বেড়ানো: আল্পবাখের বাঁকে ২

বিজ্ঞাপন
default-image

কংগ্রেস সেন্টার আল্পবাখের সামনে গিজগিজে ভিড়। অধ্যাপক, পোস্টডক, পিএইচডি ছাত্ররা মিলে মোরব্বা অবস্থা। ভারী জ্যাকেট-টুপি-মাফলার, যে যা পেরেছে জড়িয়ে–পেঁচিয়ে এস্কিমো সেজে এসেছে। সেই এস্কিমোদের ভিড়ে আলাদা করে কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সে চেষ্টা না করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তোড়জোড় দেখছি। প্রায় মশাল সাইজের কতগুলো মোমবাতি হাতে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে কয়েকজন। একটু পরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে এগুলোই পথের দিশা। একটা মোমবাতি সাধলে বিনয়ের সঙ্গে মাথা নেড়ে পাশে দাঁড়ানো অধ্যাপক ক্লাউসের হাতে গুঁজে দিলাম। বুড়ো অধ্যাপক শিশুর মতো খুশি হয়ে আগুন জ্বালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। নইলে আমার হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি মানেই বেখায়ালে নিজের জ্যাকেট জ্বালিয়ে দিয়ে সেই আগুন আরও দু–চারজনের গায়ে ছড়িয়ে বিতিকিচ্ছি একটা কাণ্ড বাধিয়ে দেওয়া। হাজারো ভীতি আর ফোবিয়া নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আমার এই আরেক আগুনভীতি।

রওনা দেব দেব, এমন সময় ঘড়ির কাঁটার উপমহাদেশীয় কেতা মেনে একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে হাজির দীপ্তি আর মণিকা। ভুরু না কুঁচকে বরং মুচকি হাসলাম হাত নেড়ে। সঙ্গে কোত্থেকে একটা চাইনিজ মেয়েও জুটে গেল। তাঁর নাম পিং মিং। এই চৈনিক নাম মুখে মুখে ঘুরে পাঁচ মিনিটের মাথায় গিয়ে পিং পং, ১০ মিনিটের মাথায় পিং পিং আর ১৫ মিনিটের মাথায় আশ্চর্য রকমভাবে শুধরে সেই পিং মিংয়েই ফিরে এল।

বিরক্তি ধরিয়ে দেওয়া রকমের ধীরগতিতে চলছে আমাদের চারজনের দলটা। কাছেই মোমের মশাল নিয়ে পাঁচ নম্বর একজন পাশে হাঁটছিলেন। শামুকগতির সঙ্গে আর না পেরে মশালটা পিং মিংয়ের হাতে ধরিয়ে বেচারা দুড়দাড় পা চালিয়ে উধাও হয়ে গেলেন। পথটা এখনো ঘোর অন্ধকার হয়ে সারেনি। দুই পাশে বাড়িগুলোর উঠানে ঝোপে জড়ানো মরিচবাতি টিমটিমে আলো দিয়ে যাচ্ছে। তুষারের ভারে নুয়ে পড়া ক্রিসমাস ট্রিগুলোর পাশে স্নোম্যানও বানানো হয়েছে। বোতাম–চোখ, গাজর–নাক আর উল্টো–বালতি মাথায় স্নোম্যান ঠায় দাঁড়িয়ে নির্বিকার। বেচারা স্নোম্যানের শান্তি নষ্ট করে নয়াদিল্লির নয়া জমানার মেয়ে দীপ্তি পটাপট কিছু সেলফি তুলে নিল।

৫.
বাড়িগুলো যেন হঠাৎ ফুরিয়ে গেল। আশপাশের ছোট দলগুলোও দূরে সরে গেছে। রাস্তাটাও দেখি বেমক্কা খাড়া হয়ে যাচ্ছে। ঢিমেতালের ওয়াকিং এখন বাধ্য হয়ে হাইকিংয়ের চেহারা নিয়েছে। আর আরেকটু পর দেখা গেল রাস্তাই ফুরিয়ে গেছে। বাঁকানো বাঁকটা দেখতে না পেয়ে খাদ বরাবর এগিয়ে গিয়েছিলাম একটু হলেই। ভুল করে ভীষণ খাড়া ঢালে পা দিয়ে ফেললে আর দেখতে হতো না। চীন, ভারত আর বাংলাদেশের বেভুল মেয়েগুলো হুড়মুড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে এই সুনসান রাতে ত্রিদেশীয় অ্যাভালেঞ্চ বইয়ে দিতাম। যাহোক, নেভিগেশন ব্যাপারটা যে মেয়েদের ঠিক আসে না, সেটা স্বীকার করে নিয়ে ঠিক পথে নেমে এলাম। ফিরতি পথে কোনো এক ছেলেকে ভুলিয়েভালিয়ে দলে টেনে নেব, এই ফিচেল ফন্দিও আঁটা হলো একজোট হয়ে।

ধাক্কাটা সামলে নিঃশব্দে সাবধানে হাঁটছি। একটু আগের ছেড়ে আসা হোটেল, দোকানপাট সব পাহাড়ের পায়ের কাছে মিটমিটিয়ে জ্বলছে জোনাকি পোকার মতো। বেয়ে বেয়ে কতখানি উঠে গেলে প্রমাণ আকারের ঘরবাড়ি বিন্দু হয়ে যায়!

বেঙ্গালুরুর মেয়ে মণিকা আর পারছে না। স্যুপ দিয়ে রুটি খাওয়ার জন্য এতটা পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ের ডগায় হাইকিং করে যাওয়াটা তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। বেচারা পিএইচডি করতে এসেছে সবে তিন মাস। ইউরোপীয় মৌজ-মাস্তির ধারা বুঝতে তার আরও সময় লাগবে। বরফের দেশের মানুষগুলোর আসল আনন্দই হচ্ছে শীতের ভেতর ঘেমেনেয়ে পাহাড় বাওয়া আর তুষারের ভেতর গড়াগড়ি খাওয়া।

দলে থাকার একটা সুবিধা আছে। এ ওকে ঠেলে নিয়ে বিরতিহীন এগোতেই থাকে। তাই হাঁপিয়ে–হেদিয়ে জিব বেরিয়ে গেলেও ঠিকঠাক পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।

default-image

৬.
রেস্তোরাঁর সামনে কাঠ জ্বালানো হয়েছে। সবাই গোল হয়ে ওম নিতে ব্যস্ত। হাতে হাতে গ্লুভাইন। রেড ওয়াইনের সঙ্গে আর কী সব মিশিয়ে ক্রিসমাসের আগে-পরের সময়টায় খুব চলে এই পানীয়। আমাদের যেমন শীতে খেজুরের রস একটা বিলাসের জিনিস, এদেরও তেমনি আয়েশের বস্তু এই গ্লুভাইনের শরাব। গ্লুভাইনের নন-অ্যালকোহলিক ছোট এক ভাই আছে, নাম যার ‘পুঞ্চ’ বা ইংরেজি উচ্চারণে ‘পাঞ্চ’। আজকের আয়োজনে সেই ছোট ভাইকে খুঁজে পাওয়া গেল না। তার মানে ডিনারেও একপেশে মেন্যু রাখা হয়েছে। তিন পদের মাংস থাকবে, কিন্তু মাছ-সবজির বালাই নেই। হতাশ হয়ে এক মুঠ বরফ মুখে পুরে কচ কচ চিবোতে থাকলাম। মনে মনে বেশুমার গজ গজও চলছে।

‘এই মেয়ে, কম আলোতে খামচে খামচে বরফ গিলছ কেন?’ অপ্রস্তুত মুখ তুলে দেখি প্রশ্নটা করে ফিক ফিক করে হাসছে আরবি চেহারার এক তরুণ। ছেলেটা নিজের থেকেই বলল, ‘আমি আদির। অমুক ল্যাবে তমুক টপিক নিয়ে কাজ করছি।’ ডান গালে টোপলা মেরে থাকা বরফের গোলাটা জিবে ঠেলে গলা দিয়ে নামিয়ে জবাব দিলাম, ‘হাই হাদি। কেমন আছো?’ ছেলেটা কেমন খঁচে গিয়ে বলল, ‘হাদি না, আমার নাম আদির। কানে তো দেখছি শোনোটোনো কম।’ একদম অচেনা এই উজবুক আমাকে প্রায় ধমক মেরে কথা বলছে দেখে হকচকিয়ে গেলাম। ‘সরি, এত লোকের ভিড়ে ঠিক শুনতে পাইনি।’ অহেতুক গ্যাঞ্জাম এড়াতে হার মেনে নেওয়া ভালো।

মূর্তিমান যন্ত্রণাকে এড়াতে মণিকাদের ভিড়ে ভিড়লাম। কিন্তু যন্ত্রণাটাও লাফিয়ে পিছু নিল। ‘আমি কোত্থেকে এসেছি বল তো?’ কী রে বাবা, কাউকে তো এমন গায়ে পড়ে কথা বলতে দেখিনি। দায় সেরে উত্তর দিলাম, ‘সিরিয়া?’ আদির নামের বদ ছেলেটা পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে জ্বালিয়ে মুখের ওপর ভক করে ধোঁয়া ফেলে কড়া মেজাজে জবাব দিল, ‘কী ভয়ংকর স্টেরিওটাইপ নিয়ে ঘুরে বেড়াও তুমি! চেহারায় আরব আরব ভাব দেখেই ফস করে বলে দিলে সিরিয়ান লোক?’ ঘাড় ঝাঁকিয়ে হাত উল্টে ‘কী জানি বাপু’ মুখ করে পালিয়ে যেতে নিলাম। ‘এই যে তুমি ইন্ডিয়ান মেয়ে, তোমাকে কেউ শ্রীলঙ্কান বললে কেমন লাগবে?’ এখন আমার খ্যাপার পালা। ‘কে বলল যে আমি ইন্ডিয়ান, অ্যাঁ?’ নিজের দেশের নাম শুনে দীপ্তি আর মণিকা দুপাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পিং মিংও আছে সঙ্গে। আদির একটুও ঘাবড়ে না গিয়ে বলল, ‘তাহলে তুমি কোনো দেশের? দেখলে কেমন ভুলে ভুলে কাটাকাটি হয়ে গেল? হা হা হা...।’ এত জোরে প্রাণখুলে হাসতে পারা লোকের ওপর আর খেপে থাকা গেল না। শীতের রাতে গল্প জমে গেল অল্পতেই। তবে আমাদের আপত্তির মুখে তাকে বিড়ি নিভিয়ে ফেলতে হলো। সেটা গুঁজে দেওয়া হলো কার যেন বানিয়ে রাখা একটা স্নোম্যানের মুখে।

বিচ্ছিরি রকমের বিস্বাদ খানাখাদ্য খেয়ে ঘণ্টাখানেক পর সেই চারজনের দলটাই আবার ফিরতি পথ ধরলাম। আদিরকে দলে টানার হালকা ইচ্ছে ছিল। তার টিকির দেখাও মিলল না দেখে নিজেরাই রাস্তা মাপলাম। মাধ্যাকর্ষণের টানে ফুটবলের মতো গড়িয়ে নামতে সময় লাগল না।

আজকের হাইকিং পরীক্ষায় উতরে গেলেও কাল হবে আসল খেল। কনফারেন্সের সকালের সেশন শেষ হলেই দুপুরে নিয়ে যাবে আরেক পাহাড়ে। পেশাদার গাইডসহ স্নো-শু হাইকিং। স্নো-শু ব্যাপারটা ধোঁয়াশার মতো লাগছে। আজকে একে–ওকে জিজ্ঞেস করে সদুত্তর মেলেনি। যাহোক, আজকে ভালো করে ঘুমিয়েটুমিয়ে সকালে একেবারে জলজ্যান্ত হয়ে উঠতে হবে। (বাকি অংশ পরবর্তী পর্বে)

ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: গবেষক. ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি, স্কুল অব মেডিসিন, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন