকেন। ফলে ভুল–বোঝাবুঝি, খবরদারি, কৃতিত্ব ফলানো, এসব অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের ওপর তাঁরা চাপিয়ে দেন না। তাঁদের সৎ ইচ্ছাকে তাঁরা প্রাধান্য দেন বিধায় মনোমালিন্য খুব বেশি হয় না। হলেও তা অল্পতে শেষ হয়ে যায়। একটা দীর্ঘ সময় পর তাঁরা কাছাকাছি এলে ভালোবাসা দ্বিগুণ থাকে। এটুকু সময় তাঁদের দুজনের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ থাকে।
আবার একেবারে কাছাকাছি থাকলেই যে শ্রদ্ধাবোধ চলে যায়, তা–ও নয়। মানুষ হয়তো একটু পরিবর্তন চায়। আসলে অনেক পরিবারে অনেকের রুচিবোধ আলাদা। আমার মনে হয়, স্বামী–স্ত্রী হলে প্রত্যেকের আলাদা একটা জায়গা দরকার, খুব দরকার। সম্পর্কে একটু জটিলতা এলেই জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গত লকডাউনে আমার এক বন্ধুর পরিবারে এমন জটিলতা হয়েছিল। একেবারে বিবাহবিচ্ছেদের শেষের দিকে যাওয়ার পর ভাবিকে বলেছিলাম, ‘আপনি কয়েক দিন বাবার বাড়িতে থাকুন, আর সেও একা থাকুক। তারপর কয়েক দিন পর সিদ্ধান্ত নেবেন, কী করবেন আপনারা।’ তাঁরা তিন মাস নিজেদের মতো করে আলাদা থেকেছিলেন। এ সময় কেউ কারও সঙ্গে তেমন কথাও বলেননি।

মাত্র তিন মাস পর তাঁরা বুঝেছিলেন, তাঁরা কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারবেন না। ফলাফল, বন্ধুটি একদিন ভাবিকে নিয়ে আসেন। সব অহংকার জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁরা এখন বেশ ভালো আছেন।

সংসারে থাকবেন আর ঝামেলা হবে না, তা তো নয়। অল্পস্বল্প সমস্যা থাকবে, তা নিয়েই চলতে হবে। সহ্যের সীমা অতিক্রম করলেই বিচ্ছেদের প্রশ্ন আসে। কেন বিচ্ছেদের আবেদন হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ নারী বিচ্ছেদের আবেদনে উল্লেখ করেছেন, স্বামীর সন্দেহবাতিক মানসিকতা, পরকীয়া, স্বামীর উদাসীনতা, যৌতুক, মাদকাসক্তি, ফেসবুকে আসক্তি, ব্যক্তিত্বের সংঘাত, পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ ইত্যাদি।

অন্যদিকে স্বামীর পক্ষে আবেদনের ক্ষেত্রে স্বামীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজের ইচ্ছায় চলা, ফেসবুকে আসক্তি, বদমেজাজ, সংসারের প্রতি কম মনোযোগ দেওয়া, ধর্মকর্মে উদাসীনতা, বন্ধ্যাত্বসহ বিভিন্ন কারণ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ দম্পতি বিচ্ছেদে না গিয়ে পুনরায় সংসার করার বিষয়ে একমত হচ্ছেন।
এসব তত্ত্ব আগামী দিনের জন্য ভয়াবহ। একটা বিচ্ছেদ মানে কেবল দুজন আলাদা হওয়া নয়। একটা পরিবারের বিচ্ছেদ, বাচ্চাদের বিচ্ছেদ। তবে একেবারে নিরুপায় হয়ে গেলে বিচ্ছেদ ছাড়া উপায়ও থাকে না।

বিজ্ঞাপন
default-image

পত্রিকায় অনেক বিশেষজ্ঞ জানান, লকডাউনের কারণে দিনের পুরো সময়ই স্বামী-স্ত্রী কাছাকাছি থাকছেন। তাতে করে ছোটখাটো বিষয় নিয়েও পরস্পরের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিচ্ছে। এমনকি অন্য সময় হলেও খুব কাছাকাছি থাকলে, সন্দেহবাতিকতা, ফেসবুক নিয়ে সন্দেহ, পারস্পরিক সম্মান ইত্যাদির ঘাটতি থাকে বিধায় ছোট ছোট ঝগড়া বিচ্ছেদে গড়ায়। বেশির ভাগ বিচ্ছেদ মধ্যবিত্তসহ, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী পরিবারেও হচ্ছে।

আমি বলি, সম্পর্কে একটু জায়গা দরকার। নিজেদের কিছুটা আলাদা সময় দরকার। পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, মূল্যায়ন, সম্মান, শ্রদ্ধাবোধ দেখানো দরকার। সংসারে সবকিছু যে একজনের ভালো লাগায় হবে, তা কেন? কখনো কখনো অন্যের ভালো লাগার গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আর হ্যাঁ, সব সময় মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। তুচ্ছ বিষয়ে গালাগালি করা উচিত নয়। এতে সম্পর্কে চির ধরাই স্বাভাবিক। একটা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এই লেখা।
সবাই ভালো থাকুক। ভালো থাকুক প্রতিটি সংসার।

*লেখক: কাওছার আহমেদ নিলয়, কুয়েতপ্রবাসী

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন