এই নতুন দাদার সাত সৎ বোনের ছয়জনই মহামারিতে গত হয়েছিলেন। বিধবা এই মেহেরুন দাদিকে যখন প্রথম দেখি, তত দিনে তাঁরও বয়স হয়ে গেছে। ভীষণ অস্থির, শুচিবাইগ্রস্ত ও সন্দেহ প্রবণ ছিলেন এই ভদ্র নারী। দিনের মধ্যে ৮০ বার শানবাঁধানো ঘাট থেকে পা ধুয়ে আসতে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতেন। তারপর একটু করে হাঁটতেন আর পায়ের নিচের দিকের কাপড় ঝাড়া দিতেন, যাতে ধুলো ময়লা কিছু লেগে থাকলে সেগুলো যেন ঝরে যায়। কাউকেও বিশ্বাস করতেন না তিনি। মাকে কিছুটা করতেন, তবে পুরোপুরি নয়। দিনে অন্তত চারবার এসে মাকে বলতেন, ‘ও হামিদা, বাক্সটা একবার খোলো তো মা, হাঁসুলিটা, হাতের বালা দু’খান, আর টাকাগুলো ঠিকমতো আছে কিনা একবার দেখে যাই।’ মা খুবই বিরক্ত হতো। কিন্তু ‘গ্রামের সেরা বউ’ খেতাবটা নষ্ট হতে পারে, এই আশঙ্কায় আর মুখ খুলতে পারত না।

মার স্যুটকেসে নিজের মালপত্র ভালো করে পরখ করার পর প্রতিবারই ওই দাদি আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, ‘তা হ্যাঁ ভাই, ক’টা পাশ দিলি?’ জবাব দিতাম, ‘বুবু, আমি এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি।’ তিনি বলতেন, ‘তোরা হলি সব কলি কালের চ্যাংড়া, কথার উত্তর সোজাভাবে না দিয়ে কেবল প্যাঁচাস।...বলি ‘এন্টেরেন্স’-টা কি শেষমেশ পাস দিতে পেরেছিলি?’

আগের এনট্রান্স পরীক্ষার পরে নাম হয়েছিল ম্যাট্রিক, স্কুল ফাইনাল, মাধ্যমিক, এসএসসি ইত্যাদি। তাই বলি বুবু, ওসব তো অনেক আগেই...। আমাকে সপাং করে থামিয়ে দিয়ে ওনার হুংকার, ‘চুপ, বেয়াদপ ছেলে, মিথ্যাবাদী। বললেই তো হয় যে, অনেকবার চেষ্টা করেও পাস দিতে পারিসনি। আমি জানি ওটা শক্ত, অনেকে সারা জীবন চেষ্টা করেও পারে না। তা বলে এই বয়সে এত বড় মিথ্যা কথা? বদ-দোয়া আমি দিতে চাই না। তবে আল্লাহ না করুক, আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, বড় হয়ে তুই এক নম্বরের ফেরেব্বাজ আর জালিয়াত হবি।’

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন