বেকার মা, কর্মজীবী মা ও মায়েদের গ্লানি

বিজ্ঞাপন
default-image

মেয়েদের বিভিন্ন আড্ডা ও ফেসবুক পোস্টে, বিভিন্নভাবে উঠে আসে মায়েদের বিভিন্ন ধরনের গ্লানিময় আত্মকথন বা আত্মসমালোচনা। কখনো হতাশা। সেই মা বেকারই হোক, কর্মজীবীই হোক, সদ্য হওয়া মা বা বহুদিনের পুরোনো মা। একেকজনের একেক ধরনের গ্লানি বা হতাশা।

কিছুদিন আগে একজনের লেখায় পড়লাম, ছোট বাচ্চার যত্ন নিতে নিতে মাঝে মাঝে নিজের জন্য অখণ্ড একটুকরো অবসর পেতে তার খুব মন চায়। নিজের জন্য বেহিসাবি, চিন্তাহীন, দায়িত্বহীন, ইচ্ছেমতো ও স্বাধীন কয়েক ঘণ্টা কাটাতে মন আনচান করে। কিন্তু এই ইচ্ছার জন্য তিনি মনের সংগোপনে একটু দ্বিধান্বিত ও লজ্জিত। তিনিই কি একমাত্র মা, যার এমন ইচ্ছা হয়?

যুগ যুগ ধরে মায়েদের যে স্বার্থহীন, দেবী পর্যায়ের ছবি আঁকা হয়েছে, সেই ছবির সঙ্গে এ ধরনের ইচ্ছা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর সেই মনে মনে গড়ে দেওয়া মা মূর্তির মতো মহান হতে না পারলেই আমরা মায়েরা মনে মনে লজ্জিত হই। শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর সব জায়গার মায়েরাই অনেকটা এমনই ভাবে। তবে আমাদের তুলনায় উন্নত দেশের মায়েরা প্রকৃত শিক্ষায় বেশি শিক্ষিত ও বাস্তববাদী।

কিন্তু সত্য ঘটনা হলো, একজন মা, মা হওয়ার অনেক আগে থেকেই একজন মানুষ। মা হওয়ার পরও তাঁর প্রথম পরিচয় তিনি মানুষ। সুতরাং মানুষের যে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা, চাহিদা, এগুলো তাঁর থাকবেই। সন্তান লালনপালন একটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও অনেকটা একঘেয়ে কাজ। শারীরিক ও মানসিক শ্রমসাধ্য। সেই কাজ থেকে মায়েদের কোনো ছুটি নেই। বিশেষ করে নতুন মায়েদের। এই কাজে ক্লান্তি আসা খুব স্বাভাবিক। মায়েরা ভালোবাসা দিয়ে সেই ক্লান্তি ভুলে থাকতে চান।

তবে এটা আসলে স্বাস্থ্যকর না পারিবারিক সম্পর্কের জন্য। মায়েদের সন্তানের প্রতি দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতে হলেও তাঁদের একটু নিজস্ব সময়ের দরকার আছে। আমাদের মায়েদের যুগের মায়েরাও কিন্তু বছরে একবার বাপের বাড়ি যেতেন। যখন তিনি আর মা থাকতেন না, হয়ে যেতেন সেই বাড়ির আদরের মেয়ে। সন্তানের দায়িত্ব নিতেন নানি বা খালা–মামিরা। একান্ত নিজের স্বাধীন কিছু সময় আপন ভুবনে কাটিয়ে তাঁরা ফিরে আসতেন রিচার্জ হয়ে বছরের বাকি অংশের দায়িত্ব পালনের জন্য। সুতরাং এটা মায়েদের দরকার, এতে কোনো গ্লানি নেই। এটা মা, সন্তান, সন্তানের বাবা সবার জন্যই মঙ্গলজনক। একজন ক্লান্ত, বিরক্ত, খিটখিটে মা কখনোই সন্তানের যত্ন ভালোভাবে নিতে পারবেন না।

কর্মজীবী মায়েদের মন হলো গ্লানির এক সিন্দুক। যেহেতু বহুযুগের প্রথিত ধারণা হলো, সন্তান পালনের দায়িত্ব মায়ের একার। সন্তান খারাপ করলে সেই দায়ভারও মায়ের। এই ধারণা থেকে চেষ্টা করলেও আমরা বের হয়ে আসতে পারি না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার এটা হলো, সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। মা চাকরি করলে সন্তানের যত্ন হবে না ঠিকমতো। অজস্র চাকরিজীবী মাকে দুঃখ করতে শুনেছি, সন্তানের ঠিকমতো যত্ন হয় না কাজের মানুষের কাছে বা ডে কেয়ারে। খায় না ঠিকমতো। স্বাস্থ্য ভালো না। অসুস্থ হয় প্রায়ই। ভালো আচার–আচরণ শিখছে না। তাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় লাগে।

এই লিস্ট বিশাল লম্বা। এ কারণে প্রায়ই তাদের মনে হয় চাকরি ছেড়ে দেওয়া দরকার। ছেড়ে দিলে সন্তানের যত্ন হতো ঠিকভাবে। তাদের কথা যে পুরোপুরি ভুল তা নয়। তবে কথা হলো, সন্তান লালনপালনের দায়িত্ব কিন্তু বাবারও। কয়টা বাবাকে এই গ্লানিতে ভুগতে দেখা যায়? কর্মজীবী মায়ের গ্লানি কেন ঢাকা পড়ে না এই আত্মতৃপ্তিতে যে, সংসারের রুটি রুজিতে আমার ভূমিকা আছে। আমার আয় আছে বলেই ছেলেমেয়ের আবদার মিটছে। ভালো এলাকায় থাকছি। পুষ্টিকর খাওয়া পাচ্ছ। লাইফ ইজ অল অ্যাবাউট ব্যালান্স। কিছু পেলে কিছু ছাড়তে হয়। একজন বিধবা মা বা ডিভোর্সি মায়ের একার উপার্জনে যদি তাঁর সংসার চলে, তাঁর জন্য কিন্তু এই গ্লানি একধরনের বিলাসিতা, যার কোনো সুযোগ তাঁর নেই। তাঁর বরং গর্বিত হওয়া উচিত যে, তাঁর আয়ে সংসার চলে।

বাচ্চা লালনপালনের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই। একেক বাচ্চার, এককে পরিবারের পরিস্থিতি আলাদা। আপনার সন্তানকে যদি ঘণ্টা ধরে টেবিলে বসিয়ে পড়াতে না হয়, সে নিজের উৎসাহে পড়ে। তাহলে বাচ্চাকে পড়াই না, আমি কেমন মা ভেবে, হা–হুতাশের কোনো দরকার নেই। বাচ্চাকে কেন ছোটবেলায় বেশি শাসন করেছি, মেরেছি, বকেছি এটা নিয়ে যেমন গ্লানি দেখেছি, কেন একদম শাসন করিনি, সেটা নিয়ে মায়েদের গ্লানি দেখেছি। কোনো মেয়েই তো মা হয়ে জন্মায় না। সন্তানের জন্ম দানের সঙ্গে সঙ্গে একটি মায়েরও মা হিসেবে নব জন্ম হয়। বাচ্চা বড় করতে গিয়ে ভুল করতে করতেই সে শেখে। যেটা পরবর্তী সন্তানের সময় শুধরে নেয়। সুতরাং, এই ভুলেও কোনো গ্লানি নেই।

সদ্য চোখে পড়ল বেকার মার হতাশা নিয়ে একটি লেখা। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেখানে সবাই সবার সব ব্যাপারে নাক গলায় আর অন্যকে আহত করে আনন্দ পায়, একমাত্র সেখানেই এ ধরনের হতাশা তৈরি হতে পারে। বাচ্চাদের ক্রিটিক্যাল বয়সে বা দরকারে হাসিমুখে চাকরি ছেড়ে বেকার মা হতে দেখেছি অনেক সাদা বা কালো মাকে। এটা সম্পূর্ণ নিজস্ব পছন্দ। যার জন্য যেটা ভালো, পারিবারিক কাঠামো, সন্তানের চাহিদার ওপরে অনেকটাই নির্ভরশীল।

চাকরি কিন্তু স্ট্যাটাসের জন্য দরকার না। এমনকি অনেক সময় অর্থের জন্যও না। তবে অবশ্যই নিরাপত্তার জন্য দরকার। আজ আপনার স্বামী অঢেল অর্থ উপার্জন করেন। কাল যেকোনো দুর্ঘটনায় তাঁর আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিনি অসুস্থ হতে পারেন, সড়ক দুর্ঘটনা হতে পারে, মারা যেতে পারেন। আপনার ডিভোর্স হতে পারে। আমরা কেউ জানি না কাল কী হবে। সে ক্ষেত্রে আপনার আর আপনার সন্তানের দায়িত্ব নেবে কে? তাঁর অগাধ সম্পত্তি থাকলেও আপনার নিজের যদি কিছু না থাকে, ডিভোর্স হলে আপনি পথের ফকির।

ভাবছেন, আমাদের এত শক্ত বাঁধন, ডিভোর্স অসম্ভব। আপনি জানেন না। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে ‘নেভার সে নেভার’, অর্থাৎ ‘কখনোই বলো না কখনোই এটা হবে না বা করব না।’ এ কারণেই ছেলেমেয়ে সবার চাকরির প্রয়োজন। বাচ্চার যত্নের অবহেলা হবে? হতেও পারে। আবার নাও হতে পারে। অনেকটাই নির্ভর করছে আপনাদের দুজনের ওপরে। চাকরি করে সন্তানের সঠিক লালনপালন কি কঠিন? অবশ্যই, অনেক কঠিন। অসম্ভব? না, অসম্ভব না। আপনি যদি জীবনের শুরুতে এই সত্যটাকে বিশ্বাস করেন, চাকরিকে সংসার, সন্তানের পাশাপাশি আপনার প্রায়োরিটি লিস্টে রাখেন, বিশ্বাস করেন এই চাকরিটা আপনার ও আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য, তাহলে দেখবেন গ্লানিহীন ভাবে সবই করছেন। চাকরিও, সন্তানের লালন পালনও। তবে বিশেষ কারণে যদি চাকরি না করার সিদ্ধান্ত নেন, সেটা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগবেন না। তবে হ্যাঁ, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দিকটা ভুলে যাবেন না যেন।

হ্যাপি মাদারহুড। জগতের সব মাকে প্রাণঢালা শ্রদ্ধা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন