default-image

রুফটপ একটা রেস্তোরাঁর ছাদে ছোটখাটো পার্টি চলছে। আমি এতক্ষণ ড্যানিয়েল নামের একজনের সঙ্গে গল্প করছিলাম। কিছুক্ষণ আগে এমন পার্টির দস্তুর মতন ড্যানিয়েলকে ছেড়ে নতুন একটা জটলায় ঢুকে গল্প করছি।

ছোট ছোট বেতের সোফা আর গোলটেবিল দিয়ে সাজানো হয়েছে ছাদ। আমরা যাঁর দাওয়াত পেয়ে এসেছি, তাঁর সঙ্গে বড়জোর ১০ মিনিট কথা হয়েছে। উনি আমার স্বামী আহসানকে চেনেন কোনো বিজনেস কন্ট্যাক্টের মাধ্যমে। যেহেতু আহসান আবাসন খাতে ব্যবসা করতে চায়, তাই উনি আহসানকে ইনভাইট করেছেন।

‘তোমার কি মনে হয় এখন টেসলার স্টকে টাকা ঢোকানো উচিত?’ প্রশ্ন করছেন আমার সামনে দাঁড়ানো মার্ক। মার্কের গাঢ় বাদামি চোখে কৌতুক। যেন আমাকে খুব ঘায়েল করে ফেলেছে এমনভাবে জিজ্ঞেস করল।
‘হুম করতে পারো। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হয়ে লাভ হয়েছে।’ এতক্ষণ মডার্ন আর্ট নিয়ে বকবক করে এখন স্টক মার্কেট নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে।
‘ঠিক বলেছ।’ বলে স্মিত হাসল মার্ক। তুমি সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে বেশ জ্ঞান রাখো দেখছি।

আমি মনে মনে বললাম, ‘যে রাঁধে সে চুল বাঁধে আবার প্লেনও চালায়।’ মুখে বললাম, ‘তা একটু আগ্রহ আছে বলতে পারো। এখন তো আর আগের মতন খবরের কাগজ পড়তে হয় না। স্মার্টফোনে তো পৃথিবীর সব খবর চলে আসে।’
একটু আগেই মার্ক আমার সঙ্গে বিখ্যাত এক ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টিস্টকে নিয়ে গল্প করছিল। ওই শিল্পী নাকি পুরোনো প্লেনের ফেলে দেওয়া অংশের ওপর ছবি আঁকেন। ধাতব ক্যানভাসে নাকি চমৎকার রং আর আলোর খেলা। আমিও মুগ্ধ হয়ে এতক্ষণ গল্প শুনলাম। শিল্পীর নাম শুনে চট করে গুগল করলাম। বাবাহ, যা দাম তাতে তো মনে হয় ঢাকার বেশ কয়েকটি পরিবার এক বছর খেয়ে–পরে বাঁচতে পারবে। অনেক টাকা থাকলে অবশ্য কেউ কেউ এমন আর্ট পিস কিনে বাড়ির কোনো এক কোনায় ঝুলিয়ে রাখে। হয়তো শিল্পীর নামও শোনেনি কোনো দিন। অর্থ দিয়ে আজকাল রুচিশীল পরিচয় কিনতে পাওয়া যায়।

এসব কথার ফাঁকে আমার কোমরের খাঁজে কারও হাত। চেনা স্পর্শ আর চেনা সৌরভ। ঘুরে তাকাতেই আহসান ঝকঝকে হাসি দিয়ে মার্কের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইউ হ্যাভ টু এক্সকিউজ মি। একটা আর্লি মিটিং আছে কালকে। আমরা বের হব।’
আমি বিদায় নিয়ে আহসানের সঙ্গে বের হলাম। বেশ টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। বৃষ্টির পানি থেকে মাথা বাঁচিয়ে গাড়িতে উঠলাম। মিউজিক সিস্টেম চালু হতেই অঞ্জন দত্তের গলা শোনা গেল।

তোমার কথা বলা যেন মধুবালা, তোমার হাঁটাচলা সোফিয়া লরেন;
তোমার গন্ধ ফরাসি আনায় আনায়, অভিমান অপর্ণা সেন;
‘এই হিংসুটে গান কেন শুনছ?’
‘হিংসুটে কেন হবে? বেচারার হৃদয় ভেঙে দিয়ে প্রেমিকা চলে গেছে। কোথায় তুমি তার জন্য একটু দুখ পাবে।’

বিজ্ঞাপন

‘দুঃখ পাবার মতোন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এগুলো হচ্ছে মধ্যবিত্ত ক্লিশে। প্রাক্তনকে নিয়ে দিস্তা দিস্তা কবিতা। গান আর উপন্যাস।’

‘কী সব অদ্ভুত কথা তোমার!’
‘বিয়ে হলে চিত্র অন্য রকম হতো। প্রতিদিন গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করত। বুঝলে?’
‘আচ্ছা এখন অঞ্জন দত্তকে ছাড়ো। আমাকে বলো কোনজন আমাদের প্রসপেক্টিভ বিজনেস পার্টনার।’
‘বলব? আগে তোমার অনুমান শুনি।’
‘উঁহু তুমি বলবে।’

‘মার্ক কোহেনকে দিয়ে তোমার হবে না। ভদ্রলোকের বাঁ হাতে আংটি নেই। খুব রিসেন্টলি ডিভোর্সড। ক্রেডিট স্কোরের বারোটা অবস্থা। ও ব্যাংক থেকে লোন তোলার ব্যাপারে তোমার কাজে লাগবে না। তুমি বরং টমাসের সঙ্গে কাজ করো। ওরা বনেদি বড়লোক। ওর বাবার শহরের বাইরে একটা বিরাট রাঞ্চ আছে। টমাসের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো। তুমি এই মুহূর্তে স্টেবল কাউকে খুঁজছ যার ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ঝামেলা নেই।’

‘একদম ঠিক। তা তুমি কী করে বুঝলে মার্ক ডিভোর্সড।’
খুব সহজ। বাঁ হাতে আংটি নেই। তার ওপর এক ফরাসি সুন্দরীর সঙ্গে বেশ মনোযোগ দিয়ে গল্প করছিল। আর ও নিজেও কাস্টডি নিয়ে কি যেন বলছিল। নতুন নতুন যাদের বিচ্ছেদ হয়, তাদের দেখলেই বোঝা যায়। কেমন একটা দড়িছেঁড়া গরু ভাব। হি হি হি।
থ্যাংকস ওয়ানস অ্যাগেইন। আমি দেখি থমাসের সঙ্গে একটা লাঞ্চ ফিক্সড করা যায় কি না।

কপাল ভালো আজকে বেশি ট্রাফিক নেই। মিনিট বিশেকের মধ্যেই আমরা বাড়ি পৌঁছে গেলাম। টরন্টোর আকাশে তখন গুমোট ভাব। কেমন একটা হতচ্ছাড়া আবহাওয়া। দুদিন ধরেই রোদের দেখা নেই। আহসান আমার এই রোদপ্রীতি নিয়ে খুব হাসাহাসি করে। ওর ধারণা আমি নাকি গাছ। গাছেদের যেমন খাবার তৈরি করতে সূর্যালোকের প্রয়োজন হয়। আমার ও নাকি তেমন।

আহসান আমাকে প্রায়ই নেটওয়ার্কিং গেট টুগেদারগুলোতে নিয়ে যায়। আমি নাকি বেশ ভালো মানুষ পড়তে পারি। ও নিজেও খুব ভালো পড়তে পারে। তবু আমাকে নিয়ে আসে দ্বিতীয় একজোড়া চোখ দিয়ে পরীক্ষা করতে। আহসানের পরিবার বনেদি বড়লোক। ওদের পারিবারিক ব্যবসা অলংকারের। পাকা জহুরির চোখ। কোনো বিনিয়োগে এখনো টাকা হারায়নি আহসান। ও সবকিছুই ভেবেচিন্তে করে। বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলো ও যেন বিনিয়োগ।

আহসান আসলেও মিথ্যা বলেনি। ওর সকালে একটা মিটিং আছে আমি যত দূর জানি। বাড়িতে ফিরেই একটা হট শাওয়ার নিয়ে কাপড় বদলে ঘুমাতে গেছে আহসান। আমি একা একা চুপচাপ বসে খালেদ হুসেইনির একটা বই নিয়ে বসেছি। এমনিই পাতা ওলটাচ্ছি। এমন বই একটানে পড়ে ফেলতে হয়। আজকে কেন যেন মনোযোগ দিতে পারছি না।

default-image

ফোন ভাইব্রেট করছে। এত রাতে কে ফোন করল? নিশ্চয় বাংলাদেশের ফোন। আমি ফোন হাতে নিয়ে অবাক হলাম। ইরার ফোন। আমার ইউনিভার্সিটির বান্ধবী। এত দিন পরে হঠাৎ কী মনে করে ফোন করছে ভেবে ধরলাম।
‘কিরে ইরা? এত দিন পরে মনে পড়ল আমাকে?’
‘না এমনি। হুট করে তোর কথা মনে হচ্ছিল।’

‘আমি তোদের খুব মিস করি রে। গতবার যখন ঢাকায় এসেছিলাম, অনেক দিন পর আবার আড্ডা দিয়েছিলাম তাসমিয়ার বাড়িতে। তুই তো আসলি না।’

‘হ্যাঁ রে। শুনেছিলাম। তুই কি এর মধ্যে আবার আসবি?’
‘কেন আমি এলে দেখা করবি? দেখা করলে আসব। আচ্ছা তুই কি আমার ওপর এখনো রেগে আছিস?’
‘কী নিয়ে রাগ থাকবে বলত? কী সব বলিস তুই?’
‘রাগ নেই? সত্যি বলছিস তো? আমি যে শাহেদকে ছেড়ে আহসানকে বিয়ে করলাম এই জন্য রাগ। তুই আমার বিয়েতে পর্যন্ত আসিসনি।’

ইরা এবার জিজ্ঞেস করল, ‘তোর কি এখনো শাহেদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে?’
‘নাহ তেমন নেই। আমরা দুজনের ফেসবুকে আছি ওই পর্যন্ত। এর বেশি না।’
ইরা এবার একটু হালকা গলায় বলল, ‘আমার কি মনে হয় জানিস শাহেদ তোকে এখনো ভুলতে পারেনি।’

‘কী সব যা তা বলিস না।’ আমি মনে মনে বোধ হয় একটু খুশি হই। ‘তোর বাকি খবর বল। প্রেমট্রেম করে বেড়াচ্ছিস নাকি?’
‘করতেও পারি। আমি এখন সেই আগের মতন চশমা পরা বইয়ের ভেতর মুখ ডুবিয়ে থাকা ইরা নেই।’ বলে হাসল ইরা।

আমি একটা হাই চেপে বললাম, ‘ইরু শোন, বেশ রাত হয়ে গেছে রে। আরেক দিন কথা বলব?’
‘শোন, মাঝে মাঝে ফোন করিস।’

আমি ফোন রেখে আবার নীল–সাদা জগতে ঢুকলাম। শাহেদের খুব বেশি ছবি ফেসবুকে নেই। প্রায় দুই বছর আগের একটা ছবি। তাও চোখে কাল রোদ চশমা পরা। আমি আসলেও তিন বছর পরে শাহেদের চোখ কেমন ছিল মনে করতে পারছি না।

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় ওর সঙ্গে পরিচয়। আমাদের দুজনের একটা শখ ছিল অ্যাস্ট্রোনমি। ও তখন অ্যাপ্লায়েড ফিজিকস নিয়ে পড়ছে। আমি ব্যবসায় প্রশাসন।
আমরা দুজনেই অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মেম্বার ছিলাম। প্রথমবারের মতন বড় টেলিস্কোপ দিয়ে চাঁদের গায়ের দাগ দেখায় আমার সেকি উচ্ছ্বাস। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল শনি গ্রহের বলয় দেখতে। আমার বন্ধু–বান্ধবীরাও শাহেদকে ভারী পছন্দ করত। আমাদের থেকে তিন ব্যাচ বড়। মেধাবী ছাত্র। স্বপ্নের মতন দিন ছিল সেসব।

থার্ড ইয়ারে থাকতেই হুট করে আমার বাবা মারা যান। আমার আরও ছোট দুই বোন ছিল। মাথার ওপরে ঠাঁই ছিল। পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত একটা ছোট ফ্ল্যাট ছিল। তাতে কি আর চলে। সচ্ছল পরিবারের মেয়ে ছিলাম বরাবর। অসচ্ছলতার সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়। তিনটে টিউশনি ঠেলে বাড়ি ফিরে শুধু নেই নেই শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে যেতাম। মায়ের ঘ্যান ঘ্যান শুনতে বিরক্ত লাগত। আসলে অনেক আলোতে অভ্যস্ত হলে হুট করে সব অন্ধকার হলে মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। আমাদেরও তাই হয়েছিল। নইলে ঢাকায় কি মধ্যবিত্তরা বেঁচে নেই। আমার সবকিছুর ওপর রাগ হতো তখন।

বিজ্ঞাপন

বাবা মারা যাওয়ার পর দেখলাম আমাদের তিন বোনের নাম একটা স্বল্প অঙ্কের এফডিআর ছাড়া ওনার কোনো বিশেষ সঞ্চয় ছিল না। আমাদের কোনো আবদার যিনি কখনো অপূর্ণ রাখেননি, তাঁর সঞ্চয় তো এমনই হবে। নিজের চেয়ে বেশি চিন্তা ছিল আমার দুই বোনেই জন্য।

আমার দুচোখে স্বপ্ন ছিল মাস্টার্স শেষ করে একাডেমিক লাইনে যাব। সব প্ল্যানের ওপর পানি ঢেলে দিয়ে বাবা কেন পালিয়ে গেলেন এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতাম না। শাহেদ অবশ্য সব সময় ছিল পাশে।

আমার বিয়ের বছরে একটা অদ্ভুত সুন্দর জন্মদিনের উপহার ছিল আমার নামে একটা তারার নামকরণ। কসমো নোভা নামের কী একটা ওয়েবসাইট থেকে একটা নক্ষত্রের নাম আমার সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছিল। সেই তারার ম্যাপ অবধি ছিল। একটা সুন্দর চিঠিও দিয়েছিল সঙ্গে। চিঠিতে লেখা ছিল কোনো এক গ্যালাক্সির একটা তারা হয়ে আমি সব সময় জলজল করব আমি। আমি বেশ চমৎকৃত হয়েছিলাম। আমার নামের সঙ্গে মিল রেখেই হয়তো এমন করেছিল শাহেদ। আমার নাম খুব সেকেলে শুকতারা। বাবা আমার দাদির নামের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছিলেন।
আহসানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমার একটা দামি ব্র্যান্ডের শোরুমে। আমি দুই বোনের জন্য ঈদের কাপড় কিনতে গেছি। ছোট দুই বোন আগের রাতে রাগ করে ভাত খায়নি। ওদের পছন্দমতো ঈদের জামা চাই।

অনেকগুলো জামা হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছি কখন ট্রায়াল রুম খুলে দেবে। আমার আগে একজন এসে কিছু একটা পে করতে চাইল। আমার খুব মেজাজ খারাপ হলো। আমি বললাম আমি ওনার আগে এসেছি। আপনি আমাকে আগে সাহায্য করবেন। আহসান ওর ঝকঝকে সুন্দর হাসি দিয়ে বলেছিল ও অত্যন্ত দুঃখিত। আসলে বুঝতে পারেনি। আমি নিজেও লজ্জা পেলাম।

এমন চেঁচামেচি করা আমার স্বভাবে নেই। আমিও বললাম এমন ভুল–বোঝাবুঝি হতেই পারে। তারপর হলো আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার। ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে দেখি ব্যাগে একটা মুক্তোর মালা। আমি দৌড়ে ফেরত গেলাম। দেখি আহসান ও দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে হাসিমুখে বলল আমার মায়ের জন্মদিনের উপহার। ব্যাগ বদল হলো। আসার আগে আহসান আমাকে ওর মায়ের জন্য একটা শাড়ি পছন্দ করে দিতে।
কথায় কথায় আমার ফোন নম্বর চাইল। আমি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে ওকে নম্বর দিইনি। এমনিই দিয়েছিলাম। ও আমাকে বেশ ঘন ঘন ফোন করত। কথা বলতে বলতে কোনো এক সময় আমি আহসানের দুর্বলতা টের পেলাম। আহসান কানাডা ফেরত গিয়েও আমাকে নিয়মিত ফোন করত। একদিকে অনেক দিনের ভালোবাসা, অন্যদিকে সচ্ছল জীবনের হাতছানি। আমি দিশেহারা বোধ করতাম।

আহসান ধনবান পরিবারের ছেলে। প্রতিদিন তেল–চিনি–লবণের হিসাব রাখা মানুষ আমি কোনোকালেই ছিলাম না। এখন তো রীতিমতো বিরক্ত। অসচ্ছলতা আমাকে একটা শিক্ষা দিয়েছিল দূর আকাশের নক্ষত্রের চেয়ে বেশি দ্যুতি ছড়াতে পারে অনামিকার হীরার সলিটেয়ার। আমি তো ঠিক ওই রকম জীবনই চাই। আমার দুই বোনের একটা গতি হবে। আমার বিয়েতে বেশি খরচ না করলে মা ওদের এফডিআর ভেঙে একটা সুন্দর জীবন দিতে পারবে। বিদেশে যেতে পারলে আমিও ওদেরকে সাহায্য করতে পারব।

শাহেদের স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাওয়া জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে আর অনিশ্চয়তা চাইছিলাম না। আমি শাহেদকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বললাম। আমার বিশ্বাস ছিল ও ব্যাপারটা ম্যাচিউরিটির সঙ্গে হ্যান্ডেল করবে। আমার ধারণা ভুল ছিল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমার কোনো বন্ধুই আমাদের বিয়েতে আসেনি। সেনাকুঞ্জের স্টেজে বসে রাজরানি সেজে বসে থাকা আমি দেখলাম আমার আশপাশে কোনো বন্ধু নেই। আমি অবশ্য নিজেকে প্রবোধ দিয়েছিলাম এই বলে মানুষ যত ওপরে ওঠে তত একা হয়। অনেক উঁচু জায়গায় একজনের বেশি জায়গা হয় না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমার বন্ধুরা আমার ভাগ্যে ঈর্ষান্বিত।

বছরখানেক পর যখন দেশে গিয়েছিলাম, সবাই অবশ্য ভুলে গিয়েছিল। আমিও দুই হাত ভর্তি করে শপিং করেছিলাম সবার জন্য। শুধু আসেনি ইরা। আমিও ওকে নিয়ে আর মাথা ঘামাইনি।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরি হলো। আসলে রাতে লিভিং রুমে সেকশনালে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আহসান সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠে আগের দিনের কথা মনে হয়ে একটু লজ্জায় পেলাম। আমি খুব ভালো আছি। শুধু শুধু কালকে কি সব ভেবেছিলাম।

আহসান দেখি লাঞ্চ শেষ করেই বাড়ি ফিরেছে আজকে। সপ্তাহান্তেও ওর কাজ থাকে। নতুন ব্যবসায় মাথা খাটাতে হচ্ছে ওকে অনেক।

বাড়ি ফিরেই আমাকে বলল আমরা নাকি কটেজে যাচ্ছি। টমাসের বাবার কটেজে আমাদের নিমন্ত্রণ। আমি হাসিমুখে রেডি হলাম। ছোট একটা ব্যাগে কিছু কাপড় টুথব্রাশ আর মেকআপের সরঞ্জাম নিয়ে বের হলাম। আমি ভেবেছিলাম একদিন থাকব। দেখা গেল দুই দিন থাকলাম।

চমৎকার সময় কাটল। এখানে নেটওয়ার্ক খুব দুর্বল। তাই দুই দিন একেবারেই ফোনে ঢুকিনি। সোমবার সন্ধে বেলায় দেখি নিউজ ফিড ভরে গেছে নোটিফিকেশনে। ইরা ওয়েডস শাহেদ। তবে কি সেদিন ওই কথা বলতেই ইরা আমাকে ফোন করেছিল? এত কথা বলল কিন্তু ওই কথা বলতে পারেনি আমাকে। বোধ হয় জানতে চাইছিল শাহেদ আর আমার যোগাযোগ আছে কি না।

আমি যেমন একদিন আহসানের হাত ধরে শাহেদকে একা ফেলে চলে এসেছিলাম তেমনি আজকে নিজেকে একা মনে হচ্ছে। আহসানের একটা লেট মিটিং আছে। আমাকে আগেই জানিয়েছে ওর ফিরতে দেরি হবে। এখন মনে হচ্ছে ও বাড়ি থাকলেই ভালো হতো। আমি বার কয়েক ওকে ফোন করলাম। ধরল না। একটা মেসেজ দিল ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরছে।

গল্পের বইয়ে একটা কথা পড়তাম ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। তেমনি আমার মধ্যে ঝুপ করে মধ্যবিত্ত ক্লিশে জেঁকে ধরে। লাইব্রেরিতে আহসানের টেলিস্কোপ খুঁজতে থাকি। নাহ আজকে শুকতারা দেখা যাচ্ছে না। নিয়ন আলোয় আলোকিত টরন্টোর আকাশ আজকে আমাকে হতাশ করে।

কানে যেন হিংসুটে গলায় অঞ্জন দত্ত গেয়ে যান:
‘আজ যাও তুমি কোথায় চলে রোজ রাত্তিরে মনের ভেতর ঘুমের ঘোরে
তোমার সাজানো শরীরের ভেতরে, মালা তুমি কে, তুমি কে?’
*লেখক: ফারহানা সিনথিয়া, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, ক্যালগারি কানাডা

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন