গতকাল জ্যামে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে তরমুজ কিনে এনেছে রাফিদ। ইফতারে রত্নাকে বলে রেখেছে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করতে। সাহ্‌রিতে খাবে। তারাবিহর নামাজ পড়ে এসে সামান্য কিছু খেয়ে রাত ১১টার দিকে ঘুমাতে গেল সে। ১২টা বাজতে না বাজতেই মুঠোফোন বাজতে শুরু করল। রত্না ধড়মড় করে উঠে বসে লাইট জ্বালাতেই রাফিদ লাফিয়ে ফোন ধরল। ফোন করেছে শাহবাজ, গাড়িচালক। প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া করার কারণে তারা নাকি মারমুখী হয়ে তার বাসা ঘেরাও করেছে। শাহবাজ কাঁদো কাঁদো স্বরে যা বলল, তার সারমর্ম হচ্ছে নিজের জানের তার পরোয়া নেই। রাস্তা থেকে যে অসুস্থ কুকুরদের সে বাঁচিয়েছে, সেই কুকুরের চিন্তায় নাকি তার ঘুম হারাম। আসল কথা, কোনো এক সময় চালকের প্রতিবেশী শ্রমিকনেতাকে মহাবিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল রাফিদ। চালককে যেন উদ্ধার করা হয় ওই নেতা মারফত, সে জন্যই এ ফোন করেছে সে এত রাতে। শ্রমিকনেতাকে ফোন করে রাফিদের চালককে উদ্ধার করতে বলে ঘুমাতে যাবে, এমন সময় শ্রমিকনেতার ফোন, ভাইয়া, পিটাইয়া ছাল তুইলা দেব, না দৌড়ানি দেব? ‘দৌড়ানি দাও’ বলে রাফিদ ফোনের রিংগার বন্ধ করে দিল। ঘুমানোর আয়োজন করতেই জুম...ভাইব্রেশন, ফোন ধরতেই চালকের আকুল কান্না কৃতজ্ঞতাসহ হজম করতে হয়েছে তাকে।

default-image

কারণ, এই চালক নাটক ছাড়া জীবনে কোনো কাজ সহজে করতে পারে না। তার ছেলে দুবাইতে গেছে গত বছর। গ্রামের পেপার থেকে সে অমুক গ্রামের কৃতী পুত্রের বিদেশগমন বলে খবর ছাপিয়ে অফিসে সবাইকে বিতরণ করেছে। এ আমলে বিদেশগমন পেপারে ছাপতে হয়-জাতীয় কিছু বলতে গিয়ে চালকের প্রায় ছলছল চোখ দেখে রাফিদ ঢোঁক গিলে ফেলেছিল। রাস্তা থেকে কুকুর উদ্ধার করে সবাইকে এ গল্প বলে বলে বহু কাঁদিয়েছে সে। সঙ্গে টাকাও দান করেছে মানুষ। হায়রে নৌটাঙ্কি। যাক, ফোন বন্ধ করে দুইটার দিকে ঘুমাতে গেল সে।

রাত সাড়ে তিনটায় উঠুন, সাহ্‌রির সময় হয়ে গেল, সঙ্গে মাইকে গান শুনে ধড়মড় করে উঠে বসল রাফিদ। তার কাকতাড়ুযার মতো চেহারা দেখে একটু হাসি বা মায়া মাখা মুখ নিয়ে রত্না বলল, এসো, খেয়ে নাও। আজকে আর নামাজের পরেও ঘুমাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। খাওয়া শেষ হতে না হতেই বিনা মেঘে বজ্রপাত, মানে রত্নার মায়া মায়া মুখ রক্তবর্ণ ধারণ করল। কারণ, বিকেলে কেনা তরমুজ। তরমুজ পচা এবং তা থেকে পানি বের হয়ে পুরা ফ্রিজ সয়লাব। রত্না পরিষ্কার করছে আর রাফিদ পাশে দাঁড়িয়ে বালতি–সাবান টানাটানি করছে। রোজা না থাকলে রত্না নাকি পচা তরমুজের শরবত খাইয়ে ছাড়ত।

যাক, ফজরের নামাজের পর একটু ঝিমিয়ে নিয়ে অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নিল রাফিদ। চালক আজ এসেছে দেরিতে। গাড়ি উঠতে যাওয়ার মুখে হাসি হাসি চেহারা করে সাহ্‌রিতে গান গাওয়া গ্রুপের আগমন। ওরা মনে হয়ে পাশেই ঘাপটি মেরে ছিল। ভাইয়া, সাহ্‌রি সেবার টাকা দিয়ে দিন। রাফিদের আক্কেলগুড়ুম, এই অত্যাচারের জন্য টাকা? রোজা তো ১৫টাও শেষ হয়নি। এরা বলে কী? কঠিন মুখ করে ২০০ টাকা দিয়ে উদ্ধার পেল এ যাত্রা।

জ্যাম পেরিয়ে দুই ঘণ্টা পরে অফিসে পৌঁছাল সে। ঘুম না হওয়ায় ভুলেই গিয়েছিল সন্ধ্যার আগে কপালে চা নেই। কেউ কেউ বিশ্বাস করল না বলেই মনে হয়েছে ওর। যাক, সারা দিন কাজ করে বিকেলে এক সহকর্মীর কাছে জানল, মার্কেটের ভিড় বাদ দিয়ে এ বছর সবাই নাকি অনলাইন শপিং করছে।

অনলাইনে রত্নার জন্য শাড়ি, বাচ্চাদের লেহেঙ্গা আর পাঞ্জাবি অর্ডার দিয়ে মহানন্দিত হলো রাফিদ। যাক, এবারের মতো ঢাক্কাঢাক্কি করে ৫০ জায়গায় ঘুরে কাপড় কিনতে হবে না।

দিন চারেক পরের কথা। বিকেলে বাসায় ফিরতে ফিরতে কন্যা রুনির ফোন পেল সে। কন্যা ছাদে এসে ফিসফিস করে বলছে, বাবা, কী কাপড় অর্ডার দিয়েছ। এগুলো ছেঁড়া আর পুরোনো। আমরা এসব পরব না। মা খুব রাগ করেছে।

মুখ নিচু করে ইফতারের প্রায় আগে আগে বাসায় ঢুকতেই দেখল ইফতারে আজকে ছোলা–পেঁয়াজু। তারপর ইলিশ–ডাল আর সাদা ভাতও আছে। রত্না মিটিমিটি হাসছে, মনে হলো যেন গুনগুন করছে, ‘ভালোবেসে যদি সুখ নাহি, তবে কেন, তবে কেন মিছে ভালোবাসা’। তারপর বলল, যা যা করেছ গোটা রোজায়, আমাদের আর সবাইকে ভালো রাখতেই করা করেছ। আমার রাগের পেছনে ভালোবাসাটা বুঝবে না?

আহা বৈশাখী রমজান। শতকষ্টেও শতকোটি আনন্দ আপন মানুষগুলোর জন্যই।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন