default-image

দূর পরবাসের জীবনে দেশের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর খুদে বার্তা প্রেরণ। অবশ্য এটা দিয়ে অডিও বা ভিডিও কলও করা যায়, কিন্তু সময় বা পরিস্থিতির কারণে সেটা আর সব সময় করা হয়ে ওঠে না। সে ক্ষেত্রে খুদে বার্তা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। নিজের কাজ করতে করতে দেশের মানুষের খবর নেওয়া যায় এবং নিজেদের খবর দেওয়াও যায়। এমনই দুটো খুদে বার্তালাপ আজকে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাইছি।

এক.
প্রথমজন আমাদের কলেজজীবনের বন্ধু। যার সঙ্গে আমার কখনোই সরাসরি দেখা হয়নি, কিন্তু ফোনে কথা হয়েছে কয়েকবার। আর কলেজ পাস করার পর দুজনে দুই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়াতে আর সাক্ষাতের সুযোগও তৈরি হয়নি। কিন্তু একই প্রজন্মের হওয়াতে বোঝাপড়াটা দারুণ। ওরা স্বামী স্ত্রী দুজনেই বাংলাদেশের একটা সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে সেখানেই কর্মরত আছে। আর দুজনের মানসিকতায় মিল থাকার কারণে বার্তালাপটা হয় আরও বেশি অর্থবহ। পাঁচ বছর পর এবার ডিসেম্বরে দেশে যাওয়ার টিকিট করা ছিল। কথা শুরু হলো সেটা নিয়েই।

বিজ্ঞাপন

আমি: কেমন আছ?

বন্ধু: আলহামদুলিল্লাহ। তোমরা ভালো?

আমি: আমরাও ভালো আছি। এবারও দেশে আসা হলো না আমার। টিকিট করা ছিল আগাম।

বন্ধু: দুঃখ কোরো না। পরেরবার ইনশা আল্লাহ।

আমি: এবার আসাটা জরুরি ছিল। দেশ থেকে আসা পাঁচ বছর হয়ে গেল।

বন্ধু: হ্যাঁ।

আমি: কম সময় তো নয় বলো? ইদানীং কুষ্টিয়ার সবকিছু স্বপ্নে দেখি। ঘুম ভেঙে জেগে উঠে কুষ্টিয়া খুঁজি।

এই পর্যায়ে আমাদের আলাপটা একটু সিরিয়াস দিয়ে মোড় নেয়।

বন্ধু: একবার যাকে ছেড়ে গেছ তার জন্য আর এত কষ্ট কেন? ভালো দেশে ভালো আছ। সময় পেলে দেশকে দেখে যেয়ো। আর এখন তো দুঃসময়।

আমি: আমি জানি না কেন এমন হয়? মাকে তো কখনো বলিনি তোমাকে ভালোবাসি, তবুও অসুস্থ হলে সবাই আগেই আমরা মায়ের নাম নিই। ব্যাপারটা সে রকম।

বন্ধু: সেই মাকেই তো ছেড়ে আছ এতটা সময়?

আমি: দুঃখটা সেখানেই। হয়তোবা মাঝেমধ্যে মায়ের ওপর বিরক্তও হই, কিন্তু ভালোবাসাটা মনের গহিনে ঠিকই আছে।

বন্ধু: শোন, আমার যেটা মনে হয় এখন। মাকে ভালোবাসি বলিনি। মাকে প্রতি পনেরো দিনে দেখতে যাইনি। ছয় মাস পরে দেখতে গেছি। মুখে মুখে মাকে আমি অনেক ভালোবাসি। এই সব আসলে নকল ভালোবাসা। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে বলা, জানো মা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি। এটাও নকল।

আমি: হয়তোবা, কিন্তু দিনের একটা সময় ঠিকই কিন্তু মাকে তুমি অনুভব করবে।

বন্ধু: ভালোবাসা মনের মধ্যে পুষে রাখলে হয় না। তার চর্চা করতে হয়। তুমি যদি মেয়ে বা ছেলে হিসেবে মায়ের দায়িত্ব পালন না করতে পারো, তাহলে কী লাভ এই ভালোবাসার? আমরা সন্তানেরা বড্ড স্বার্থপর। আমরা নিজেদেরটাই বুঝি শুধু। আমাদের ছেলেমেয়েরাও তা–ই করবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

এরপর মেজাজ আরও একটু চড়িয়ে বন্ধুটি বলে যায়, ইয়াকুব সাহেব, তুমি কি মনে করো অস্ট্রেলিয়া বসে তার মায়ের কথা ভাবলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? আমি তো পারিনি আমার মায়ের সেবা করতে, দায়িত্ব পালন করতে। এখন তো আর শত চাইলেও সেটা পারব না।

আমি: এই কথাটা সেদিন এক বন্ধুকে বলছিলাম। এতটা শিক্ষিত না হলেও হয়তোবা পারতাম। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হলেই বরং ভালো করতাম। অন্তত পক্ষে প্রিয়জনদের পাশে থাকতে পারতাম।

বন্ধু: মায়ের সঙ্গে রাত–দিন কথা বলা। মায়ের সব চাহিদা পূরণ করা, চিকিৎসা করানো এগুলোর সবই আমি করতাম, কিন্তু মায়ের আসল চাহিদা ছিলাম আমি, আমার উপস্থিতি। এটা আমি বুঝিনি।

আমি: খুব সত্যি কথা বলেছ। উনারা সচ্ছলতা চান না। চান শুধু প্রিয় মানুষের একটু ছোঁয়া, একটু পাশে থাকা।

বন্ধু: আমার এক সহকর্মী আছেন। প্রতি সপ্তাহে তাঁর মাকে দেখতে যান। সামান্য বেতন পান। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন না। এই করোনার সময়েও প্রাইভেট কার ভাড়া করে মাকে দেখতে যান। মাকে একবেলা ইনসুলিন দিয়ে দেন। তার কী যে সন্তুষ্টি।এরপর কথা আরও এগিয়ে যায়। প্রসঙ্গক্রমেই দেশমাতৃকার কথা চলে আসে।

‘মাঝে মাঝে দেশের ওপর খুব অভিমান, রাগ হয় যখন প্রাপ্য সম্মান পাই না এবং চারদিকে শুধু দুই নম্বরি আর দুর্নীতিবাজদের দেখি। শুধু প্রিয়জনদের কাছাকাছি থাকার জন্যই হয়তোবা দেশে পড়ে আছি।’

এরপর আসে ব্যক্তিগত কাজের প্রসঙ্গ।

‘আমার স্বামীকে দেখি প্রতিদিন অন্যদের দ্বারা অপমানিত হতে তবুও সে তার বাবা–মাকে ফেলে কোথাও যাবে না। এমনকি বাসার অন্য তলাতেও যেতে রাজি না।’

আমি: খুব ভালো করেছেন। এমন ছেলে লাখে একটা।

বন্ধু: কিন্তু ওই যে কাজে সন্তুষ্টি নেই। রাত–দিন সে কষ্ট করে আর ফল অন্যরা পায়।

আমি: কিছু মানুষের কপালটাই এমন। সারা জীবন কষ্ট করবে আর ফল অন্যরা নেবে।

বন্ধু: আর আছে পরচর্চা। অন্যের ভালো কাজে বাধা।

আমি: মুশকিল তো সেখানেই। তবুও বাবা–মায়ের কাছে সেটাই আসল সন্তুষ্টি।

বন্ধু: রাত–দিন বিনা মূল্যে অপারেশন করে তাই যারা বেশি বেশি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে, তারা পেছনে লেগেই আছে। মাঝেমধ্যে ভেঙে পড়ে আবার মাঝেমধ্যে বলে যে যা করে করুক। আমি কী করলাম সেটাই আমার কাছে আসল।

আমি: খুব ভালো ভাবনা। ও ওর কাজটা করে যাচ্ছে ঠিকমতো। এটাই ওর সান্ত্বনা। আমি তোমাদের জন্য সব সময় দোয়া করি। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তোমরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে মানুষের সেবা করে যাচ্ছ।

বিজ্ঞাপন

দুই.

রাসেলের সঙ্গে পরিচয় আমার বন্ধু আমিনুরের মাধ্যমে। কলেজ পাস করে আমি ঢাকা চলে এলাম আর আমিনুর ভর্তি হলো কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগে। সেই বিভাগেরই জুনিয়র রাসেল। আমাদের কুষ্টিয়ারই ছেলে তবুও পরিচয় ছিল না, কারণ আমাদের স্কুল আলাদা ছিল। রাসেলের সঙ্গে পরিচয়ের পর ঘনিষ্ঠতা হতে সময় লাগেনি। আমাদের সময়ে কুষ্টিয়ার সবার সঙ্গেই আমরা কমবেশি পরিচিত ছিলাম। সেদিক দিয়ে রাসেল আবার আমাদের বন্ধু মান্নার ছোট ভাই চঞ্চলের ব্যাচের। এটা অবশ্য জেনেছি বেশ পরে। আমাদের দুজনের চরিত্রেই মারাত্মক রকমের দুরন্তপনা আছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা দুজন আবার প্রচণ্ড রকমের ঘরকুনো। আমরা দ্রুতই কোনো কিছুর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে ফেলি।

শৈশব–কৈশোরের বিশাল একটা সময় কুষ্টিয়ায় কাটিয়ে ঢাকায় পড়তে গিয়ে আমি প্রতি মুহূর্তে কুষ্টিয়ার সবকিছুকে খুব বেশি অনুভব করতাম। রাসেলের অবস্থাও অনেকটা তাই। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে জীবন ও জীবিকার টানে তাকে ঢাকা থাকতে হয়, কিন্তু মনটা পড়ে থাকে কুষ্টিয়াতে। তাই অস্ট্রেলিয়ায় আসার পরও ও যতবারই কুষ্টিয়া গেছে মোবাইলে ভিডিও কল দিয়ে আমাকে শৈশব–কৈশোরের নিত্যসঙ্গী গড়াই নদ দেখিয়েছে। অনেকেই জানেন না হয়তোবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’ এই গড়াই নদকে নিয়ে লেখা। আমরা কুষ্টিয়ার মানুষ আসলেই খুবই সৌভাগ্যবান যে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালনের মতো মানুষের চরণ ধূলি পেয়েছি। সম্প্রতি রাসেলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল খুদে বার্তার মাধ্যমে।

আমি: কেমন আছ তোমরা?

রাসেল: ভাই, মনের মধ্যে অশান্তি। কিছুই ভালো লাগে না।

আমি: আবার কী নিয়ে অশান্তি?

রাসেল: আর চাকরি করতে ভালো লাগে না ভাই। বাড়ি যেতে মন চায়।

আমি: আহারে পাঁচ বছর কুষ্টিয়া যাই না।

রাসেল: মনে হয় নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকি। মাছ মারি। কলেজের পুকুর ঘাটে আড্ডা দিই। ঈদগাহে ক্রিকেট খেলি। সাইকেল নিয়ে রেনউইক বাঁধে যাই। মতি মিঞার রেলগেটটা কত দিন দেখি না। বদু দত্তের হোটেলটা আছে কি না, জানি না ভাই।

আমি: ছোটবেলায় আমরা মতি মিঞার রেলগেটে ঝুলে থাকতাম।
রাসেল: দধি ভান্ডারের দই–চিড়া। পুরোনো মানুষগুলোকে অনেক অনুভব করি ভাই। তাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ভুলি কেমন করে?
আমি: ঠিক তা–ই। একে একে সব হারিয়ে যাচ্ছে।
রাসেল: ভালো লাগছে না। এদিকে অফিস থেকেও ছুটি পাচ্ছি না। মনে হয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যাই। এভাবে বাঁচা যায় না। এভাবে বেঁচে থাকা মানে জীবনের সঙ্গে ছলনা করা। কত দিন খেজুরের রস খাই না। দুঃখিত ভাই, অনেক আবেগের কথা বলে ফেললাম।
আমি: আমরা সবাই সুখে থাকার অভিনয় করে যাচ্ছি।

রাসেল: আসলে এখন নিজের আবেগটাও মানুষ বুঝে প্রকাশ করতে হয়। আপনি কেমন আছেন?

আমি: ঠিক তাই। তুমি এই কথাগুলো অন্য কাউকে বললে ভাববে তুমি ভাব নিচ্ছ। সুখে থাকে তাই এই সব বিলাসী ভাবনা ভাবে। কিন্তু আমি জানি, তুমি ঠিক কেমন অনুভব করছ।

এরপর রাসেল রাস্তার মাঝে নির্মীয়মাণ কংক্রিটের একটা থামের ছবি দিয়ে লিখল, এই আমার প্রতিদিনের সকাল।

আমি: পুরো ঢাকাটা কংক্রিটের জঙ্গল হয়ে যাচ্ছে।

রাসেল: আপনার সঙ্গে ভিডিও কল করতে পারছি না। আমি নিশ্চিত আমি কেঁদে ফেলব।

আমি: এখন আমি ডেস্কে। সপ্তাহান্তে কথা হবে ইনশা আল্লাহ।

রাসেল: কবে বাংলাদেশে আসবেন?

আমি: ডিসেম্বরের টিকিট কাটা ছিল কিন্তু করোনা সব ওলটপালট করে দিল।
রাসেল: বাংলাদেশে করোনা নেই, চলে আসেন। হা হা হা।
আমি: তা–ও ঠিক।
রাসেল: আপনি আসলে জানাবেন। কুষ্টিয়াতে সাত দিন দুই ভাই মিলে ঘুরব। সকালে বের হব সন্ধ্যায় বাসায় ফিরব। আমার জন্য সাত দিন বরাদ্দ রাখতে হবে কিন্তু ভাই এবং সেটা অবশ্যই প্রথম দিকে।
আমি: অবশ্যই।
রাসেল: দোয়া রাখবেন।
আমি: ফি আমানিল্লাহ।

উপসংহার:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং খুদে বার্তাগুলো প্রবাসজীবনে এভাবেই দেশের মায়া বয়ে নিয়ে আসে। আর আমরা কল্পনায় চলে যাই আমাদের গ্রামের বাড়ির আঙিনায়। গ্রামের মাটির বাড়ির বাইরে রাস্তার ধারে গাছের ছায়ায় বাঁশের চাঙে শুয়ে অলস দুপুর পার করা। যেখানে নেই কোনো তাড়াহুড়ো। জীবন চলেছে দুপুরের অলস বাতাসের গতিতে এলোমেলোভাবে।

মন্তব্য করুন