default-image

মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হলো অনেক। অবশ্য আমাদের মা-মেয়ের ঝগড়া নতুন কিছু নয়, প্রায় সবকিছু নিয়েই আমাদের ঝগড়া হয়। আমি কেন ভাত পুড়িয়ে ফেলি, আমি কেন ঘন ঘন স্যান্ডেল ছিঁড়ে ফেলি, আমি কেন মোবাইলে টাকা নষ্ট করি, আমার গায়ের রং কেন আমার বাবার মতো, আমি কেন মবিনের সঙ্গে মেলামেশা করি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমিও পাল্টা তর্ক করি। কোনো কারণে ঝগড়া বাধলেই মা আমাকে বাবার নাম তুলে খিস্তি করে, যেন বাবা আমার কত প্রিয় একজন মানুষ! বাবাকে গালমন্দ করলে আমার কিছুই যায় আসে না। তবে ঝগড়ার খাতিরে আমিও মাকে গালাগাল করি, মায়ের ছোট মেয়ে, আমার সৎবোন সুমির বাবাকে তুলে খিস্তি করি। সেসব গালাগাল কাগজে লিখতে নেই, এতটুকু অবশ্য আমি শিখেছি।

শুধু শুধু তো রাগ করিনি মায়ের সঙ্গে। কত দিন বলেছি, আমার স্কুলের দিনগুলোতে যেন কাজ থেকে বাসায় ফিরতে দেরি না করে। মা কাজ থেকে না ফেরা পর্যন্ত সুমিকে একা বাসায় রেখে আমি স্কুলে যেতে পারি না, সুমির বয়স মাত্র এক বছর। কিন্তু প্রায় দিনই মায়ের ফিরতে দেরি হয়। এর আগের দিন মাকে বলেছিলাম, এরপর তার দেরি হলে সুমিকে ঘরে একা রেখেই আমি স্কুলে চলে যাব, তবুও, আজও মা দেরি করে ফিরল। এরা যদি আমার লেখাপড়ার গুরুত্ব এতটুকুও বুঝত!

রাগে গটগট করতে করতে ঘর থেকে বের হলাম। আমাদের বস্তি থেকে এনজিওর স্কুল মাইল দেড়েক দূরে। কিন্তু রাস্তায় হাঁটার মতো পথ কি আছে? কদিন ধরে কোথাও সুয়ারেজের পাইপ ভেঙে আছে, ঘর থেকে বের হতেই রাস্তায় গোড়ালি সমান কালো পানি। ম্যানহোলের গর্ত থেকে বন্যার মতো ময়লা পানি বের হচ্ছে রাত–দিন। তাতে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। সবাই যে যার মতোই দিন পার করছে। রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপের মধ্যে খালি গায়ে খালি পায়ে বাচ্চারা লাঠি দিয়ে ময়লা সরিয়ে পলিথিনগুলো আলাদা করে বড় বস্তার মধ্যে জমা করছে রোজকার মতো। রাস্তার আরেক পাশে ভাঙা ইটের স্তূপের ওপর বসে মেয়েরা হাতুড়ি দিয়ে ইট ভাঙছে। রাস্তার মাঝখানে যেকোনো কিছুর সঙ্গে দড়ি বেঁধে তাতে কাপড় শুকাতে দিয়েছে কেউ। বস্তির টিনের চালগুলোর ওপরও কাঁথা–কম্বল রোদে দেওয়া হয়েছে যথারীতি। আমার হাঁটার পথে রোজকার মতোই বাজার বসেছে। কাঁচা মাছ, শাকসবজি।

দৌড়ে রেললাইন পার হতে গিয়ে আমার স্যান্ডেলটা আবার ছিঁড়ে গেল। ময়লা পানিতে পাজামাসহ পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভেজা, এ অবস্থায় ছেঁড়া স্যান্ডেল টেনে টেনেই দৌড়াতে লাগলাম, আজও ক্লাসে দেরি হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

রোজ রোজ ক্লাসে দেরি হওয়ার জন্য অজুহাত বানাতে ভালো লাগে না আর। আগে আমি স্কুল তেমন পছন্দ করতাম না। কিন্তু এ বছর আমাদের অষ্টম শ্রেণিতে একজন নতুন স্যার পড়াতে এসেছে, তার নাম কমল। কমল স্যার নিজেই ভার্সিটির ছাত্র, দেখে মনে হয় তার নিজেরই খুব অল্প বয়স। কিন্তু কখনো তার মেজাজ খারাপ হয় না, সব সময় হাসিখুশি চেহারা। হাসলে গালে টোল পড়ে। চুল একটু বড়। কথা বলতে বলতে মাঝেমধ্যে আঙুল দিয়ে চুলগুলোকে পেছনের দিকে সরিয়ে দেয়, তখন তাকে পুরোপুরি সিনেমার নায়কের মতো দেখায়। আর ঝকঝকে দাঁতের ফাঁক দিয়ে কথা বলে কী সুন্দর করে, সারা দিন তার কথা শুনেই পার করে দেওয়া যায়। যেকোনো পড়া সে খুব সুন্দর করে বোঝায়। পড়ার ফাঁকে মজার মজার গল্প করে। প্রথম দিনেই ক্লাসের সবাইকে দাঁড় করিয়ে নাম জিজ্ঞেস করল একে একে। সেদিনই আমাদের সবার নাম মুখস্থ করে ফেলেছে স্যার। অন্য শিক্ষকদের ক্লাসে শুধু স্যাররা পড়ায় আর আমরা চুপচাপ বসে শুনি। কমল স্যারের ক্লাসে তা না, পড়ানোর মাঝে মাঝে স্যার নাম ধরে সবাইকে ডাকে, বিভিন্ন প্রশ্ন করে, আর মনোযোগ দিয়ে আমাদের উত্তরগুলো শোনে। মাঝে মাঝে ক্লাসে আমাদের দিয়ে ‘প্রজেক্ট’ করায়। মনে হয় আমাদের পড়াতে, শেখাতে সে–ও খুব পছন্দ করে। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় স্যার আসলে কোনো নাটকে অভিনয় করছে আর আমরা সবাই সেই নাটকে অভিনয় করছি। খুব আনন্দের কোনো নাটক। তার ক্লাসে এক ঘণ্টা সময় কখন যে পার হয়ে যায় টের পাই না। মনে হয় সারা দিন না, স্যারের ক্লাসে বসে থেকে সারা জীবন পার করে দিতে পারব।

ক্লাসে পৌঁছাতে ১৫ মিনিটের মতো দেরি হলো। ঢোকার মুহূর্তে মনে পড়ল আজ বুধবার, কমল স্যারের ক্লাসে আজ হোমওয়ার্ক জমা দেওয়ার কথা। মায়ের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করে হোমওয়ার্কের কথাও ভুলে গিয়েছি।

বছরের শুরুতেই কমল স্যার আমাদের সবাইকে একটা করে কার্ডের প্যাকেট দিয়েছিল। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম ওগুলো বুঝি তাস খেলার প্যাকেট। পরে খুলে দেখি ওগুলো সাদা কার্ড, শুধু প্রতিটি কার্ডের ওপরে শিরোনামে লেখা ‘আজকের ভাবনা’। কার্ডের বাকি অংশ খালি। প্রথম ক্লাসেই স্যার বলে দিয়েছিল প্রতি বুধবার তার ক্লাসে আমাদের একটা করে কার্ড জমা দিতে হবে। কার্ডের ওপরে আমাদের নাম আর সেদিনের তারিখ থাকবে। তারপর কার্ডের বাকি অংশে আমাদের যার যার সেদিনের ভাবনার কথা লিখে জমা দিতে হবে। সেটা আমাদের নিজেদের কোনো ভাবনা কিংবা অনুভূতির কথা হতে পারে কিংবা কোনো দুশ্চিন্তা অথবা আনন্দের কথাও হতে পারে। কোনো কবিতার লাইনও হতে পারে। এটাই হোমওয়ার্ক। কেউ কারও কার্ড দেখতে পারবে না। পরের দিনের ক্লাসে স্যার কার্ডগুলোতে তার মন্তব্য লিখে আমাদের আবার ফেরত দেবে, তবে সবার সামনে সেগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা করা হবে না। তবে স্যারের কড়া নির্দেশ, যা কিছুই লিখি না কেন তাতে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু কার্ড ছাড়া বুধবারের ক্লাসে ঢোকা যাবে না।

প্রথম সপ্তাহে বুধবারের কার্ডে আমি কী লিখব খুঁজে না পেয়ে কোনো চিন্তাভাবনা না করেই ক্লাসে যাওয়ার পথে দরজির দোকানে শোনা একটা গানের লাইন লিখেছিলাম ‘পৃথিবী আমারে চায় রেখো না বেঁধে আমায়’। পরের দিন ক্লাসে কমল স্যার তার মন্তব্য লিখে আমার কার্ড ফেরত দিল ‘তুমি না চাইলে কারও সাধ্য নেই তোমাকে বেঁধে রাখার’।
স্যারের মন্তব্য দেখে একটু অবাক লেগেছে! তাহলে সত্যিই সে আমাদের সবার লেখা কার্ডগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়েছে?

তার পরের বুধবার একটু চিন্তা করে কার্ডে লিখলাম ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি–ঘোড়া চড়ে সে’। এই কথাটা গুলশানের নানা বলত, হঠাৎ করে নানার কথা মনে পড়াতে এটাই আমার কার্ডে লিখেছিলাম। পরের দিন স্যার আমার কার্ডে তার মন্তব্য লিখল ‘সোমা, তুমি কি গাড়ি–ঘোড়া চড়তে চাও?’ আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘অবশ্যই চাই, সে জন্যই তো স্কুলে লেখাপড়া শিখতে এসেছি।’

তার পরের বুধবার আমার সব ভাবনা ছিল কমল স্যারকে নিয়েই। ভাবছিলাম কোনো এক ঝড়ের দিনে, ক্লাসে আর কেউ নেই, শুধু স্যার আর আমি। স্যার আমাকে একা একা সব পড়া বোঝাল, সব প্রশ্ন শুধু আমাকেই করল আর আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিল অনেক সময় নিয়ে। ক্লাস ছুটির পর স্যার আমাকে তার গিটার বাজিয়ে গানও শোনাল। কী আনন্দের একটা ভাবনা! কিন্তু আমার সেই ভাবনার কথা তো আর কার্ডে লেখা যাবে না, তাই আবার নানার একটা কথাই লিখলাম ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’।

পরের দিন স্যার মন্তব্য করল ‘তুমি কি বিশ্বাস করো ভালো কর্মে ভালো ফল পাওয়া যায়? তাই যদি বিশ্বাস করো তাহলে তোমার কাছে ভালো কাজ করার গুরুত্ব কতটুকু?’
আমি একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। কমল স্যারের প্রশ্নগুলো আমার মাথা ঘুরিয়ে দেয়। ভালো কাজের গুরুত্ব কতটুকু? ভাবনার বিষয়! কমল স্যারের মতো নানাও মাঝে মাঝে এ রকম কঠিন প্রশ্ন করত। আমি উত্তর দিতে পারতাম না।

প্রথম সপ্তাহে বুধবারের কার্ডে আমি কী লিখব খুঁজে না পেয়ে কোনো চিন্তাভাবনা না করেই ক্লাসে যাওয়ার পথে দরজির দোকানে শোনা একটা গানের লাইন লিখেছিলাম ‘পৃথিবী আমারে চায় রেখো না বেঁধে আমায়’। পরের দিন ক্লাসে কমল স্যার তার মন্তব্য লিখে আমার কার্ড ফেরত দিল ‘তুমি না চাইলে কারও সাধ্য নেই তোমাকে বেঁধে রাখার’।
স্যারের মন্তব্য দেখে একটু অবাক লেগেছে! তাহলে সত্যিই সে আমাদের সবার লেখা কার্ডগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়েছে?

গুলশানের নানা মানে অবশ্য আমার মায়ের বাবা না। আমি ছোট থাকতে মা গুলশানের এক বাসায় কাজ করত, তাদেরই আমি নানা–নানি বলে ডাকি। আমি যখন খুব ছোট, তখন আমার বাবা আমাকেসহ মাকে আমাদের বস্তির বাসা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। আমাকে কোলে নিয়ে মা সারা দিন পথে পথে হেঁটে শেষে গুলশানে এক অচেনা বাড়ির গেটের সামনের ঢালু জায়গার ওপর বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সেই বাড়িটাই ছিল সেই নানার বাড়ি। বাইরে তখন ঝড়–বৃষ্টি। নানি তখন বাইরে থেকে ফিরছিল। গেটের সামনে অল্প বয়স্ক এক মাকে তার ছোট বাচ্চা নিয়ে ভিজতে দেখে তার মায়া হয়েছিল হয়তো, নানি তখনই আমাদের ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল। শুকনা কাপড় পরতে দিল, গরম ভাত খেতে দিল। তারপর তাদের রান্নাঘরের সঙ্গের সার্ভেন্ট রুমে থাকতে দিল অন্য একজন বুয়ার সঙ্গে। সেই দিন থেকে প্রায় ১০ বছর আমরা নানার বাসাতেই থেকে যাই। মা রান্নাসহ ঘরের সব কাজ করে। আমি খেলা করি। নানা–নানির ছেলেমেয়েরা বছরে দু–একবার বিদেশ থেকে বেড়াতে আসে। আমার কাজ ছিল নানার নাতি–নাতনিদের সঙ্গে খেলা করা। ছুটি শেষে ছেলেমেয়ে, নাতি–নাতনিরা যে যার জায়গায় চলে গেলে খালি বাড়িতে আবার আমরা মা মেয়ে আর নানা–নানি। রোজ সন্ধ্যায় নানা আমাকে নিয়ে পড়াতে বসতো। নানাই আমাকে লিখতে, পড়তে, গুনতে শিখিয়েছে, ডিকশনারি থেকে ইংরেজি শব্দের বাংলা অর্থ দেখতে শিখিয়েছে। খবরের কাগজ আর গল্পের বই পড়তে শিখিয়েছে। তারপর একদিন আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে এনজিওর স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। আমার সোমা নামটাও নানারই দেওয়া। যদিও আমার বাবা সেখানে মাঝে মাঝে আসত আমাকে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে মায়ের কাছ থেকে টাকা নিতে। বাবার কোনো নির্দিষ্ট কাজ ছিল না, এখনো নেই, আজ ট্রাক চালায় তো কাল বেকার। পরশু মাতাল হয়ে এসে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে। কিন্তু নানার ভয়ে তখন বেশি ঝামেলা করতে সাহস পেত না।

আমার স্মরণকালে নানার বাসায় কাজ করার বছরগুলো আমার আর মায়ের সবচেয়ে সুখের সময় ছিল। তবু মায়ের একদিন কী মনে হলো, সেই সুখের জীবন তার কাছে একঘেয়ে লাগছিল হয়তো। গুলশানে নানার বাসার কাছের এক বাসার ড্রাইভারের সঙ্গে মায়ের প্রেম হলো। দোকানে পান–জর্দা কিনতে যাওয়ার নাম করে প্রায়ই মা বাইরে গিয়ে সেই ড্রাইভারের সঙ্গে সময় কাটাত। একসময় সুমি পেটে এল। নানির সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করে মা তখন নানার বাসা থেকে কাজ ছেড়ে আবার বস্তিতে এসে উঠল তার ড্রাইভার প্রেমিককে বিয়ে করার পরিকল্পনা নিয়ে। কিন্তু সে বিয়ে আজও হয়নি। বস্তির ঘরে আমি, মা আর সুমি থাকি, সেই ড্রাইভারের আর কোনো পাত্তা নেই। তাই তো আমিও মাকে ও তার প্রেমিককে নিয়ে খিস্তি করতে ছাড়ি না।

নানার বাসার বাঁধা কাজ ছাড়ার পর মা এখন দুই বাসায় ঠিকা কাজ করে। খুব সকালে পাঁচতলার এক বাসায় কাজ করে, সেই বাসায় মা, বাবা, দুই ছেলে, ছেলের বউ, এক মেয়ে সবার জন্য সকালের নাশতা রুটি, ভাজি বানায়, দুপুরের খাবার রান্না করে। রান্না শেষ হলে এক দিন অন্তর এক দিন কাপড় ধোয়, আরেক দিন ঘর মোছে। পাঁচতলার বাসার কাজ শেষ হলে দুপুরে একই বিল্ডিংয়ের তিনতলায় আরেক বাসায় কাজ করতে যায়। সেই বাসার স্যার–ম্যাডাম দুজনেই চাকরি করে, তাদের দুই ছেলে স্কুল–কলেজে পড়ে। তারা কেউ বাসায় থাকে না, গেটে গার্ডের কাছে মায়ের জন্য চাবি রেখে যায়, মা একা গিয়ে কাজ করে আসে। দুই বাসায় কাজ করেও বস্তির বাসা ভাড়া আর সংসারের খরচ সামাল হয় না। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলেই তাই আরেক বাসায় কাজ করতে যায় মা, আজও সেখানে পিঠা বানানোর জন্য ডাক পেয়েছিল, তাই আবারও বাসায় ফিরতে দেরি হয়েছে।

মায়ের ওপর রাগ তখনো কমেনি আমার। কার্ডে লেখার মতো কিছু চিন্তা করার মতো সময় নেই, কিন্তু কার্ড ছাড়া ক্লাসে ঢোকা যাবে না। ব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে তাড়াহুড়ো করে লিখলাম ‘আমার মা একটা মূর্খ মহিলা’।

আমাকে ক্লাসে ঢুকতে দেখে কমল স্যার পড়া না থামিয়ে আমার কাছে এসে আমার হাত থেকে কার্ডটা নিয়ে আবার বোর্ডের কাছে চলে গেল। সেদিন পুরো ক্লাসে স্যার কি যে পড়াল কিছুই আমার কানে গেল না। মাথায় ঘুরছিল মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করার কথা, মাকে গালাগাল করার কথা। হঠাৎ মনে হলো স্যারকে কেন মায়ের কথা লিখতে গেলাম? এখন স্যার আমাকে কী ভাববে? ক্লাসের বাকি সময় শুধু কার্ডের লেখার কথা ভেবেই সংকুচিত হয়ে রইলাম। মনে হলো ক্লাসরুমের মেঝের মাঝখানে দুই ভাগ হয়ে গেলে ভালো হতো, আমি তার নিচে লুকিয়ে যেতাম। বাসায় ফিরে রাতে ঘুম হলো না। স্যার আমার কার্ড পড়ে কী ভাবছে, সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে রইলাম।

বিজ্ঞাপন
default-image

পরের দিন মা ঠিকই সময়মতো ফিরল, তবে আমি ক্লাসে যাওয়ার কোনো আগ্রহ পাচ্ছিলাম না, মনে হলো আর জীবনেও স্যারের সামনে যেতে পারব না। তবে মায়ের জেরার ভয়ে অনিচ্ছা নিয়ে ক্লাসে গেলাম, পেছনে বসে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করলাম। স্যার কার্ড ফেরত দিল সবার বেঞ্চের কাছে গিয়ে গিয়ে। রোজকার মতো কার্ড উল্টো করে রাখল। আমি তার মন্তব্য দেখতে ভয় পাচ্ছিলাম। স্যার নতুন বিষয় পড়াতে শুরু করেছে। বোর্ডে লিখেছে। আমি স্যারের পড়ানো শুনতে শুনতে এক ফাঁকে কার্ড উল্টে তার লেখা মন্তব্য দেখলাম। তাতে লেখা ‘একজন মূর্খ মহিলার মেয়ে কি সারা জীবন তার মায়ের মূর্খতাকে দোষ দিয়েই পার করে দেবে নাকি নিজের জীবন বদলানোর জন্য নিজে দায়িত্ব নেবে?’

আমার ক্লাসের অন্য সবার অবস্থাও কমবেশি আমারই মতো। তারাও সবাই ছেঁড়া স্যান্ডেল পায়ে দিয়েই ক্লাসে আসে। আর ঝগড়া বাধলে সবাই আমার মতো ভাষাতেই গালাগাল করে। ভাগ্যের কোনো এক নিষ্ঠুর চক্রে বন্দী আমরা সবাই। বাবা–মাকে, ভাগ্যকে দোষ দেওয়া ছাড়া আর কীই–বা করার আছে? অন্তত এত দিন আমিও তাই ভাবতাম। কিন্তু আজ স্যারের লেখা মন্তব্য পড়ে মনে হলো আর সবার মতো চক্রে বন্দী হয়ে না থেকে, অন্যের ঘাড়ে দোষ না চাপিয়ে, নিজের দায়িত্ব নিজে কি নিতে পারি না? এই চক্র থেকে তো আমি বের হতে চাই!

সেদিন বাসায় ফিরে মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজে হাত লাগালাম। আমার বয়স থাকতে বাবার সঙ্গে মায়ের বিয়ে হয়েছিল, তারপর আমার জন্ম হতে নয় মাসের বেশি সময় লাগেনি। মা আমাকে বকাঝকা করে, হয়তো মা চায় না তার জীবনের মতো আমার জীবন হোক। কোনোভাবে আমি যেন এই চক্র ভেঙে বের হতে পারি।

*লেখক: মুসাররাত জাহান শ্বেতা, ওহাইও, আমেরিকা থেকে

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন