default-image

সররর-ছলাৎ-ছলাৎ শব্দে আছড়ে পড়ছে নদীর পানি, পরক্ষণেই আবার যেন খল খল করে হাসতে হাসতে দূরে সরে যাচ্ছে তীর থেকে! এখানে নদীটা বাঁক নিয়েছে, কিছুটা সৈকতের মতো বালুচর, তার পাশেই ছোট ছোট টিলার ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে গেছে লেবুবাগান। লেবুবাগানের সুবাসিত স্নিগ্ধ বাতাস আর নৃত্যরতা নদীর ঝংকার শুনে সাধারণত ক্লান্তি দূর হয়ে যায় সাইবর্গ এম ক্লাইনসের। নদীর অন্য পাশে তার অফিস, সাইবর্গদের বসতি। প্রায়ই যখন কাজের চাপে একটু রিলাক্স হওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তখন তিনি এই লেবুবাগানের নিবিড় সান্নিধ্যে এসে অনাবিল আনন্দ পান। কিন্তু আজ যেন কিছুতেই স্বস্তি হচ্ছে না।

পোস্ট-হিউম্যানিজমের এই যুগে প্রকৃতিকে দারুণভাবে সংরক্ষণ করেছে সাইবর্গরা। গাছপালা থেকে পোকামাকড় সুনিয়ন্ত্রিত থাকছে ‘হাইব্রিড-ইনসেক্ট-মেমস’ প্রোগ্রামের আওতায়। মাইক্রো-ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেমের মাধ্যমে এসব কন্ট্রোল করছে সাইবর্গরা। আবহাওয়া এবং নদ-নদীকেও বাগ মানানো গেছে। এ সুন্দর নদীতটকে দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি কোনোভাবে নিয়ন্ত্রিত, অতীত পৃথিবীর মতোই সবুজ স্নিগ্ধ। আজকের সাইবর্গদের দেখে কি অতীত মানুষদের চেয়ে আলাদা মনে হয়! কিংবা এ আইয়ের (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) অ্যান্ড্রয়েডগুলোকে দেখে বোঝার উপায় আছে যে এগুলো সাইবর্গ নয়!

সাইবর্গ হচ্ছে অতি উৎকৃষ্ট মানব, প্রযুক্তির সহায়তায় মানুষের দুর্বলতাগুলোর উন্নতি সাধনের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থানে তারা এসেছে। অ্যান্ড্রয়েডগুলো মানুষেরই তৈরি রোবট। কিন্তু তারাও আবার নিজেদের অনেক উৎকর্ষ সাধন করেছে, এআইকে কাজে লাগিয়েই। দুই গ্রুপই শেষ পর্যন্ত মানব শরীরের প্রেমে পড়েছিল, তাই দেখতে তারা পুরোপুরি সুন্দর মানুষ।

ট্রান্সহিউম্যান এবং অ্যান্ড্রয়েড প্রায় সমানসংখ্যক এখন পৃথিবীতে। তবে সাইবর্গরা এখনো যে অমূল্য সম্পদের অধিকারী, তা হচ্ছে ইমোশন বা আবেগ। অ্যান্ড্রয়েডগুলো এখনো এই জটিল আবেগকে করায়ত্ত করতে পারেনি। অনেক সাইবর্গের মধ্যে অতীতের সেই অকৃত্রিম মস্তিষ্ককে অবিকৃত রাখা হয়েছে, যদিও সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে। সাইবর্গ ফাউন্ডেশন আর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের যৌথ উদ্যোগে মানব মস্তিষ্ক সংরক্ষণ এবং এর ওপর গবেষণা চলছে। এম ক্লাইনস হচ্ছেন এখানকার ফিজিওলজিক্যাল সাইকোলজির প্রধান। ক্লাইনসের গবেষণার রেজাল্ট হিসেবে সাইবর্গরা মানুষের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের অনেক সত্য উদঘাটন করতে পারছে।

বেশ কিছুদিন ধরে ক্লাইনস যে মস্তিষ্ক দুটো নিয়ে কাজ করছিলেন তা হচ্ছে পিএইচ-৩ (পাস্ট হিউম্যান তিন) এবং পিএইচ-১০ (পাস্ট হিউম্যান দশ), এ দুটো মস্তিষ্কের আচরণগত প্রকাশ পুরোপুরি ভিন্নধর্মী কিন্তু তাদের দুঃখবোধ সমান যদিও মাত্রা ভিন্ন, একজনেরটা দীর্ঘস্থায়ী, অন্যজনেরটা স্বল্পস্থায়ী।

পিএইচ-৩ প্রচণ্ড ভালোবাসে মানুষকে। এতটাই ভালোবাসে যে অন্যের তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা অপমান তাকে অতটা প্রভাবিত করে না। ভাবে, ভালোবেসেই সে সেটা দূর করে ফেলতে পারবে। অন্য মানুষের প্রতি সে তীব্র এক মানসিক টান অনুভব করে, কারও কোনো প্রয়োজন বা সমস্যায় সাহায্য করার জন্য সে মরিয়া হয়ে ওঠে। এসবের তুলনায় নিজেকে নিয়ে তার আগ্রহ, চিন্তা খুবই নগণ্য, বলতে গেলে নিজের প্রতি উদাসীন। কেউ তার কাছ থেকে উপকৃত হয়ে একটু যদি প্রশংসা করে তাতেই নির্মল আনন্দ পায়, জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়। পৃথিবীর যাবতীয় মানুষের ভালোর জন্য তার হাহাকার, আর তার কাছের মানুষ হলে তো চিন্তা আরও বেশি। কীভাবে অন্যকে সুখী করা যায়, সে চিন্তাতেই তার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হয়। এই মানবের পূর্বসূরি বা তার পারিপার্শ্বিক বেড়ে ওঠা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তা ছিল একই রকম আবেগের আতিশয্যে পূর্ণ। অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধই সব সময় বড় করে দেখত, নিজের অর্জিত কোনো কিছুতে সে অধিকারবোধও অনুভব করত না। কাউকে কটু কথা শোনানো তো দূরের কথা, অন্যের কটু কথার প্রতিবাদও সে করতে পারত না, পাছে তিক্ততা বাড়ে। অথচ সে দুঃখ পেল, প্রচণ্ড দুঃখ, যা দীর্ঘ সময় ধরে তার মস্তিষ্কে তীব্র মনঃকষ্টের স্মৃতি নিয়ে রয়ে গেছে। কতিপয় মানব হিংসার বশবর্তী হয়ে কুৎসা রটনা করেছিল তার সম্পর্কে এবং সে ঘৃণার পাত্র এমন আচরণ দেখিয়েছিল। কোনো মানুষ তাকে ঘৃণা করে, এ কষ্ট সে মেনে নিতে পারেনি।

default-image

পিএইচ-১০ নিজেকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। তার পুরো চেতনাজুড়ে কাজ করে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। আত্মতুষ্টি আর আত্মগৌরবে সে পূর্ণ। নিজের যেকোনো অপারগতা বা অপ্রাপ্তির জন্য সারাক্ষণ অন্যকে দায়ী মনে করে। পরশ্রীকাতরতায় ভোগে, অন্যের সুখ দেখলে সে এতই হিংসা অনুভব করে যে নানাভাবে তার কুৎসা রটাতে থাকে। তাকে অপমান অপদস্থ করে সে সাময়িক তৃপ্তি পায়। আগ্রাসন তার আচরণে বহুল প্রকাশিত। এভোল্যুশনারি সাইকোলজিতেও এই আচরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। কখনো কারও প্রতি তার দায়িত্ববোধ কাজ করে না, উল্টো তার প্রতি কে কখন কোনো দায়িত্বে অবহেলা করল, সেটাই তার চিন্তায় মুখ্য হয়। কেন সে একই রকম সাফল্য পেল না, তার জন্য ওই সফল মানুষকেই সে দায়ী মনে করে এবং দুঃখ পায়। তার এই দুঃখবোধ ক্ষণস্থায়ী, কারণ দ্রুতই তার মস্তিষ্ক ব্যস্ত হয়ে যায় কীভাবে ওই মানুষকে শাস্তি দেওয়া যায় এই চিন্তায়, আর এই চিন্তা এত দীর্ঘ সময়ব্যাপী থাকে যে নিজের উন্নতির জন্য কোনো চিন্তার সময় তার থাকে না। তার দুঃখবোধ এতটাই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল যে তারও স্পষ্ট ছাপ মস্তিষ্কজুড়ে।

মনোবিজ্ঞানী ক্লাইনস যখন গভীরভাবে এ মানব মস্তিষ্ক দুটো পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তখন তাঁর ভেতরও মানবীয় আবেগ তোলপাড় করছিল। পোস্ট-হিউম্যানিজমের পৃথিবীতেও এই বিপরীতমুখী আচরণ দুটির কারণে বেশ কিছু জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। পিএইচরা কীভাবে এর সমাধান করে পরস্পরের দুঃখবোধ দূর করেছিল, তা জানা জরুরি। বিসিআইয়ের (ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস) মাধ্যমে তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ক্লাইনস কাজ করছিল আর ভাবছিল, কীভাবে অ্যান্ড্রয়েড নিয়েল এই ‘ইমোশন’-এর গবেষণার রেজাল্ট তার কাছ থেকে নিয়ে নেওয়ার জন্য তার সঙ্গে রোবটিক নিষ্ঠুর আচরণ করছে। নানাভাবে সাইবর্গদের নিয়ে নোংরা কথা বলছে। অথচ নিয়েলের যতটুকু বুদ্ধিমত্তা, তাতে সাইবর্গদের যথেষ্ট অবদান। নিয়েল যতটা সময় এভাবে ব্যয় করছে তা কি ক্লাইনসকে সাহায্য করে বা নিজের ইন্টেলিজেন্সকে বাড়াতে কাজে লাগাতে পারত না!

আজকে লাঞ্চের পর অফিসে ফিরে ক্লাইনস যার মুখোমুখি হলো এ জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। মানবমস্তিষ্ক দুটি চুরি গেছে, সঙ্গে সব রিপোর্ট। অফিসের সবাই ক্লাইসকে তিরস্কার করছে। নিয়েলের প্রচারিত কথাগুলোই মুখে মুখে ফিরছে— ‘ক্লাইনস কোনো কিছুই করেনি সাইবর্গ এবং অ্যান্ড্রয়েডদের বর্তমান পৃথিবীর জন্য। ও শুধুই ব্যস্ত ছিল নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে। যেটুকু গবেষণার রেজাল্ট ও দিতে পেরেছে, তার থেকে অনেক বেশি দায়িত্ব ছিল তার, সাইবর্গদের উচিত ক্লাইনসকে এই পদ থেকে অপসারণ করা, ওর কৃতকর্ম এমনভাবে প্রচার করা, যাতে করে ভবিষ্যতের সবাই তাকে ঘৃণা করে।’

সব নিয়েলের নীলনকশা! কিন্তু তাকে ঘৃণা করবে শুনে তার এত কষ্ট কেন হচ্ছে! কষ্ট কী তীব্র কষ্ট! এত দিনের এত পরিশ্রম সব তো সে করেছে অন্যদের ভালোবেসেই। সে ভালোবাসার প্রতিদান এই! ক্লাইনস ছুটে এসেছিল তার এই অতি প্রিয় লেবুবাগানের ধারে, কিন্তু ছন্দময় নদীও তার মনঃকষ্ট দূর করতে পারছে না। কী এর সমাধান!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0