default-image

২০১২ সালের ২ জানুয়ারি দিবাগত রাতে কোরিয়ার স্থানীয় সময় ভোর পাঁচটায় বাংলাদেশ থেকে আসা একটি ফোনে আমার ছন্দময় জীবনের গতি পাল্টে গেল। অবিশ্বাস্য, অপ্রস্তুত ফোনটি আমার অনুজ নোমানের, আমি এপার থেকে ফোন পিকআপ করার সঙ্গে সঙ্গেই কান্নারত কণ্ঠে আমায় বলল, তোমার কোরিয়া থাকার আর প্রয়োজন নেই, আমি প্রশ্ন করলাম কেন? কী হলো? প্রতি উত্তরে সে জানাল, যার জন্য তুমি, যিনি  তোমার পৃথিবী।

সেই ত্রিভুবনসম মা আর নেই। পৃথিবীর বুকে মাথা ঠেকিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম জান্নাত থেকে উৎসারিত শব্দ পুণ্যে হৃদয়-মন অমিয় সুধায় প্লাবিত মা আর নেই, মা ডাকখানি আর দিতে পারব না।

বিজ্ঞাপন

আমাকে বাপ বলে কে ডাকবে? চোখে ভাসছে তুলনাহীনা মা। মায়ের সঙ্গে শেষ দেখার স্মৃতি, বাসার গ্রিলের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে ২০ মিনিট কেঁদেছিলেন, সেই শেষ দেখা, এই দেখাই শেষ দেখা, চোখে–মুখে ভাসছে, রুম থেকে বের হয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে, অসীম আবেগে স্রষ্টাকে বললাম হৃদয় নিংড়ানো মাকে, পবিত্র মা ডাকখানি কেন তুমি কেড়ে নিলে? সেই আরাধনার, আশ্রয়ের নিরাপত্তার বাতিঘর প্রিয় জনম দুঃখিনী মা আর নেই। আমি কষ্টাতীত এই দুঃসংবাদের জন্য কখনোই প্রস্তুত ছিলাম না, হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম। মনের গহিনে, বুকে চরম ব্যথা অনুভব করলাম। হঠাৎ আমার প্রাণের ছায়া চলে গেল, পায়ের মাটি সরে গেল। মন উজাড় করে কাঁদলাম প্রিয় মাকে হারিয়ে। কিছুক্ষণ পর অপ্রস্তুত দুঃসংবাদটি শুনে অজু করে নামাজে দাঁড়ালাম।

নামাজ শেষ করে এয়ার টিকিটের জন্য বন্ধু তারেককে সঙ্গে নিয়ে সিউলের উদ্দেশে রওনা হলাম, বিধিবাম সেদিন জুতসই কোনো টিকিট পেলাম না। যে টিকিটটি পেলাম, তা–ও সিউল থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগবে দুই দিন। কীভাবে মায়ের জানাজা পড়ব অহর্নিশ চিন্তায় পড়ে গেলাম, বাড়ি থেকে সৌদিপ্রবাসী আবু বক্কর ভাই ফোন করে বলল, কষ্ট করে তুমি আসিও না, দুই দিন তোমার আম্মাকে হিমঘরে রাখা ঠিক হবে না। আজকের দিনের ভেতর আসতে পারলে আসো। না পারলে আর আসিও না। বন্ধু তারেক আমাকে অনবরত সান্ত্বনা দিতে থাকল, কারও মা চিরদিন বেঁচে থাকবে না। বাঁচে না। তারেক আমাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলল, তোর মা তো আল্লাহর মেহমান, টেনশন করিস না। তারেক শান্ত চিত্তে জানাল, দুই দিন হিমঘরে রেখে মাকে কষ্ট দিস না, সবাইকে বলে দেয়, যেন তোর মাকে সহসাই দাফন করে ফেলে। মাকে হারিয়ে সত্যিই সেদিন থেকে আমি গরিব, চূড়ান্ত গরিব। আমার সবকিছু আছে, কিন্তু মা নেই। সে জন্যই আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, পৃথিবীতে যাঁর মা নেই, সে দরিদ্র। আমি মনে করি, যাঁর মা আছে, সে বিল গেটস।

আমার মা ছিল আমার দার্শনিক, চিন্তা মননের বাতিঘর। মা ছিল আমার নিরাপত্তার, আমার নিরাপদ আশ্রয়; জীবনের আঁধার, শীতল শান্তির প্রেরণার জায়গা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বিমূর্ত প্রতীক। আমার বিদগ্ধ মায়ের অকৃপণ স্নেহমমতা, অকৃত্রিম ভালোবাসায় আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা, শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যর জলমাখা জীবন কাটানো। সত্যি মাকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব, অসহায়। দহনে দহনে দগ্ধ, প্রতিদিন নিজেকে পুড়ি, ভুগি মায়ের শূন্যতা। মায়ের প্রত্যাশাহীন, প্রাপ্তিহীন নির্ভেজাল ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত আজ দুই হাজার পাঁচ শত পঞ্চান্ন দিন। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ তিনি আমার চোখেই আসেন, ভাসেন, তাঁর স্মৃতিগুলো খুঁজে ফিরি।

১০ মাস ১০ দিন পেটে ধারণ করে অসহনীয় কষ্ট, অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে যে মা আমায় জন্ম দিয়েছেন, তাঁর জন্য কিছু করতে না পারার বেদনা আমাকে তিলে তিলে পোড়ায়। আমার মা নিজে না খেয়ে আমাকে খাইয়েছেন, তাঁর ঋণ অপরিশোধ্য, অপরিমেয়। অনেকেই মায়ের সেবা করার সুযোগ পেয়েছে, দিল ভরা মায়ের দোয়া নিয়েছে, আমি তো নিতে পারিনি অসাধারণ, অমূল্য সম্পদ এই মা থেকে। কত দিন মায়ের সারল্যপনা মুখখানি দেখি না, অকৃত্রিম অমূল্য টাচি বাণী শুনি না, কত দিন, কত বছর হলো মাকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে পারি না। আর তো পারব না। মা তুমি; শৈশবে কত শৌর্য, কত সাহস জুগিয়েছিলে, নানা বিপদে সান্ত্বনা দিয়েছিলে, প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি সংকটে পাশে ছিলে। সারাক্ষণ দীক্ষা দিতে অসৎ আনন্দের চেয়ে পবিত্র কষ্ট আরামদায়ক।

বিজ্ঞাপন

সোফেক্লিসের মতো, তুমি বলতে আমি তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। তোমার সংসারের নোঙর। মা, আমি নই স্রষ্টা কর্তৃক, তুমিই ছিলে আমার শ্রেষ্ঠ উপহার, শ্রেষ্ঠ দান। মা, তুমি আমার দুচোখে দেখা পৃথিবীর সেরা মানুষ। তোমার জন্যই এ পৃথিবীতে আমার আগমন, তোমার হাত ধরেই একটু একটু করে পথচলা, জীবনকে বুঝতে শেখা, জীবনকে জানতে শেখা। প্রখ্যাত দার্শনিক মিচ অ্যালবোম বলেছিলেন, তোমার সব গল্পের পেছনে রয়েছে তোমার মায়ের গল্প, কারণ, সেখান থেকেই তুমি শুরু করেছ।

সত্যি আমারই সব গল্পের পেছনের প্রেরণাদায়ী উদ্ভাবক ছিলে তুমি। তুমি তো আমার চমৎকার অভিভাবক, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও অকৃত্রিম বন্ধু। মা, তুমি তো আমার সে মা, নিজে না খেয়েও আমাকে খাইয়ে দিয়েছ, দিন, মাস, রাত না ঘুমিয়ে আমার সুস্থতায় রবের কাছে ধরনা দিয়েছ, সেবা–শুশ্রূষা করেছ। মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে আমাকে চলতে শিখিয়েছ, অপরকে সম্মান করতে শিখিয়েছ। কোনো বিনিময় ছাড়া অন্যদের উপকার করতে শিখিয়েছ। প্রিয় মা, শাসন আর আদরে লেখাপড়া শিখিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে সবার সামনে কথা বলার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছ। মা, এখনো তোমার প্রেরণাময় বাণীগুলো জীবনের পাথেয় করে রেখেছি। সেই পথেই চলছি, সততাকে পুঁজি করে।

তুমিই শিখিয়েছিলে চিত্তবান মানুষ হতে। চিত্তবান হয়ে বেঁচে থাকতে চাই। মা, অনন্তকালের সেই খেয়ায় তুমি ভালো থেকো মমতাময়ী মা, লিংকনের ভাষায় বলি, আমি যা হই না কেন বা যা হওয়ার আশা করি না কেন, আমি সর্বদাই আমার স্বর্গীয় মমতাময়ী মায়ের কাছে ঋণী। আমার মায়ের প্রার্থনা সব সময় আমার সঙ্গে ছিল। বিমুগ্ধ বিশ্রুত একটা শব্দ মা। গভীরতায় শুধু নয় বর্ণনায় অসীম। যেন বিএন্ডলেস, বাউন্ডলেস বটমলেস সি। আমাদের দুই ভাইয়ের স্বপ্ন, সাফল্য, জুড়েই বীজ বুননের সুনিপুণ কারিগর তিনি। তিনি আমাদের পরম মমতার, স্নেহের, আস্থার, বিশ্বাসের অনন্য বাগিচা করিডর।

মন্তব্য করুন