default-image

নেয়াগাওয়াশি যদি শহর হয়, তাহলে কায়াশিমা একটা উপজেলা, এমনকি গ্রাম বললেও কেউ কিছু মনে করবে না। নিশ্চুপ চারপাশ। ছোট ছোট বাড়িগুলো আরও চুপ থেকে যেন প্রকৃতির মধ্যে নিজের অস্তিত্ব আড়াল করতে চাইছে। এর মধ্যে ছোট্ট ‘নেয়া’ নদীটার দুই ধারে শেওলার সংসার বেড়ে পিচ পথের রংটাই বদলে দিয়েছে।

কিন্তু ওসাকার উত্তরের নেয়াগাওয়াশি শহরের এই কায়াশিমা স্টেশন শুধু নীরবতার জন্যই বিখ্যাত নয়। এই স্টেশনের মধ্যে ৭০০ বছরের পুরোনো এক কর্পূরগাছকে ঘিরে রয়েছে অবিস্মরণীয় কল্পকথা আর স্থানীয় লোকজনের প্রবল ভালোবাসার ইতিহাস।

কায়াশিমা স্টেশন প্রথম চালু হয় ১৯১০ সালে। স্টেশনের পাশেই আদিম এই গাছ নির্ঝঞ্ঝাটভাবে দাঁড়িয়ে ছিল তারও প্রায় ৬০ বছর পর পর্যন্ত। এই সময়টুকু কর্পূরগাছটি আগত পর্যটকদের কাছে আগ্রহের বিষয় ছিল। এর পাশেই আছে একটি ‘শিনতো শ্রাইন’, যা জাপানের প্রাচীন শিনতো ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে জাপানে বেশ জনপ্রিয় পর্যটক আকর্ষণ।

default-image

কিন্তু বিপত্তি বাধল, যখন ১৯৭২ সালে ক্রমবর্ধমান লোকজনের সুবিধার্থে এই স্টেশনটির প্রসারের প্রস্তাব গৃহীত হয়। কারণ প্রস্তাবিত নকশায় গাছটি কেটে ফেলে দ্বিতল দালানসহ স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।

এই খবর চাউর হওয়ামাত্র শত শত স্থানীয় ধার্মিক লোক এই নকশার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ শুরু করেন। শুধু তা–ই নয়, কর্পূরগাছটি ঘিরে কল্পগল্পের ডালপালা গজাতে শুরু করল। কেউ বলেন, এই গাছ কাটলে অমঙ্গল আসবে। মৃত্যু, জরা, ব্যাধি আর অভিশাপে ভরে যাবে এই শহর। কেউ বললেন, একটা সাদা সাপ নাকি গাছটি পাহারা দিচ্ছে। স্বয়ং বিধাতাই গাছটি পাহারার এই ব্যবস্থা করেছেন। ইত্যাদি নানা কুসংস্কার আর গুজবের মধ্যে স্থানীয় লোকজনের গাছটির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।

default-image

শেষ পর্যন্ত গাছটি বাঁচাতে স্টেশনের নকশায় পরিবর্তন এনে ১৯৭৩ সালে নতুন নকশা প্রণয়ন করা হয়। দ্বিতল স্টেশনের দ্বিতীয় তলায় ছবির মতো গাছটির চারপাশ ঘিরে স্টিলের কাঠামো দিয়ে একটা ডিসপ্লে গ্লাসের চমৎকার স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। কর্পূরগাছটি দূর থেকে দেখলে মনে হবে স্টেশনের ছাদ ফুঁড়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। এক আশ্চর্য কর্পূরগাছের জন্য কত টাকা ব্যয় করে নতুন নকশা তৈরি করা হলো, তা কেবল ভালোবাসাই নয়, বরং প্রকৃতির কাছে মানুষের হৃদয় নিংড়ানো কৃতজ্ঞতার এক অনন্য উদাহরণ।

আমাদের দেশেও এমন গাছ গুনে শেষ করা যাবে না। কিন্তু আমাদের ভালোবাসা? কৃতজ্ঞতা? কেবল বুলি আওড়ানো সস্তা আবেগ দিয়ে নিজের বেঁচে থাকার সময়টুকু পার করে পরবর্তী প্রজন্মে কী দিয়ে যাচ্ছি, তা ভেবে দেখা উচিত। কায়াশিমার লোকেরা যদি ৫০ বছর আগে বুঝে থাকে, তাহলে আমাদের বোধবুদ্ধি আর কবে হবে?

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন