default-image

বৃহস্পতিবার রাত এলেই মনের মধ্যে একধরনের ভালো লাগা কাজ করতে শুরু করে। মনে মনে ছোটবেলার ছড়াটা আওড়াই।
‘আইজ হাফ
কাইল মাফ
পরশু দিন বাপরে বাপ’

এই ছড়াটার মানে হলো আমাদের শৈশবে বৃহস্পতিবার টিফিনের সময় স্কুল ছুটি দিয়ে দিত, শুক্রবার ছুটি থাকত আর শনিবার আবার পুরোদমে স্কুল শুরু হতো। গ্রামের ভাষায় আমরা বৃহস্পতিবারকে বলতাম ‘বিষ্যুদবার’ আর শুক্রবারকে বলতাম ‘শুক্কুরবার’। শুক্কুবারের আরও একটা মজার বিষয় ছিল। সেটা হলো কেউ যদি কোনো কাজ করতে না চাইত কিন্তু তাকে সেই কাজ করার জন্য চাপাচাপি করলে বলত লাল শুক্কুরবারে করব। এমন বলার কারণ হয়তো বা সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়াতে পঞ্জিকায় শুক্কুরবার থাকত লাল কালিতে ছাপা। আর ছুটির দিন বলেই সেদিন আর সেই কাজটা করতে হবে না বা করা লাগবে না।

মাসের শেষ সপ্তাহে কাজের চাপ সব সময়ই বেড়ে যায়। নিশ্বাস নেওয়ার সময় থাকে না। উপরন্তু, দুদিন ছিল সাইটে কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন শেষে অফিস করার চাপ। সব মিলিয়ে আবার অবস্থা একেবারে ‘চিড়ে চ্যাপ্টা’। অস্ট্রেলিয়াতে করোনার টিকা চলে এসেছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি অনুযায়ী সমগ্র জনগোষ্ঠীকে কয়েকটা স্লাবে ভাগ করে সেই টিকা দেওয়া শুরুও হয়ে গেছে। কিন্তু তবুও সিডনি ও আশপাশ এলাকায় এখন পর্যন্ত জনপরিবহনে ‘মাস্ক’ বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। আমি যেহেতু ট্রেন এবং বাসে করে অফিসে যাওয়া–আসা করি, তাই সকালবেলা দুই ঘণ্টা এবং বিকেলে দুই ঘণ্টা মাস্ক পরে থাকতে হয়। এত দিন ধরে মাস্ক পরার পরও এখনো মাস্কে অভ্যস্ত হতে পারিনি। মাস্ক পরার মুহূর্তে কেমন জানি হাঁসফাঁস লাগে। আর খোলার সময় মনে হয় শরীরে প্রাণ ফিরে পাই।

বিজ্ঞাপন
default-image

যাহোক, আজও ছিল বিষ্যুদবার, কিন্তু অফিসের এবং সাইটের কাজ মিলিয়ে মগজের মধ্যে বেশ কিছু বিষয় জট পাকিয়ে ভয়ংকর মাথাব্যথা শুরু হয়েছিল। আমার দুর্বল মগজ তীব্র কোনো অনুভূতিই ঠিকঠাক হ্যান্ডেল করতে পারে না, হোক সেটা তীব্র, সুখ কিংবা দুঃখ কিংবা রাগ। আর এই অবস্থাটা বেশ কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়। এমন হওয়ার আরও একটা কারণ আছে মনে হয়। অকারণে–অসময়ে রাত জাগার স্বভাবটা এখনো যায়নি, কিন্তু বয়স তো আর থেমে নেই, তাই শরীর মাঝেমধ্যে বিগড়ে গিয়ে জানান দেয়।

দুটো প্যারাসিটামল, ভরপেট খাওয়া তারপর কপালে এবং মুখে টাইগার বামের জ্বলুনি নিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। টাইগার বাম দেওয়ার সময় গিন্নি ইচ্ছে করেই জোরে জোরে ডলা দিচ্ছিল আর বলছিল, এখন বুঝবে কেমন ব্যথা লাগে। কারণ, তাঁর মাথাব্যথার সময় আমি তাঁর কপালে টাইগার বাম লাগিয়ে দেওয়ার সময় নাকি জোরে ডলা দিই। আমি বললাম, শোন, পাহাড়ের দিকে কষ্ট করে তুমি হয়তো ঢেলা ছুড়ছ, কিন্তু এতে তার শুধু কাতুকুতুই লাগে অন্য কিছু হয় না। যাহোক, একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

ঘুম ভাঙল মাঝরাতের কিছু পরে। উঠে সিংক থেকে পানি খেয়ে বাসার সামনে গিয়ে চাঁদমামাকে খুঁজে না পেয়ে পেছনে এলাম। দেখি চাঁদমামা গাছগুলোর ওপর দিয়ে উঁকি মেরে মিটিমিটি হাসছে। বাইরে একটা সুন্দর পরিবেশ। বাতাস নেই কিন্তু তাপমাত্রাটা সহনীয়। গাটা জুড়িয়ে আসছে। আমি বাসার পেছনের বারান্দায় রাখা টি টেবিলের দুটো চেয়ারের একটাতে বসলাম চাঁদের দিকে মুখ করে। বাসার পেছনের বারান্দার রেলিংয়ে বাংলাদেশের কুঞ্জলতার মতো একটা ফুল জড়াজড়ি করে একটা সবুজ বেড়ার আকার নিয়েছে। আর ওপর থেকে ঝুলছে অনেকগুলো নাম না জানা গাছ। কিছু দূরেই পেছনের বেড়া ঘেঁষে গিন্নি লাগিয়েছে গাঁদা, সন্ধ্যামালতীসহ অনেক রকমের ফুল। আর আছে একটা হাসনাহেনার ঝাড়। সেখানে ইতিমধ্যেই দুবার ফুল এসেছিল। তখন রাতের বেলা বাসার পেছনে এলেই হাসনাহেনা ফুলের ম–ম গন্ধে মনটা মাতাল হয়ে যেত। গাছটা একটু কোনার দিকে লাগানোতে আমাদের বাসার ভেতরে গন্ধ তেমন একটা আসে না, কিন্তু আমাদের পেছনের বাসার দিকে যায়।

সেই দিন মিশু ভাই বলছিল ইয়াকুব ভাই, হাসনাহেনার গন্ধ তো খুবই চমৎকার। ওনারা কিছুদিন আগে আমাদের পেছনের বাসায় এসেছেন। আগে ছিল কেইনদের বাসা। আমি আর কেইন দুজন পেছনের বেড়ার দুপাশে চেয়ারে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতাম প্রায়ই। আর এখন আড্ডা দিই মিশু ভাইয়ের সঙ্গে। আর সঙ্গে বিনিময় হয় তরিতরকারি। তার জন্য আমাদের ঘুরে রাস্তা দিয়ে ওনাদের বাসায় যাওয়া লাগে না। বরং আমি বা মিশু ভাই একে অপরকে ডেকে নিয়ে দুজন দুপাশে দাঁড়িয়ে গল্প শুরু করে দিই। ওনাদের মেয়ে ইনায়রা এসে বলে আমাদের বাসা দেখবে তখন মিশু ভাই ওকে তুলে বেড়ার ওপর বসিয়ে দেন। আমি আমাদের গাছ থেকে ফুল তুলে ওর দুই কানে গুঁজে দিই। ইনায়রা খুবই খুশি হয়। বাচ্চাদের খুশি হওয়ার ক্ষমতা অসম্ভব রকমের বেশি। আমি যখন বলি, তুমি আমাদের বাসায় চলে আসো, তাহলে আরও ফুল দেব, তখন আর রাজি হয় না।

মিশু ভাইদের বেড়ার মধ্যে একটা তালসদৃশ গাছ আছে, সেটাকে আমরা অবশ্যই তালগাছই বলি। চাঁদমামা ধীরে ধীরে তালগাছটার পাশ দিয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। বারান্দার কাঠের দেয়াল ঘড়ি টিকটিকির মতো টিকটিক করে সময় জানিয়ে যাচ্ছে। দূরে কোথাও একটা ঝিঁঝি পোকা ডেকে যাচ্ছে, তবে তেমন তীব্র স্বরে না। মিশু ভাইদের আর আমাদের কোনাকুনি বাসাটার উঁচু গাছগুলোতে বাঁদুড়ের পাখা ঝাপটানোর শব্দ পেলাম। দূরে ট্রেন লাইন দিয়ে মনে হয় রাতের শেষ ট্রেন চলে গেল একটু আগে। ইতিমধ্যেই মেয়েটা এসে দেখে গেল আমি কোথায়? নাড়ির টান বোধ হয় একেই বলে। চাঁদমামা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে। সময়ের হিসাবে মাঝরাতে পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়া উচিত, কারণ শুক্কুরবার আমার জন্য অনেক বড় দিন। শুক্কুরবার বিকেল থেকেই শুরু হয়ে যায় সপ্তাহান্তের ব্যস্ততা। এই সময় বারান্দায় বসে মাথার মধ্যে একগাদা স্মৃতি এসে ভিড় করছে।

সেদিন ১১ বছরের মেয়েটা জিজ্ঞেস করছিল, বাবা, তোমার সব ফেসবুক স্ট্যাটাসে কেন ‘ফিলিং ব্লেসড’ দাও? আমি বললাম, মা রে, শুধু এই বেঁচে থাকাটাই সত্যি, বাকি সব মিথ্যা। আমি তুমি আগে ছিলাম না। দুদিনের অতিথি হয়ে এই পৃথিবীতে এসেছি। আবার চলেও যাব একদিন। কিন্তু এই পৃথিবীর জল–হাওয়া কিন্তু আগের মতোই থাকবে। তাই আমাকে–তোমাকে চেষ্টা করতে হবে এর থেকে যতটুকু পারা যায় উপভোগ করতে হবে। তাহলেই জীবন সার্থকতা পাবে। মেয়ে কী বুঝল, জানি না। জ্ঞানীর মতো মাথা নেড়ে সায় দিল। এসব কথা ছয় বছরের ছেলেটাকে বললে আরও বেশি সমঝদারের মতো আরও জোরে জোরে মাথা নাড়ে। আমি জানি, আমি কখন এমনভাবে মাথা নাড়তাম, যখন আমি কিছুই বুঝতাম না, কিন্তু জানতাম সম্মতি জানাতে হবে।

আজ এই মাঝরাতের নির্জনতায় বসে আমিও মনে মনে ভাবছি আসলেই তো আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী? কোনো একজন কি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমাদের এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, নাকি যুগ যুগ ধরেই মানবজাতি এভাবে পৃথিবীতে আসছে এবং বিলীনও হয়ে যাচ্ছে। এই যে আমার ক্ষণিকের অতিথি সেটাও তো একেবারে সহজ কিছু নয়। সেখানে আছে ক্ষুধা, দারিদ্র্যের মতো সব ব্যাপার। এগুলোকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হয়। কোনো মানুষের জীবনেই নিরবচ্ছিন্ন সুখ নেই।

বিজ্ঞাপন
default-image

একেকজনের অসুখের কারণ একেক রকম। নাকি এই নিরবচ্ছিন্ন সুখের অনুসন্ধান করে বেড়ানোই জীবনের লক্ষ্য। নাকি অন্যকে সুখী করে তার মধ্যে সুখ খুঁজে বেড়ানোতেই আমাদের সুখ। ঠিক যেমন আমাদের বাগানের ফুলগুলো তাদের সৌন্দর্য এবং গন্ধ দিয়ে আমাদের আনন্দিত করে আবার ঝরে পরে। এমন হাজারো ভাবনা আমাকে এই মাঝরাতে জাগিয়ে রেখেছে।

যাহোক, সময় গড়িয়ে যাচ্ছে রেলগাড়ির চাকার মতো। মিশু ভাইদের বাসার সামনের গাছটাতে পাখিগুলোর মধ্যে একটা কিচিরমিচির শুনলাম। হয়তো বা তাঁদেরও কোনো সদস্যদের হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেছে। সেও হয়তো বা দলছুট হয়ে জীবনের মানে খুঁজে বেড়াচ্ছে মনে মনে। এগুলো ভাবতে ভাবতেই বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল আর আমি মনে মনে বললাম—

‘আহা জীবন! আহারে জীবন।’
*লেখক: মো. ইয়াকুব আলী, মিন্টো, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন