default-image

ছোটবেলায় সব করতে চাইতাম। কেবল লিখতে বললেই দুনিয়া উল্টে ফেলতাম আমি। লেখার প্রতি কেন যে চরম বিতৃষ্ণা ছিল। আমি সত্যিই জানি না। পেনসিল ধরলেই ইঁদুরের মতো শুরু করতাম কামড়ানো। খাতা ভরে ছবি আঁকতাম, তবু লিখব না কিছুতেই।

আজ ভাবলেও হাসি পায়। এখন তো লেখা ছাড়া জীবন কল্পনাও করতে পারি না। ডান হাতটা একটু কাটলেও বিরক্তি লাগে যদি কলম ধরতে না পারি। আমার কলমবন্ধু আমায় কোনো দিন ধোঁকা দেয় না যে! যেকোনো হাসি–কান্না, আজ জীবনে যা কিছুই ঘটুক, সবকিছুতে কাগজ–কলম আমার সব সময়ের সঙ্গী।

তখন সম্ভবত সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী আমি। স্কুলের লাইব্রেরিতে ‘অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’ নামের একটা বই ছিল। যতবার নিতে গেছি, নাইরে ভাই...মানে...নাই তো নাই! এতই প্রিয় ছিল এ বই। বিশেষ করে স্কুলের সব মেয়ের।

কৌতূহল বাড়ল আমার। এমন কী আছে এ বইয়ে যে তা শেলফ ছেড়ে ছাত্রীদের হাতে হাতে ঘুরছে?

একদিন বড় বোনের কাছে বায়না ধরলাম, ওই বই আমার চাই। বইয়ের বেলায় আমার পরিবারে কখনো মানা ছিল না, কারণ আমরা সবাই কমবেশি বইপোকা ছিলাম।

‘অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’র পাতায় পাতায় শিহরণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পরিবার নিয়ে নাৎসি সেনাদের চোখের আড়ালে পালিয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ কিশোরীর দিনলিপি। তার পাওয়া না–পাওয়া, চারপাশের মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক ইত্যাদি ঘটনা।

মেয়ের মৃত্যুর পর বাবা অটো ফ্রাঙ্ক প্রকাশ করেন এই ডায়েরি। আজও এই বই বহুল পঠিত। সবার সঙ্গে থেকেও নিঃসঙ্গ অ্যানা জন্মদিনে পাওয়া ডায়েরিটিকেই বান্ধবী বানিয়ে নিয়েছিল। নাম রেখেছিল কিটি।

পঞ্চম শ্রেণির শেষ দিক থেকেই লেখার মায়ায় পড়েছিলাম। আর সে লেখা ছাপা হওয়া মানে তো যেকোনো লেখক-লেখিকার জন্যই উৎসব! অ্যানার কিটির সঙ্গে পরিচিত হয়ে কাগজে-কলমে লেখার আগ্রহ শাঁই করে আকাশে উঠে গিয়েছিল আমার। আজও তা আকাশেই আছে, মাটিতে নামাতে পারি না তাকে, চাইও না। আজ কাগজে–কলমে লেখার কিছু উপকারিতা তুলে ধরছি আমার পাঠকদের জন্য।

হাতের লেখা সুন্দর করে 
পাঠক হয়তো ভাবছেন, এই আধুনিক যুগে হাতের লেখা নিয়ে পড়েছি কেন? প্রযুক্তির কল্যাণে আজ হয়তো হাত ছাড়া যন্ত্রেই সব হয়। তবু সুন্দর হাতের লেখার গ্রহণযোগ্যতা সব সময়ই ছিল। আছে, থাকবেও আশা করি। চর্চার অভাবে দেখছি, আমার বাংলা হাতের লেখা কেমন একটু কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাংয়ের মতো হয়ে যাচ্ছে। এমনটি আপনার সঙ্গে ঘটতে দেবেন না, পাঠক! আজই চর্চা শুরু করে দিন।

যেকোনো কিছু আরও দ্রুত শিখতে পারবেন 
কম্পিউটারে কিছু নোট করার থেকে কাগজে নোট নিলে তা অনেক দীর্ঘ সময় মনে থাকে। তা ছাড়া যদি আপনার গল্প-কবিতা-উপন্যাস লেখার অভ্যাস থাকে, তবে একবার কাগজে লিখে নিয়ে তবে যন্ত্রে যান। তাতে আপনার সৃষ্টির মান আরও উন্নত হবে। সম্পাদনার কাজটিও কাগজে লিখলে ভালোভাবে করা যায়।

স্মৃতিশক্তি বাড়বে 
সব সময় কোনো কিছু পড়লে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেলার পরামর্শ দিতেন বাড়ির বড়রা। প্রথমে পছন্দ না হলেও কিছুদিন পরেই এর সুফল পেতে লাগলাম। পড়ার পর লিখে নিলে সহজে ভুলতাম না কিছু। এভাবে বইয়ের ভাষাকে নিজের ভাষায় লিখতেও শিখেছিলাম। এটা যে কী দারুণ পদ্ধতি, বুঝেছিলাম পরে নিজের ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে গিয়ে।

মস্তিষ্ককে সবল সচল রাখবে 
জানেন কি, আপনার মস্তিষ্ক যে অনেকটা মাংসপেশির মতো? কিছু চর্চা, যেমন অঙ্কের খেলা, শব্দজট, শব্দার্থ শেখা ও অবশ্যই লেখালিখি—এসবের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা বাড়বে। একটু বয়স্ক, অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি বেশ কার্যকর। এসব অভ্যাসে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা থেকেও বহু দূরে থাকতে পারবেন।

শুরু করবেন যেভাবে 
লেখা শুরু করতে চাইছেন, কিন্তু কলমে শব্দ আসছে না? ছোট থেকে শুরু করুন। যা মনে আসে, দুই-তিন লাইন লিখুন। নিজেকে কোনো প্রশ্ন করুন, সেটার উত্তর লিখুন। প্রতিদিন লেখার চেষ্টা না করে কয়েক দিন পরপর লেখা যেতে পারে।

যদি একাধিক ভাষা জানা থাকে, নিজের লেখাকে অনুবাদ করুন, তাতে ভাষার চর্চা, লেখার চর্চা—দুটিই ঘটবে। নিজের না–বলা কথাগুলো কাউকে বলতে পারছেন না? লিখে ফেলুন। অ্যানের ভাষায় বললে, ‘মানুষের চেয়ে কাগজের ধৈর্য বেশি’। এর সঙ্গে নিজের কথা যোগ করে বলি, কাগজকে হয়তো মানুষের চেয়ে বিশ্বাসও করা যায় বেশি। কী, বানাবেন নাকি কিটির মতো কোনো বান্ধবী-বন্ধু? বানিয়ে ফেলুন, ঠকবেন না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন