বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সে ও তার সাবেক স্ত্রী একসঙ্গে সাত বছর ঘর করেছে। এতগুলো বছর একসঙ্গে থাকার পর তারা ধীরে ধীরে জানল যে সামথিং ইজ মিসিং বিটুইন দেম। শেষমেশ তারা দুজনেই এই সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছাল যে সারা জীবন একসঙ্গে থাকার, চলার কিংবা একসঙ্গে মরার জন্য তারা তৈরি হয়নি। তারা ভিন্ন সত্তার মানুষ এবং তাদের মধ্যে ইতি টানাই শ্রেয়। ভবিষ্যতের জন্য সেটা দুজনের জন্যই হয়তো মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসবে।

default-image

তাই দুজনে সিদ্ধান্ত নিল, তাদের সময় হয়েছে যার যার গন্তব্য খুঁজে বের করার। কিন্তু এত দিনের সংসার, এত দিন একসঙ্গে চলার স্মৃতি, সুখ-দুঃখের সঙ্গীকে কি হুট করে বিদায় বলা যায়। তা ছাড়া আমেরিকার হচ্ছে ‘কান্ট্রি অব সেলিব্রেশন’। তারা যেকোনো অছিলাকেই উদ্‌যাপন করে; এমনকি মানুষ মরে গেলেও। অবশ্য সেই মানুষ যদি একটা পরিপূর্ণ জীবন পার করে যায়; অর্থাৎ তার অকাল বা অস্বাভাবিক মৃত্যু না হয়। ফিউনারেলে এসে লোজজন তার জীবনকালের কর্ম, স্মৃতি ইত্যাদি উদ্‌যাপন করে তাকে শেষবিদায় জানায়।

এরিক ও তার স্ত্রী সিদ্ধান্ত নিল যে তারাও তাদের বিবাহিত জীবন ইতি টানার আগে উদ্‌যাপন করবে। কোথাও বেড়াতে যাবে। যে কথা, সেই কাজ। তারা চলে গেল বাহামা দ্বীপপুঞ্জে। সেই দ্বীপপুঞ্জে গভীর রাতেও আকাশের সাদা মেঘ চোখে দেখা যায়। অন্ধকারেও হঠাৎ পাখি ডেকে ওঠে।

খুব আনন্দের মধ্যে তারা দুই সপ্তাহ একসঙ্গে থাকল। ভীষণ একটা মধুর সময় ছিল সেটা। কেউ কাউকে কোনো ধরনের ভুলত্রুটি, দোষারোপ, কিংবা আগের কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ–আলোচনা করল না। মধুবিদায়ে তাদের বিষয় ছিল শুধুই মধুর স্মৃতি রোমন্থন।

দুঃখের যেমনটি শেষ আছে, আনন্দেরও তাই। সময় হলো ফিরে আসার। তাদের পরিকল্পনা ছিল ফিরতি ফ্লাইট হবে যার যার তার তার। অর্থাৎ যে যার মতো ফিরে আসবে এবং ওখান থেকেই তারা আলাদা হয়ে যাবে। হলোও তাই। শেষ অবকাশে যাওয়ার আগেই তারা নিজেদের আলাদা বাসা ঠিক করে রেখেছিল। ফিরে এসে যেন একই বাড়িতে না উঠতে হয়।

দুজনে এয়ারপোর্টে এল একসঙ্গে। তারপর যার যার লাইন আলাদা হয়ে গেল। দুজন যাবে দুই গন্তব্যে। একজন আরেকজনকে ধরে আলিঙ্গন করে নিল। কেউ কারও কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়া বা ক্ষমা করা নিয়েও কোনো প্রসঙ্গ তুলল না। তবে দুজনেই দুজনকে উইশ করল, যাতে তাদের বাকি জীবন আগের চেয়ে আরও মধুর হয়।

default-image

এরিকের স্পিচের পরে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আলাদা হওয়ার পর প্লেনে তোমার অনুভূতি কেমন ছিল। সে বলল, একটু তো খারাপ লেগেছিল। কিন্তু আমি খারাপ অনুভূতিকে বেশি পাত্তা দিই না। বেশি অনুভূতিশীল মানুষের কপালে দুঃখ থাকে। প্লেনে আমি দুর্বল হয়ে যাওয়ার আগেই গলায় সুরা ঢেলে হেডফোনে একটা প্রিয় গান শুনছিলাম।
-কী গান?
-লুইস আর্মস্ট্রংয়ের সেই বিখ্যাত গানটা ‘হোয়াট আ ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড!’
আমি এরিকের কথার সঙ্গে সঙ্গে লুইসের সেই গানের অর্থ খুঁজে বেড়াই।
আহা! কী অপূর্ব এই পৃথিবী!
আমি সবুজে ঘেরা গাছগাছালি দেখি
তাদের মাঝে লাল গোলাপ প্রস্ফুটিত
তোমার ও আমার জন্য
বিস্ময় নিয়ে ভাবি আহা! কী সুন্দর এই পৃথিবী!
আহা! কী অপূর্ব এই ধরিত্রী
আমি নীলাবরণে ঢাকা আকাশ দেখি
সঙ্গে শুভ্র মেঘের মাখামাখি
একটা উজ্জ্বল আশীর্বাদপুষ্ট দিন,
আর পবিত্র অন্ধকার রাত
অতঃপর নিজেকেই বোঝাই, আহা! কী সুন্দর এই আরাধনা! কী সুন্দর!
রংধনুর কী মনোহারী রং,
মেখে আছে আকাশের গায়ে
চলাচলরত মানুষের মুখচ্ছবিতে।
আমি দেখছি, বন্ধুরা সবাই হাত মিলিয়ে বলছে, কেমন আছ?
তারা এই বোঝাচ্ছে, ‘আমরা সবাইকে ভালোবাসি।’
আমি শিশুদের কান্না শুনতে পাই
তাদের বেড়ে উঠতে দেখি
তারাও একদিন অনেক কিছু শিখবে,
যা আমি কখনো জানব না
তখন নিজেকেই বোঝাই
আহা! কী সুন্দর এই বসুমতী।
হ্যাঁ, আমি বারবার নিজেকেই বোঝাই
আহা! কী মায়াময় এ বসুন্ধরা।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন