বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মাসির দোতলা বাড়ির নিচের তলায় ঠাকুর ঘর, ওই ঘরেই মাসির ছেলের পড়ার ঘর,একটু সামনে এগিয়েই টিভি ঘর আর আমাদের আড্ডার ঘরও বলা যায়। অপর পাশে ওদের বেডরুম আর রান্নাঘর। ওপরে একটা ঘর রয়েছে, যেখানে অনায়াসেই বিছানা পেতে যে কেউ শুতে পারবে। রাতে কারেন্ট চলে গেলে আমরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে ওপরের ঘরেই চলে যেতাম। আহা! সুশীতল বাতাসের সঙ্গে শীতলপাটিতে শরীর এলিয়ে দিলেই হলো। ব্যস! কখন অঘোর ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছি মনে নেই।

আসি মূল পূজাবাড়ির কথায়—এটাকে দুর্গাবাড়িও বলা যায়। মজুমদারবাড়ির দুর্গাবাড়ির ইতিহাস পুরোনো। দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে তাদের পূর্বপুরুষেরা দেবীর ঘট এখানে প্রতিষ্ঠা করেন। এদের ঠাকুরঘরে সারা বছর মায়ের প্রতিমা থাকে। কাজেই যখন যাওয়া হতো, মায়ের দর্শন করা যেত। প্রতিবছর প্রতিমা বিসর্জন হতো আগের বছরেরটা। নতুন মায়ের প্রতিমা ঠাকুরঘরে রয়ে যাবে সারা বছর। এটাই এ বাড়ির পূজার নিয়মের বিশেষত্ব। একচালা ঠাকুরের ঘর আর সাদা পূজা হয় এখানে।

পূজার চার দিন ভিন্ন ভিন্ন পদের নিরামিষ রান্না হবে আর দশমীর দিন আমিষভোজন। সকালে ফলভোগের থালা সাজানোর রয়েছে আলাদা নিয়ম। শুধু বাড়ির লোকেরাই তা করে থাকে। নিরামিষ ভোজনের মধ্যে প্রথম দিন অর্থাৎ সপ্তমীর দিন ডাল, নিরামিষ সবজি, আর কয়েক রকমের ভাজা—বেগুন, আলু, মিষ্টিকুমড়া, অষ্টমীর দিনে সবজি খিচুড়ি আর ভাজি, নবম দিনে হতো সবজি ঘন্ট আর দশমীর দিন আমিষের আয়োজন হতো—মাছ, ডিম, মুরগি, চিংড়ি মাছের ঝোল। একটা কথা বলতে ভুলেই গেছি প্রায়—মিষ্টান্নের আয়োজন থাকত প্রতিদিনই—কোনো দিন পায়েস বা টক, আবার কোনো দিন মিষ্টি দই অথবা অম্বল।

দুর্গাঠাকুরের বাড়িতে খেতে বসে মনে পড়ে যায় তুলসীধাম আশ্রমের ভোগ প্রসাদের স্বাদের যেমন কোনো সংজ্ঞায়ন হয় না, তেমনি এ বাড়িরও স্বাদ অমৃততুল্য!
দুর্গাপূজায় অবিচ্ছেদ্য অংশ অখণ্ড প্রদীপ প্রজ্বালন আর সেটার তদারকির ভার কাউকে না কাউকে পালাবদল করে করতে হয়। অখণ্ড প্রদীপের দায়িত্ব একেক দিন একেকজনের ভাগে পড়ে। আরেকটি বিশেষ ব্যাপার হচ্ছে মঙ্গল প্রদীপ দশমীর দিন মূল পূজার দালানঘর থেকে ওনাদের আদিঘর যেখানে বাদবাকি সরঞ্জাম থাকে, সেখানে সরিয়ে নেওয়া হতো এবং খুবই সাবধানের সঙ্গে। যদি কোনো কারণে বাতি নিভে যায়, তাহলে সেটাকে অমঙ্গলকর বলে ধরে নেওয়া হয়। তাই যার দায়িত্ব পড়ত, তাকে সব দিক থেকে চোখে চোখে রাখত সবাই। রাত জেগে ওটা পাহারা দিতে দিতে চণ্ডীপাঠ পড়া, তা–ও একেবারে ব্রাহ্ম মুহূর্ত পর্যন্ত! মন জুড়িয়ে যাবে যে কারও।
পাড়া বেড়ানোর কথা বলতে গেলে মাসির বাড়ির পাশাপাশি রয়েছে কালীবাড়ি।

ওখানেও পূজা হচ্ছে! প্রতিমা দর্শন ওখান থেকেই শুরু হবে। তারপর পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো। মেলায় গিয়ে মিষ্টি গজা, বাতাসা, নকুলদানা, কদমা, হাওয়াই মিঠাই, মাখানো ঝাল মুড়ি আর ফুসকা চটপটি তো আছেই! পাড়া ঘুরতেই খাবার ভাগাভাগি করে খেয়ে নিতাম আমরা। শরতের আকাশে সূর্যের তেজ থাকে বেশ। তাই বেশ কিছুক্ষণ ঘোরার পর এক জায়গায় লোকনাথ বাবার আশ্রম দেখতে পেয়ে দলবল সবাই ঢুকে পড়লাম। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে। তাই পুরোহিত মশাইকে দেখতে পেলাম না। বাইরে মন্দির প্রাঙ্গণে কিছুক্ষণ বসে রবি কিরণের তেজ কমতি দেখে আবার যাত্রা শুরু হলো।

থিমকেন্দ্রিক পূজার বেশ চলন থাকলেও এখানে দূর গাঁয়ে সাবেকিয়ানার ছাপ দেখে বড় ভালো লাগছে। মনে পড়ে যাচ্ছে যখন আরও ছোট ছিলাম, তখন বাড়ির পাড়া বেড়ানো পূজায় প্রতিমা ঠাকুর দেখতাম আর গুনে যেতাম কয়টি প্রতিমা দেখলাম। একবার মনে পড়ে, গোনা শেষ হয়েছিল চৌদ্দতে এসে! বিকেলে শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলত ওই অভিযান! একটা ট্যাক্সি রিজার্ভ করে...দে ছুট!
এখানকার পাড়া বেড়ানোয় অবশ্য সেটার প্রয়োজন হচ্ছে না, পূজা প্যান্ডেলগুলো পাশাপাশি।

পাড়ার পূজা দেখা শেষ করে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। সন্ধ্যায় মাসির বাড়ির দুর্গা ঠাকুরের সামনে বাড়ির ছেলেমেয়েরা সবাই সন্ধ্যা আরতি করবে। চণ্ডী পাঠে শুরু হবে আরাধনা আর একে একে গান গেয়ে শেষ হবে। একেক দিন একেক আয়োজন হবে। নাচের আয়োজনও করবে বাড়ির মেয়েরা।

মন্দির প্রাঙ্গণে এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়, যখন সন্ধ্যাপ্রদীপ প্রজ্বালন করা হয় আর সমস্বরে সবাই গেয়ে ওঠে, ‘মঙ্গলদীপ জ্বেলে....অন্ধকারের দুঃখ আলোয় ভরো, প্রভু।’

পূজার প্রতিটি দিন স্বপ্নের মতো কেটে যেত, বলা বাহুল্য বেশ তাড়াতাড়িই। দশমীর দিন হরেক রঙের বাহারের দেখা মেলে, সবাই মনে হয় দোলখেলায় মেতে উঠেছে। আমি বাড়ির ছাদে চলে যেতাম আর নিচে সবার রঙের খেলার পাগলামি দেখতাম! যখন দর্পণ বিসর্জন হতো শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে কান্নার রোল পড়ে যেত। দেখে মনে হতো, মেয়ের বিয়ে শেষে তাকে বিদায় জানানো হচ্ছে। বাড়ির চারদিকের পরিবেশ কিছুক্ষণের জন্য কেমন যেন থমথমে হয়ে যেত।

দশমীর দিন কান্না পাওয়াটা আমার কাছে চিরকালই আশীর্বাদতুল্য! মায়ের সঙ্গে একমনে কথা বলতাম! (এখনো যখনই ইচ্ছা হয়, বলি!) একটা কথাই মাকে বলতাম, আজও বলি, ‘আগামী বছর আবার দেখা হবে তো, মা? সবই তো তোমার হাতে, মা। এ সুবিশাল জগৎ–সংসার তোমার হাতে গড়া, তোমার মায়ায় লালিত-পালিত। যাকে ইচ্ছা রাখবে আর যখন ইচ্ছা হবে ওপারের ডাক আসবে! যেভাবেই রেখো, সবাইকে ভালো রেখো, মা! হই না তোমার অধম সন্তান, তবু তোমার সন্তান। একচিলতে শান্তি তোমার কোলেই আছে!’

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন