default-image

প্রবাসে লাউতলায় বসে চা খাব, কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি; তা–ও আবার ইউরোপের মতো আবহাওয়ায়। যখন বাংলাদেশে ছিলাম, তখনো এটা চিন্তা করিনি। ৩০ বছর আগে আমি যখন বাংলাদেশে ছিলাম, তখন ছাদকৃষির তেমন প্রচলন ছিল না। তাই তখন এসব নিয়ে কখনো ভাবিনি। এরপর প্রবাসজীবনের শুরুতে পড়াশোনা এবং প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এ–জাতীয় ভাবনা খুব একটা মাথায় আসেনি। যখন একটু থিতু হলাম, তখন বাগান করা নিয়ে আস্তে আস্তে ভাবতে শুরু করলাম।

ইউরোপে তখন দেশীয় সবজির খুবই অভাব। তাই দেশীয় সবজি চাষ করার চিন্তা করলাম। প্রথমেই লাউ, শিম, পুঁইশাক, লালশাক, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, শসা, ধনেপাতা ও টমেটো দিয়েই শুরু করলাম। এসব সবজির বীজ আমার ছোট ভাই ও বোনের মাধ্যমে ঢাকা থেকে সংগ্রহ করে আনলাম। এরপর শুরু হলো সবজি চাষ। প্রথমেই বাদ সাধলো আবহাওয়া। ইউরোপে সাধারণত তিন মাস গরমকাল, এর মধ্যে যদি একটু বৃষ্টি হয়, তাপমাত্রা তখন আরও কমে যায়। তাই এইটুকু সময়ের মধ্যেই কীভাবে সব সবজি চাষ করা যায়, তা একটু ভেবেচিন্তে ঠিক করে নিলাম। চাষের জায়গা বলতে বারান্দার এক চিলতে মাটির অংশ।

বিজ্ঞাপন
default-image

এখানে বলে রাখা ভালো যে আমি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় থাকি। এখানে ৯ মাস ঠান্ডা আর ৩ মাস গরম। মার্চ–এপ্রিল মাসে অফিসের গ্রিনহাউসের ভেতরে বীজতলা তৈরি করে সেখানে বিভিন্ন সবজির চারা তৈরি করে নিতাম। ইউরোপে ২৬ মের আগে গরম আবহাওয়ার গাছপালা বাইরে লাগানো যায় না। কারণ, এই দেশের কৃষি ক্যালেন্ডারে ২৫ মে আইসম্যান বলে ঠান্ডা আবহাওয়ার একটি দিন আছে, যা ঘরের বাইরের গরম আবহাওয়ার গাছপালার জন্য অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমার যত দূর মনে পড়ে, প্রথম বছর শুধু শাকসবজি চাষ করেছিলাম। অনন্য স্বাদ আর ভালো ফলন হওয়ায় আমার উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। পরের বছর শাকসবজির পাশাপাশি লাউ, করলা ও শসা চাষ করলাম। সেই সময় (২০১২) ভিয়েনার একটি প্রধান সংবাদপত্র কুরিয়ার–এর আয়োজিত গ্রিনিং ইন দ্য সিটি শিরোনামে এক প্রতিযোগিতায় অংশ নিলাম। বারান্দায় উৎপাদিত লাউ, করলা আর শসা নিয়ে প্রতিযোগিতায় আমি গেলাম। আমার লাউয়ের মাচা, লাউ, করলা ও শসার ছবি পাঠিয়ে দিলাম। পরবর্তী সময় জুরিরা বেশ কয়েকবার আমার সাক্ষাৎকার নিলেন এবং সেগুলো কুরিয়ার নামে এই দেশের অন্যতম প্রধান সংবাদপত্রে বেশ কয়েকবার প্রকাশিত হয়েছে।

default-image

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো যে লাউ, করলা বাংলাদেশে খুব সাধারণ সবজি হলেও এই দেশে তা দুষ্প্রাপ্য। তাই অস্ট্রিয়ায় আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় এক্সোটিক সবজি হিসেবে ভিয়েনা থেকে আমি বিজয়ী হই। আমাকে ভিয়েনার ‘সিটি ফারমার’ হিসেবে সার্টিফিকেট দেন তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী। দুই মেয়ে এবং স্ত্রীও বাগানের কাজে আমাকে সব সময় সাহায্য করে। তাদের উৎসাহ দেখে আরও উৎসাহিত হই।

আসলে নিজের বাগানের গাছ থেকে সবজি আহরণের অনুভূতি যে কী রকম, তা শুধু যে করেছে সে–ই বুঝতে পারে। তারপর আবার যদি লাউতলায় বসে চা খাওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। ফুলে ভরা লাউয়ের মাচা, শিম ফুল আর হলুদ রঙের শসা ফুলের অপূর্ব দৃশ্য বারবার শুধু বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দেয়।

default-image

বাগানের সবজি আমার স্ত্রী সব সময় বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজনসহ সবার মধ্যেই বিতরণ করে। এতে একসঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারের মতো সবাইকে নিয়ে খাওয়ার আনন্দ পাওয়া যায়। এতে সবাই যেমন দেশের সবজি খেয়ে তৃপ্তি পায় আর আমিও দ্বিগুণ উৎসাহে পরবর্তী বছরের জন্য তৈরি হতে থাকি। করোনার সময়ে এটি ছিল আমার জন্য অনেক আনন্দের।

*লেখক: ডক্টর সোহেল আহমদ, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা, অস্ট্রিয়ায় কর্মরত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন