default-image

শাহানা একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো আর্থিক সংগতি তার পরিবারের নেই। বাবা এজি অফিসে সামান্য বেতনের কেরান। উপরন্তু ওরা তিন বোন আর এক ভাই। ইন্টার পাস করার পর সরকারি ঢাকা বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার তার খুব শখ ছিল। কিন্তু রেজাল্ট ততটা ভালো না হওয়ায় ভর্তিপরীক্ষা দিতে পারেনি। ঠিক সেই সময়টায় তার ছোট চাচা ইতালি থেকে দেশে বেড়াতে আসেন। পড়াশোনার প্রতি শাহানার প্রবল আগ্রহ দেখে ছোট চাচাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও টিউশন ফির ব্যবস্থা করে দেন। তারপর শাহানা পাশের ফ্ল্যাটে একটা টিউশনিও জোগাড় করে ফেলে। এভাবেই তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয়।
ক্লাস শুরু করার পর সে আবিষ্কার করে, প্রায় সব ক্লাসমেটের একটা সামাজিক পরিচিতি আছে। যেমন কারও বাবা চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা, অধ্যাপক বা ব্যবসায়ী। তাই প্রথম থেকেই ক্লাসমেটদের কাছ থেকে সে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে রাখে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে দল বেঁধে ক্লাসমেটরা যখন ক্যানটিনে আড্ডা মারে, শাহানা তখন এটা-সেটার অছিলায় তাদের এড়িয়ে চলে। কারণ, ক্যানটিনে প্রতিবারে স্ন্যাকস বাবদ খরচ করার মতো কয়েক শ টাকা তার ব্যাগে কখনো থাকে না। একমাত্র টিউশনির টাকাটাই তার সারা মাসের যাতায়াত আর হাতখরচের সম্বল। সবকিছু মিলিয়ে সে ক্লাসের কারও সঙ্গেই স্বাভাবিক হতে পারে না। বন্ধুরা কেউ কেউ আঁচ করতে পারলেও ব্যাপারটা তাদের কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না।
এভাবেই দিন গড়িয়ে একদিন ভ্যালেন্টাইনস ডে সামনে এসে পড়ে। ক্লাসমেটরা সবাই মিলে নানা পরিকল্পনা করতে থাকে। অধিকাংশ ক্লাসমেট যাদের বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড আছে, তারা লং ড্রাইভ, পার্কে ঘোরা কিংবা নিরিবিলিতে দিনটা কাটানোর আর অন্যরা মিলে একই কালারের শাড়ি পরে সেজেগুজে দামি রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ খাওয়ার প্ল্যান করে। শাহানা তাদের বাড়িতে ফ্যামিলি প্রোগ্রাম আছে, অজুহাতে ক্লাসমেটদের অফার এড়িয়ে যায়।

আজ ভ্যালেন্টাইনস ডে। শাহানা বেলা করে খুব মন খারাপ নিয়ে ঘুম থেকে ওঠে। ক্লাসমেটরা আজ কত মজা করবে, ভাবতেই তার মনটা আরও খারাপ হয়ে যায়। দৈন্য আর অভাব-অনটনের কথা ভেবে তার বুকের ভেতরটা কষ্টে মোচড় দিতে থাকে। দুপুরে অভিমান করে কিছু না খেয়ে বালিশে মাথা রাখতেই তার তন্দ্রার মতো আসে। আধো ঘুমে দেখে, সে যেন একটা খুব হ্যান্ডসাম ছেলের কাঁধ জড়িয়ে ধরে মোটরবাইকের পেছনে বসে আছে ৷ আর বাইকটা হাওয়ার বেগে ছুটে চলেছে। ছেলেটার লম্বা চুলগুলো বাতাসে উড়ে এসে তার কপালে ছুঁয়ে যাচ্ছে। হেসে হেসে ছেলেটা একটার পর একটা কথা বলেই চলেছে কিন্তু প্রচণ্ড বাতাসে তেমন কিছু শোনা না গেলেও সে মুচকি হেসে সায় দিয়ে এদিক-ওদিক মাথা দোলাচ্ছে। ছেলেটির গালের ওডিকলোনের মিষ্টি গন্ধ তার নাকে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।
পড়ন্ত বিকেলে শাহানার ঘুম ভাঙে। স্বপ্নের ঘটনাটা তার মনে নস্টালজিয়া তৈরি করে। গোসল করে মায়ের জন্য নূতন কেনা হালকা নীল রঙের শাড়িটা পরে সে স্বপ্নে দেখা ছেলেটার চেহারা মনে করার চেষ্টা করে। চোখে কাজল টেনে ভেজা চুলগুলোকে পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে শা​িড়র পাড়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে টিপ আর লিপস্টিক দেয়। তারপর মিষ্টি গন্ধের পারফিউম স্প্রে করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অতি প্রিয় একটা গানের কয়েকটা লাইন গুনগুন করে গেয়ে ওঠে।

default-image

হঠাৎ কল বেল বেজে উঠলে সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই দরজাটা খুলে দেয়। কুরিয়ার মেইলের একটা বড়সড় প্লাস্টিক প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে সই নিয়ে লোকটা চলে যায়। সংবিত ফিরে পেতেই তাড়াহুড়া করে সে প্যাকেটটার ওপরে মোড়া প্লাস্টিকটা খুলে ফেললে ভেতরের হালকা গোলাপি রঙের মোড়ক বেরিয়ে আসে। নিজের অজান্তেই তার সারা শরীরে একটা আনন্দের শিহরণ বয়ে যায়। ওপরে সোনালি হরফে বড় করে লেখা ‘অনলি ফর মাই ভ্যালেন্টাইনস’। তারপর গারো মেরুন রঙের দুটো হার্টের ছবি আর নিচে মুক্তোর অক্ষরে লেখা ‘সাহানা হক’। নামটা পড়েই তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ব্যথা করে ওঠে। দুচোখ ভেঙে কান্না নেমে আসে। অনেক কষ্টে সে নিজেকে সামলিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে পাশের ফ্ল্যাটের সাহানা আপুদের দরজা নক করে। সাহানা আপু গিফটটা পেয়ে চিৎকার করে আনন্দে তাকে জড়িয়ে ধরে আর মোড়কটা নিয়ে গালে মুখে ঘষতে থাকে। শাহানা পাশের চেয়ারটা ধরে ধপ করে বসে পড়ে। সে কোনোভাবেই চেয়ারটা থেকে উঠে দাঁড়াতে পারে না। মনে হয় তার শরীরটা নিচ থেকে ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে৷
(সিডনি, অস্ট্রেলিয়া থেকে)

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন