বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপা দুলাভাইকে একপ্রকার জোর করে রুম থেকে বের করে নিয়ে চলে গেলেন।
পরদিন বিকেলে রিমার ফোন পেলাম। ফোনে রিমা অনেকক্ষণ কাঁদল। রিমার কান্না শুনে খারাপ লাগলেও কান্নার কারণটি জেনে আনন্দ পেলাম। ঘটনা হলো, পিয়ার মা–বাবা পিয়ার সঙ্গে আমার বিয়ের ব্যাপারে অসম্মতি জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, বেকার কোনো ছেলের সঙ্গে তাঁদের মেয়ের বিয়ে দেবেন না। আমি মনে মনে পিয়ার মা–বাবাকে ধন্যবাদ দিলাম।

দুই ঘণ্টা পর রিমা আবারও ফোন দিল। এবারও কাঁদল। তবে এবারের কান্নাটা আগের কান্নার চেয়ে অনেক বেশি। আমি বারবার প্রশ্ন করার পরও এবারের কান্নার কারণ কী, সেটা সে আমাকে বলল না।

এরপর বেশ কিছুদিন চলে গেল, রিমার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমি নিজে থেকে অনেকবার কল দিয়েছি, কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পেয়েছি। ঠিক ছয় দিন পর হঠাৎ একদিন মাঝরাতে রিমার একটা টেক্সট পেলাম।

‘আগামীকাল বেলা ১টা ৪০ মিনিটে আমার ফ্লাইট। যদি পারেন, একটু এয়ারপোর্টে আসবেন।’

পরদিন আমি এয়ারপোর্টের ওয়েটিং এরিয়ায় উপস্থিত হয়ে রিমাকে মেসেজ পাঠালাম—‘আমি ওয়েটিং এরিয়ায় বসে আছি।’

ঘণ্টাখানেক পর দেখলাম রিমা ও পিয়ার দুই পরিবার এয়ারপোর্টে ঢুকছে। রিমা ঢুকেই আমাকে এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগল। একসময় আমাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল। চেহারা দেখে খুবই বিধ্বস্ত মনে হলো ওকে। সেই উচ্ছল মেয়েটির কোনো ছায়াই আমি ওর মধ্যে খুঁজে পেলাম না। পাশের আসনে বসেই রিমা বলল, কেমন আছেন?

ভালো। আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? এত দিন আপনার ফোন বন্ধ ছিল কেন?
রিমা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, আপনাকে অনেক কথা বলার আছে। কিন্তু হাতে সময় নেই। বাবাকে অনেক অনুরোধ করে মাত্র দুই মিনিট সময় পেয়েছি আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য।

default-image

এরপর লুকিয়ে একটা খাম আমার হাতে দিয়ে বলল, এখানে সবকিছু লেখা আছে। এখন খুলবেন না। বাসায় গিয়ে পড়বেন। ভালো থাকবেন বলে রিমা উঠে দাঁড়াল। আমিও দাঁড়ালাম। রিমা ধীরে ধীরে চলে যেতে লাগল। কিছু দূর গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকাল। তারপর একটা প্রাণহীন মিষ্টি হাসি দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।

আমি রিমাকে বহনকারী প্লেনটি ফ্লাই না করা পর্যন্ত এয়ারপোর্টেই থাকলাম। বাসায় ফিরে রাত আটটার দিকে রিমার চিঠি নিয়ে বসলাম।

‘ইমু, কেমন আছ? সরি, আমি বাংলা লিখতে পারি না, তাই পিয়াকে দিয়ে লেখাচ্ছি। আমি বলছি, পিয়া লিখছে। ইংরেজিতে লিখতে পারতাম, কিন্তু তুমি বলেছিলে তুমি ইংরেজিতে একটু দুর্বল।

‘আবারও সরি। কারণ, অনুমতি না নিয়ে তোমাকে তুমি করে বলছি।

‘আপুর জন্য পাত্র বাছাই করতে আমেরিকায় বসে প্রথম যেদিন তোমার ছবি দেখেছিলাম, সেদিনই তোমার প্রেমে পড়েছিলাম। প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল, এই ছেলেটাকে আমি বহুকাল ধরেই চিনি। মনে হয়েছিল, এই মানুষটা শুধুই আমার। তবে এ কথাটা কাউকে বলতে পারিনি। কারণ, তোমাকে তখন পছন্দ করা হয়েছিল আপুর জন্য।

‘দেশে আসার পর আমার স্টুপিড পরীক্ষার কারণে আপুর সঙ্গে তোমার বিয়েটা ভেঙে গেল, যার কারণে তুমি অনেক অপমানিত হলে। নিজেকে অপরাধী মনে হলো। তাই চেয়েছিলাম পিয়ার মতো একটা ভালো মেয়েকে তোমার জীবনে নিয়ে আসতে। অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু পিয়ার পরিবার রাজি হলো না। তখন মনে হলো, বিধাতাই হয়তো চাচ্ছেন তোমাকে আর আমাকে এক করতে। যেদিন পিয়ার পরিবার তোমার আর পিয়ার ব্যাপারে না বলল, সেদিনই মা–বাবাকে বললাম আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। তারা রাজি হলেন না। প্রথম কারণ, আমার পড়ালেখা এখনো শেষ হয়নি। দ্বিতীয় কারণ, বাবা বললেন, যে ছেলেকে এক মেয়ের জন্য রিজেক্ট করলাম, তার কাছে কেন অন্য মেয়েকে বিয়ে দেব? অনেক কাঁদলাম, অনেক যুদ্ধ করলাম, কেউ রাজি হলো না। তোমাকে জানাব, সেটাও সম্ভব ছিল না। বাবা আমার ফোন নিয়ে গিয়েছিলেন। বলতে পারো আমি অনেকটা গৃহবন্দী। আমি আমার মা–বাবাকে সম্মান করি, তাই এর প্রতিবাদ করিনি। আমাদের আরও কিছুদিন বাংলাদেশে থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাবা আমার কারণে সবাইকে নিয়ে আগেই চলে যাচ্ছেন। লিমা আপা অবশ্য আরও কিছুদিন থাকবেন।

default-image

‘একবার ভেবেছিলাম বাসা থেকে পালাব। তারপর তোমাকে বিয়ে করব। কিন্তু তিনটি কারণে সেটি করিনি।
‘১
‘আমার বয়স সতের বছর নয় মাস। আঠারো বছর হতে আরও তিন মাস বাকি। এই বয়সে পালিয়ে বিয়ে করলে তুমি আইনগতভাবে সমস্যায় পড়বে।
‘২
‘আমার বাবা একরোখা মানুষ। আমি পালালে সে তোমার ও তোমার পরিবারের কাউকেই ছাড়বে না।
‘৩
‘এই ৩ নম্বর কারণটাই সবচেয়ে বড় কারণ। আমি তো তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু আমি তো এখনো জানিনা তুমি আদৌ আমাকে ভালোবাসো কি না। তুমি আমার ভালোবাসা বোঝো কি না। অবশ্য আমার ভালোবাসা তোমার না বোঝারই কথা। কারণ, তুমি তো নিজেই বলেছ, তুমি গন্ডার। অনুভূতিহীন একজন মানুষ।

‘তুমি যখন এই চিঠি পড়ছ, তখন আমি তোমার থেকে অনেক দূরে, আকাশে প্লেনের ডানায় উড়ছি। তবে আমার মন পড়ে আছে তোমার মনের মাঝে। তুমি কি তা টের পাচ্ছ?

‘তোমাকে যে বলব আমার জন্য অপেক্ষায় থেকো, সেটাও বলতে পারছি না। কারণ, আমি এখনো জানি না তুমি আমাকে ভালোবাসো কি না।
‘একটা কাজ করো। তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো এবং তা যদি এখনই আমাকে জানাতে চাও, তাহলে তোমার বাসার ছাদে চলে যাও। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলো, “রিমা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।” আমি প্লেনের জানালায় কান পেতে আছি। তুমি বললে আমি ঠিকই শুনতে পাব।
‘ইতি
‘রিমা।’

রিমার কথামতো আমি ছাদে গেলাম না। কারণ, গিয়ে লাভ নেই। বাড়ির মালিক ছাদে যাওয়ার দরজায় সব সময় তালা দিয়ে রাখেন।

এখন রাত প্রায় বারোটা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম, দেখলাম জোছনার আলোতে পুরোটা শহর ভেসে যাচ্ছে। কাউকে কিছু না বলে চুপি চুপি বাসা থেকে বের হয়ে পড়লাম। ঠিক করলাম, এখন রমনা পার্কে যাব। তারপর দুলাভাইয়ের দাদার মতো জোছনায় গোসল করব। এরপর ভেজা শরীরে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলব, রিমা আমি তোমাকে ভালোবাসি। দেখি, বিচ্ছু মেয়েটি আসলেই আমার কথা শুনতে পায় কি না।

শেষ।

[email protected]

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন