মাকে দেখেছি সর্বক্ষণ ভাইবোনদের জন্য চিন্তা করতে।

আমরা যখন বাড়ি থেকে দূরে অন্য এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছি, তখন আমাদের সঙ্গে একই বাড়িতে আরও দুই পরিবার ছিল। বাবার বন্ধু ফেরু মাতবরের পরিবার এবং বাড়ির কাকা-কাকিমা (জার্মন-মেরি)। বড় তিন বোন তখন যুবতী। বাবার বন্ধুর মেয়েরাও তাদেরই বয়সের। মাকে দেখতাম সব সময় তাদের চোখে চোখে রাখতে। বিপদের নাকি কোনো হাত–পা থাকে না, তাই বলা তো যায় না, কখন কোন বিপদ এসে চেপে ধরে, তাই। যদি সেই এলাকায় দেশি দোসরদের সহযোগিতায় আবার কোনো পাকিস্তানি সৈন্য ঢুকে পড়ে তবে যে রক্ষে নেই।

আমার জানামতে মাকে কখনো দেখিনি বোনদের দূরে কোথাও একা যেতে দিতে। একটা বিষয় আমার খুব মনে পড়ে, একদিন দুপুরে বাড়ি থেকে দূরে বিলের মাঝখানে একটা পুকুরের মতো ডোবা ছিল, সেখানে বোনেরা সবাই মিলে গোসল করতে যাওয়ার পর বাড়িতে মা মনে হয় বোনদের নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিল। এলাকার লোকজন যেহেতু একসঙ্গে খোলা আকাশের নিচে সেখানে গোসল করে তাই কে কখন কী বলে বা কী ঘটিয়ে বসে এ নিয়ে মায়ের মনে দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না (সব মায়েদেরই এমন হয় হয়তো)। তাই মা আমাকে বলল, তুইও যা দিদিদের সঙ্গে গোসল করে আয় আর দেখিস দিদিদের যেন কিছু না হয়, কেউ যেন কিছু না বলে, দেখবি।

এটুকুন ছেলেকে মা তার বড় মেয়েদের দেখে রাখার কথা বলেছিল, বিষয়টি তখন অতটা না বুঝলেও পরে আমার মনের মধ্যে কাজ করেছে বিধায় মনে ধারণ করে রেখেছি। যদিও বোনদের কিছু হলে প্রতিবাদ করার ক্ষমতা আমার সেই বয়সে থাকার কথা নয় তার পরেও মায়ের মনে এটুকু আশা জেগেছিল হয়তো যে আমি বোনদের সঙ্গে গেলে যদি কিছু ঘটে তাহলে বাড়ি এসে বলতে পারব, তাই।

সেদিনের একটি ঘটনা বেশ মনে পড়ে। বোনদের সে সময় পর্যাপ্ত কাপড় ছিল না। তাই গোসল করতে গিয়ে বাড়ির মহিলাদের একজন গোসল সেরে কাপড় বদলে অন্যজনকে দিলে অন্যজন গোসল করেছে (স্মৃতি থেকে বলছি)। তা ছাড়া খোলা বিলের মধ্যে তারা কয়েকজন মিলে শাড়ি দিয়ে ঘিরে ধরলে একেকজন করে কাপড় বদলাত। দৃশ্যটির কথা মনে হলে আমার কাছে এখনো সিনেমা সিনেমা মনে হয়।

যুদ্ধের সময় যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম সে বাড়িতে বাবার বন্ধুর স্ত্রী (জেঠিমা), বাড়ির কাকিমাসহ মা প্রতিদিন বোনদের সঙ্গে আগলে থাকত। কারও যেন কিছু না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন ছিল বেশ।

যুদ্ধের প্রায় শেষ দিকে একদিন বাড়ির এক জেঠাতো ভাই (মুক্তিযোদ্ধা) তার সহযোদ্ধাদের কয়েকজনকে নিয়ে এসেছিল আমাদের সঙ্গে দেখা করেতে। আসলে তাঁরা এসেছিলেন, আমরা কোথায় কেমন আছি, তা জানতে। আসার পর সন্ধ্যার দিকে সেই বাড়ির পশ্চিম দিকের ভিটার ঢালে বসে গল্প করছিল সবাই মিলে। ওদের সঙ্গে ছিল অস্ত্র। সেদিন আমি প্রথম মায়ের চোখে পানি দেখেছি।

মা মুক্তিযোদ্ধা সেই জেঠাতো ভাইয়ের কাছে বড় ভাইয়ের কথা জানতে চেয়ে কেঁদেছিল। বাড়ির ছেলেকে দেখে নিজের ছেলের কথা জানার জন্য যে ব্যাকুল ছিল মায়ের মন তা তখনই বুঝতে পারি। মুক্তিযোদ্ধা সেই জেঠাতো ভাই বাড়ির সবাইকে আশ্বস্ত করেছিল এই বলে যে, তোমাদের আর কোনো চিন্তা নেই, আমরা সবাই দেশে ঢুকে পড়েছি। চারদিক থেকে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ওদের ঘিরে ফেলেছে। ওদের যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। শিগগিরই হয়তো আমরা স্বাধীন হব। তখন দাদা বাড়িতে ফিরে আসবে। সেদিনগুলোর সব কথা মনে নেই তবে সেদিনের প্রায় সব দৃশ্য চোখে ভাসে এখনো মনে করলেই।

মা সর্বদা বেশ চিন্তিত থাকত। মা যে শুধু তার নিজের ছেলের কথাই ভাবত, তা কিন্তু নয়। বড় ভাই তার সঙ্গে অন্য যাদের নিয়ে গিয়েছিল ভারত যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে, সবার কথাই ভাবত। নানা কারণে ভাবত দেশের কথাও।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0