default-image

নিয়তি মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়, মানুষ জানে না। নিয়তি আর মানুষের পরিকল্পনায় যোজন যোজন ফারাক। পৃথিবীর সবকিছু নিজস্ব সূত্র মেনে চলে। প্রকৃতির নিয়মটাই ভারসাম্য আর নিরবচ্ছিন্নতার সূত্রে গাঁথা। যাহোক, যে বিষয়ের আজ অবতারণা করতে চাই, তা–ই বলি। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবাসজীবন আমার জীবনের সেরা পাঠ, সেরা শিক্ষালয়। পাঠক, বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক আমার মধ্যে জীবনবোধ যতটুকু জাগিয়েছে, তার চেয়ে বেশি জাগ্রত করেছে প্রবাসজীবন।

পাঠক, আপনারা জানেন, পঞ্চাশের দশকের দিকের জীর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া এখন বিশ্ববাসীর কাছে এক অনন্য মডেল। দেশটি ডিজিটাল দুনিয়ায় শুধু নয়, গোটা পৃথিবীর কাছে উপমাময় বিস্ময়। মানবাধিকার সূচকে প্রথম দিকে। প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও উৎকর্ষে প্রথম সারিতে। জাপান ও জার্মানিকে মডেল ধরে দেশটি অনুপম উচ্চতায় পৌঁছেছে। ধর্মের চেয়ে কর্ম তাদের আরাধনা। কোরিয়ানরা সুশৃঙ্খল ও পরিশ্রমী জাতি। সব জায়গায় অমোঘ নিয়মানুবর্তিতা চোখে পড়ে। নিয়ম যেন পুরো জাতির সামাজিক–পারিবারিক প্রশিক্ষণ, জন্মগত দীক্ষা। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না, জাপানের আদলে গড়ে উঠছে দেশটিজুড়ে মজবুত ও নবপ্রযুক্তির গাঁথুনি। দেশটিতে দেখবেন না, কোনো কালোবাজারি পণ্যের দাম বাড়িয়ে মানুষকে জিম্মি করেছেন। তারা একসঙ্গে বাঁচতে শিখেছে। কালোবাজারি হওয়ার পথ বা সুযোগ নেই দক্ষিণ কোরিয়ায়। আমি গত ১০ বছরে তা দেখিনি। সেখানে ছোটখাটো সমস্যা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। খাবারে ভেজাল মেশানো তাদের অভিধানে নেই। রাস্তাগুলো অপরিষ্কার দেখবেন না। শুধু বয়স্ক কিংবা যুবকেরা নন, একটি শিশুও রাস্তায় ময়লা ফেলে রাখে না। কর্মস্থলে এক মিনিট দেরিতে আসে না। ট্রেন এক মিনিট দেরিতে ছাড়ে না। হাসপাতালে রোগীদের অযথা হয়রানির শিকার হতে হয় না। বেতন দিতে দেরি করে না। তাদের ধর্মীয় দিনগুলোতে দ্রব্যমূল্য বাড়ে না, বরং কমে। এটি শুধু দক্ষিণ কোরিয়ায় নয়, ইউরোপেও। করোনাকালে জার্মানিতে স্বচক্ষে দেখলাম, বড়দিন উপলক্ষেই দ্রব্যমূল্যে বিশেষ ছাড়। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রমজানকে টার্গেট করে সবকিছুর দাম রাখে আকাশচুম্বী।

বিজ্ঞাপন
default-image

রোজার সময় এলে দেখবেন অন্যান্য মুসলিম দেশ পণ্যমূল্যে ছাড় দিচ্ছে। আর বাংলাদেশের একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এ সময়ই দাম বাড়িয়ে জনজীবন বিষিয়ে তোলে। রমজানের প্রকৃত শিক্ষা কি এটা? চিরাচরিত নিয়মে রমজানে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বাড়বেই। যেকোনো উৎসবের আগে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া বলুন, জার্মানি বলুন, জাপান বলুন, বিশেষ দিনগুলো উপলক্ষে বিশেষ মূল্যছাড় দেওয়া হয় সেখানে। গত ডিসেম্বরে, বড়দিনে জার্মানিতে এক ছোট ভাই বললেন মুঠোফোন লাগলে যেন কিনে ফেলি, আমি বললাম পরে নেব। ভাইটি জানালেন, এই রকম মূল্যছাড় উৎসবে ছাড়া আর পাব না।

বিশ্বজুড়েই উৎসবকে ঘিরে মূল্যছাড় দেওয়া হয়, সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য। শুধু দক্ষিণ কোরিয়া নয়, জার্মানিতে ইস্টার, কার্নিভ্যাল, বড়দিনসহ নানান উৎসবেও মূল্যছাড় যেন নৈতিক দায়িত্ব। উৎসবের আগে তো বিশেষ ছাড় থাকে ইউরোপের দেশগুলোতে। বিশেষ করে জার্মানিতে দেখেছি, দারুণ আকর্ষণীয় মূল্যছাড়! অন্যদিকে উৎসবে বিশ্বের বিপরীতে যেন বাংলাদেশ।

*লেখক: জার্মানপ্রবাসী

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন