বিজ্ঞাপন

-তা তুমি কি ছেলেকে খুঁজতে গিয়েছিলে, নাকি বিরিয়ানি কিনতে গিয়েছিলে?
-বিরিয়ানি কিনতে গিয়েছিলাম। কারণ, আমার মনে প্রচুর আনন্দ। তুমি জানো আমার যখন প্রচুর আনন্দ লাগে তখন আমি বিরিয়ানি খাই।

-মানে কী? আমার ছেলেকে পাওয়া যাচ্ছে না। আর তুমি আনন্দ-ফুর্তি করার আয়োজন করছ? এত আনন্দ তোমার মনে আসে কোথা থেকে?
-কোথা থেকে আসে সে প্রশ্নের উত্তর আমি পরে দেব। আগে তুমি ময়নাকে ডাকো।
-ময়নাকে ডাকলেও আসবে না। তোমাকে না বলেছি সে এখন ছুটিতে আছে।
-আমার কথা বলে ডাকো। ঠিকই আসবে।

শিউলি বেগম ময়নাকে চিৎকার করে ডাকলেন। বেশ কয়েকবার ডাকার পর ময়না এসে মুখ কালো করে বলল,
-খালাম্মা ডাকেন ক্যা? আমি অহন ছুটিতে আছি। আমি অহন কুনু কাজ করতে পারতাম না।
-শোন, আমি তোরে ডাকিনি। তোর খালু তোকে ডেকেছে।
-তাইলে ঠিক আছে। খালু আমার বস। খালু কইলে ছুটি বন্ধ। কন খালু, কী করতে হইবে?
-যা এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়।

default-image

ময়না পানি নিয়ে এল। সালাম সাহেব ময়না এবং স্ত্রীকে নিয়ে ঘরের বাইরে এলেন। নিতুর কপালে হাত দিয়ে দেখলেন জ্বরে মেয়েটির গা পুড়ে যাচ্ছে। শিউলি বেগম কিছুই বুঝতে পারছেন না এসব কী হচ্ছে। আর মেয়েটি বা কে। সালাম সাহেব স্ত্রীকে উদ্দেশ করে বললেন,
-বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকো না। তোমরা দুজনে মিলে আগে ওর জ্ঞান ফেরাও। তারপর ঘরে নিয়ে ভেজা কাপড় চেঞ্জ করে বিছানায় শুয়ে দাও। আমি ডাক্তার নিয়ে আসছি।
-কে এ মেয়ে?
-সেটা তোমার পরে জানলেও চলবে। তোমাকে যেটা করতে বলেছি সেটা আগে করো।

কথাটি বলেই সালাম সাহেব দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন। মোড়ের ফার্মেসিতে গিয়ে দেখলেন ডাক্তার চলে গেছে। বাধ্য হয়ে ফার্মেসি থেকে জ্বরের ওষুধ নিয়ে বাসায় ফিরে এলেন। বাসায় ঢুকে বেডরুমে গিয়ে দেখেন শিউলি বেগম বিছানায় মুখ কালো করে শুয়ে আছে। সালাম সাহেব ভুরু কুঁচকে স্ত্রীকে প্রশ্ন করলেন,
-তোমার আবার কী হলো?
-কিছু হয়নি।
-মুখ কালো করে রেখেছ কেন?
-আমার গায়ের রং কালো, তাই আমার মুখও কালো। বিয়ে করার আগে তোমার গায়ের রং দেখে বিয়ে করা উচিত ছিল।
-তোমার কী হয়েছে? এভাবে খোঁচা মেরে কথা বলছ কেন?
-খোঁচা মারছি না। যা সত্য তাই বলছি।
-শোনো, তোমার সঙ্গে এই মুহূর্তে ঝগড়া করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। মেয়েটি কোথায়? ওর জ্ঞান কি ফিরেছে?
-ফিরেছে।
-ও এখন কোথায়?
-ময়নার বিছানায় শুয়ে আছে।
-কী বললা! তুমি ওকে ময়নার বিছানায় শুয়ে রেখেছ?
-সমস্যা কী? চিনি না জানি না একটা অপরিচিত মেয়েকে নিশ্চয়ই আমার বেডে শোয়াবো না ।
-শোনো, ওই মেয়ে অপরিচিত কেউ না। ও এ বাড়ির মেয়ে।
-এই বাড়ির মেয়ে মানে?
-এই বাড়ির মেয়ে মানে এ বাড়ির মেয়ে। ও আমার মেয়ে।
-কী বললা, ও তোমার মেয়ে? তার মানে তোমার আরেকটা বউ আছে? তুমি এত বছর আমার চোখে ধুলা দিয়ে দুই সংসার করছ? হে আল্লাহ, এ আমি কী শুনলাম? ও রাহুল, তুই কইরে বাপ। আয়, তোর বাপের চরিত্র দেখে যা। বলো আমার সতিন কে? আমিও দেখতে চাই তুমি কার জন্য আমার সুখের সংসারে আগুন লাগিয়েছ।

default-image

বলেই কান্না শুরু করে দিলেন। সালাম সাহেব অবাক হয়ে তার স্ত্রীর কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলেন। এ বোকা মহিলাটা এত বছর সংসার করেও নিজের স্বামীকে চিনতে পারল না। সালাম সাহেব মনে মনে আফসোস বলে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লেন।
নিতু এখন ময়নার বিছানায় কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছে। শরীরটা যদিও এখনো কাঁপছে, তবুও কেন জানি ওর মনের মাঝে একটা অন্য রকম আনন্দ বয়ে যাচ্ছে। কারণ, শেষ পর্যন্ত সে নিজের ঘরে ঢুকতে পেরেছে। স্পষ্ট করে কথা বুঝতে না পারলেও নিতু বুঝতে পারছে পাশের ঘরে রাহুলের মা–বাবা ঝগড়া করছে। ঠিক সে মুহূর্তে ময়না ঝড়ের বেগে রুমে ঢুকল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-আফা, খালা-খালু আপনেরে নিয়ে ঝগড়া করতেছে।
-কেন?
-খালুর বলে আরেকটা বউ আছে। আর আপনে হইলেন হেই ঘরের মাইয়া?
-তোমাকে কে বলল?
-খালা খালুরে জিগাইছে আপনি কেডা। খালু কইছে এটা আমার মাইয়া। এইটা হুইনা খালায় কানতাছে। আফা, হাছাই খালু আমনের বাপ? খালুর কি তাইলে আরেকটা বউ আছে?
নিতু কী উত্তর দেবে খুঁজে পেল না। ও বুঝতে পারছে ওর বুক থেকে কান্নার স্রোত চোখের দিকে ধেয়ে আসছে। নিতু ঠিক করেছিল স্বামীর ঘরে কখনো চোখের জল ফেলবে না। কিন্তু এ মুহূর্তে ও কিছুতেই ওর চোখের জল আটকাতে পারছে না। ওর দুচোখে যেন অশ্রুর বন্যা নেমেছে। এই অশ্রু কষ্টের না, এ অশ্রু আনন্দের। রাহুল সব সময় বলত, ওর বাবা একজন কঠিন হৃদয়ের মানুষ। যে তাদের এ বিয়েকে কোনোভাবেই মেনে নেবে না। সেই মানুষ আজ তার মতো একটা এতিম মেয়েকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিচ্ছে। এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে।

default-image

ঘণ্টাখানেক পর শিউলি বেগম কিছু কাপড় আর গয়না নিয়ে ময়নার রুমে এলেন। ওর মধ্যে একটা লাল বেনারসিও আছে। শিউলি বেগমকে দেখে নিতু বিছানায় উঠে বসে। শিউলি বেগম বিছানায় বসে দুহাতে নিতুর মুখটা ধরে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কেন জানি শিউলি বেগমের দুচোখ ভিজে উঠল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি আদুরে গলায় বললেন,

-মাশাআল্লাহ! এত সুন্দর একটা মেয়ে আমার রাহুলের কপালে ছিল! শোনো মা, এটা আমার বিয়ের শাড়ি। এই শাড়ি আর গয়নাগুলো তাড়াতাড়ি পরে আসো। এগুলো পরে তুমি তোমার শ্বশুরকে সালাম করবে। তারপর আমরা একসঙ্গে খাব। তোমার শ্বশুর তোমার জন্য বিরিয়ানি এনেছেন।

কথাগুলো বলে শিউলি বেগম চোখ মুছতে মুছতে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।

নিতু খুব ছোটবেলায় তার মা–বাবাকে হারিয়েছে। তারপর থেকে নিতু তার মামার সংসারে মানুষ। মামির কটু কথা আর অভাবের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। পৃথিবীটা ওর কাছে ছিল শুধুই কষ্টের এক জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাহুলের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পরই পৃথিবীটাকে মনে হয়েছে আনন্দময়। ও কখনো ভাবেনি রাহুল ওর জীবনে শুধু ভালোবাসা না, ওর জন্য বাবা-মাও এনে দেবে। নিতু বুঝতে পারে ওর বুক থেকে কান্নার ঢেউ উঠে আসছে। ও এই ঢেউ থামানোর চেষ্টা করে না। কারণ ও এখন কাঁদবে, মন উজাড় করে কাঁদবে।

এখন মধ্যরাত। নিতু রাহুলের বিছানায় বসে আছে। সালাম সাহেব একটু আগে ময়নার রুম থেকে রাহুলের খাট এনে আবার রাহুলের রুমে ফিট করে দিয়েছেন। অবশ্য এ কারণে ময়নার মন কিছুটা খারাপ। নিতুর কেন জানি খুব গান গাইতে ইচ্ছা করছে। সে গুন গুন করে গান ধরে। ঠিক সেই মুহূর্তে রাহুলের ফোন এল। নিতু গান গাইতে গাইতেই ফোন রিসিভ করে এবং একইভাবে গান গাইতে থাকে। ফোনের ওপাশে রাহুল কোনো কথা না বলেই চুপচাপ নিতুর গান শুনতে থাকে। নিতু গান শেষ করে ফিসফিস করে বলে,
-কী স্বামী, গানটি কেমন লাগল?
-অসাধারণ। মনে হলো রুনা লায়লা ম্যাডামের গলায় গান শুনলাম। নিতু তুমি কোথায়? তুমি কি এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে আছ?
নিতু আবারও ফিসফিস করে বলে,
-তুমি ফিসফিস করে কথা বলছ না কেন? শোনো, এখন থেকে তুমি আমার সঙ্গে যখনই ফোনে কথা বলবে ফিসফিস করে বলবে।
রাহুল ফিসফিস করে উত্তর দেয়।
-ঠিক আছে। তা তুমি কোথায়? হিটলার কি তোমাকে বকা দিয়েছে?
-খবরদার আমার বাবাকে হিটলার বলবে না।
-তোমার বাবা মানে? শোনো, হিটলারকে আমি ভালো করেই চিনি। তুমি বাবা বলে যতই তেল মারো কাজ হবে না।
-শোনো, আমি কাউকে তেল মারি না। আর মা–বাবাকে তো প্রশ্নই আসে না। বাবা বলেছে আমি তার ছেলের বউ না, আমি তার মেয়ে।
-মানে কী! তার মানে আমরা ভাইবোন!
-ওই গাধা, আমরা ভাইবোন হব কেন? শোনো, আমি হলাম এ বাড়ির মেয়ে আর তুমি এ বাড়ির জামাই।

-হিটলার তোমাকে এটা বুঝিয়েছে? শোনো, ওই লোককে তুমি চেন না। খুবই ভয়ংকর একটা মানুষ। আমার ধারণা, এটা তার একটা কৌশল। ওর মনে কোনো কু মতলব নিশ্চয়ই আছে। আমার ধারণা, হিটলার তোমাকে ভুলিয়েভালিয়ে বিদেশে পাচার করে দেবে।
-মাই গড! রাহুল, তুমি কি সাধারণ কোনো চিন্তা করতে পারো না?
-নিতু, তুমি কিন্তু ভুল করছ।

-শোনো, তোমার এসব ফালতু কথা বন্ধ করো। এই, জানো, মা না আমাকে তার বিয়ের শাড়ি আর তার সব গয়না দিয়ে দিয়েছে। আর আমি ওগুলো পরে তোমার রুমে তোমার বিছানায় শুয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলছি। আর জানো, বাবা আমার জন্য হোটেল থেকে বিরিয়ানি এনেছিল। আমরা সবাই একসঙ্গে মজা করে খেয়েছি।
-বলো কী? তার মানে হিটলার আমাদের বিয়ে মেনে নিয়েছে? তাহলে আমি বাসায় চলে আসি?
-খবরদার না। বাবা বলেছেন তুমি চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত এ বাড়িতে আসতে পারবে না। আমার সঙ্গে দেখাও করতে পারবে না। তুমি এখন থেকে ধানমন্ডিতে তোমার মামার বাসায় থাকবে।
-অন্তত আজ রাতটা থাকি? আজ তো আমার বাসর রাত।
-সরি। আমি বাবাকে কথা দিয়েছি। তোমার চাকরির আগে তোমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখব না। এই, একটা গান শোনাবে? এখন কেন জানি তোমার সুর-তালবিহীন একটা গান শুনতে ইচ্ছা করছে।

default-image

রাহুলের গানের গলা খুবই যাচ্ছে তাই। সুর-তালের বালাই নেই। তারপরও এই গানই কেন জানি নিতুর খুব পছন্দ। রাহুল ফিসফিস করে বেসুরো গলায় গান ধরে,
‘মনের এই ছোট্ট ঘরে আগুন লেগেছে হায়রে, পানিতে নেভে না যে কী করি উপায়। বেঁচে থাকা হলো দায় সজনি গো বেঁচে থাকা হলো দায়...।’

নিতু মনে মনে ভাবে, এই পাগলটা কী এসব উদ্ভট গান ছাড়া আর কোনো গান জানে না। একবার ভেবেছিল বকা দেবে। পরক্ষণে ভাবল না থাক। বউ কাছে না থাকলেও তো আজ বেচারার বাসর রাত। আজ না হয় বেচারা একটু পাগলামি করুক। নতুন বউয়ের কাছ থেকে এতটুকু ছাড় তো সে পেতেই পারে, তা–ই না? (সমাপ্ত)

*[email protected]

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন