বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছুটি’ গল্পের ফটিককে না পেলেও আমার কৈশোরের ছাত্রজীবনে ফটিকের সাথে বন্ধুত্ব হয়। তাঁর নাম আহমদ মতিউর রহমান ফটিক। সে আমাকে নিয়ে যায় এক কল্পলোকে। বিস্ময়কর এক জগত উন্মোচন করে। এক পড়ন্ত বিকেলে এসে বললো, আয়, আমরা একটি ছড়ার সংকলন প্রকাশ করি। বললাম-আরে, তোর কি মাথায় ভূত চেপেছে? ফটিক বললো-তোকে এই এলাকায় অনেকেই চিনে। এজন্য তুই টাকার জোগান দিবি। আমি লেখা সংগ্রহ করে সাইক্লোষ্টাইল কপি করে সংকলন বানাব। তুই ছড়া লিখবি, আর আমার সাথে থাকবি। ‘নিউ মেট্রো সিনেমা’ হলের দক্ষিণে মুজিব হোটেলসহ প্রায় সব দোকানে গিয়ে টাকা চেয়েছি। ভাই, ছড়ার সংকলন বের করবো, ১০ টাকা দিতে হবে। ‘ঈদ মোবারক’ কাগজ ছাপিয়ে আলপিন দিয়ে বুকে গেঁথে দিয়েছি ঈদের দিন। এরপর অপরজন বাক্স এগিয়ে ধরেছি, টাকা সংগ্রহের জন্য। সাথে মহিউদ্দিন আকবরও (প্রয়াত) ছিল।

কলেজের পাঠ শেষ হবার পূর্বেই একদিন ফটিক হঠাৎ উধাও। ফটিক নেই, কোথায়? ওরা তো ঢাকায় চলে গিয়েছে। মগবাজার রেললাইনের কাছে একবার দেখা হয়েছিল অনেককাল পর। এরপর আর যোগাযোগ ছিলো না। গত তিন-চার বৎসর পূর্বে রামপুরার রাস্তায় দেখা হয়েছিল এক ঝলক। ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, নিয়েছে আবেগ।

বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ"। পরীক্ষার খাতায় নাম্বার পাবার জন্য বিজ্ঞানের পক্ষে-বিপক্ষে লিখেছি প্রচুর। মুঠোফোন পৃথিবীকে এনে দিয়েছে হাতের মুঠোয়। মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে আটলান্টিকের এপাড় থেকে মাসুদুল হাসান রণির সহায়তায় ঐপাড়ে আইমোতে ফটিক ধরাশায়ী হলো। পঞ্চাশটি বই-এর জনক ফটিক ভোরে তন্দ্রাজড়িত কন্ঠে বললো, সেই ছড়ার সংকলনের ১০/১২টি সংখ্যা আজো তাঁর সংগ্রহে আছে! ৪৫ বৎসর পূর্বের ছড়ার সংকলন ‘জিলিপি’ এতোদিনে তো পিঁপড়ায় খেয়ে ফেলার কথা! কি লিখেছিলাম ঐ জিলিপিতে? কৌতূহল নিয়ে বললাম-ছবি তুলে পাঠাও, দেখব। ফটিকের ইচ্ছা, সবগুলো জিলিপি একসাথে একটি সংখ্যায় প্রকাশ করবে নতুনভাবে। গল্পের ফটিক হারিয়ে গেলেও বিস্ময় নিয়ে ফটিক আবার ফিরে আসে জীবনে।

জিলিপির জন্য ছড়া লেখা দিয়েই আমার লেখালেখি জগতে প্রবেশ। আমার কাছে জিলিপি নেই, পিঁপড়ায় খেয়েছে সব! ফটিকের অপেক্ষায় রইলাম, কি লিখেছিলাম আমার কিশোর বেলায়? গতকাল ম্যাসেঞ্জারে ফোন দিয়ে জানলাম, খুঁজে পেয়েছে ধূলায় আচ্ছাদিত ৪৫ বৎসরের পুরাতন জিলিপি। যদিও সেসব আর মচমচে নেই!
অণু গল্প বাংলা সাহিত্যে নতুন নয়। কেউ, কেউ বলেন যে, ‘অণুগল্প সাহিত্যের একটা নতুন প্রশাখা’। বাংলা সাহিত্যে প্রথম অণুগল্প লেখেন বনফুল বা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৯ - ১৯৭৯)। তিনিই বাংলা সাহিত্যে অণুগল্পের জনক। ‘বনফুলের অণুগল্পের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি গল্পের ক্ষুদ্র অবয়ব ও রূপক - প্রতীকের ব্যবহার। গল্পের অবয়বকে কত ছোট ও ভাষাকে সরল করে জীবনকে কত বৃহৎ ও গভীরভাবে উপস্থাপন করা যায়, তা বনফুলই সর্বপ্রথম পাঠক সমাজকে দেখালেন।’ ( বনফুলঃ বাংলা অণুগল্পের পথিকৃৎ - আশরাফ পিন্টু)।

স্নাতকোত্তর পাঠ শেষে এক বিকেলে বন্ধু নজরুল আলম মিন্টু আমার লেখা পড়ে বললো-তোমার গদ্য ঝরঝরে, তুমি অণুগল্প লেখো। তারপর দিনই (১৯৮৫ সালে) তাঁর সংগৃহীত ছোট্ট একটি ম্যাগাজিন (সাইজ- সোয়া চার ইঞ্চি বাই পৌণে তিন ইঞ্চি) ‘পত্রানু’ (৬ষ্ঠ বর্ষ রবীন্দ্রসংখ্যা, মে-১৯৭৫, দাম-৩০ পয়সা, সম্পাদক: অমিয় চট্টোপাধ্যায়, টেগোর রিসার্চ ইনষ্টিটিউট কর্তৃক প্রচারিত) দিয়ে বললো- এটির অণুগল্পটি পড়ো। পড়ার পর বললাম, হ্যাঁ, ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরী থেকে বনফুলের অণুগল্প পড়েছি। মিন্টুর অনুরোধে ১৯৭৫ এর পর ১৯৮৫ সালে ‘ডুবসাঁতার’ লিখলাম। কারণ জিলিপির পর লেখালেখি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ফটিক কি নিয়ে গিয়েছিল তাঁর সাথে আমার লেখালেখির ভুবনটি? জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র অনুজ খালেদ হোসাইন (বর্তমানে ঐ একই বিভাগের অধ্যাপক) আমার বাসায় অণুগল্পটি পড়ে বললেন -এটি একটি কবিতা, ‘প্যাপিরাসে’র পরবর্তী সাহিত্য সভায় অণুগল্পটি নিয়ে আসবেন। ড. সৈকত আসগরের সভাপতিত্বে প্যাপিরাসের সাহিত্য সভায় ‘ডুব সাঁতার’ গল্পটি পাঠ করি। মোংলা পশুর নদী, হিরণ পয়েন্ট ভ্রমণ শেষে দ্বিতীয় অণুগল্প ‘অরণ্যে’ লিখি। বন্ধু, কবি রেজা ফারুক অণুগল্প দু'টি পড়ে বললো - এখনই চলো, ঢাকা যাই।

কাঁঠাল বাগানে অবস্থিত ‘শিল্পতরু’র অফিসে গিয়ে রেজা ফারুক কবি আবিদ আজাদকে (প্রয়াত) অণুগল্প দু'টি দিলেন। শ্রদ্ধেয় আবিদ আজাদ ‘ডুব সাঁতার’ ও ‘অরণ্যে’ অণুগল্প দু'টি ‘শিল্পতরু’তে (প্রথম বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা, আগষ্ট ১৯৮৮ ও দ্বিতীয় বর্ষ অষ্টম সংখ্যা, অক্টোবর ১৯৮৯) ছাপলেন। পরে আরও দুটি অণুগল্প লিখেছি।
কবি বন্ধু রেজা ফারুক বলল, আরে তোমার তো কবিতার হাত, কবিতাই লেখো। আমার কবিতার খাতার সেসব কবিতা রেজা ফারুক নিজেই বাছাই করে নিয়ে একটি যৌথ কবিতা সংকলন প্রকাশ করে, ‘সে কোনো পাথর নয়’।

১৯৮০ সালে ফটোগ্রাফি চর্চা শুরু করি। বিরতির পর ফটোগ্রাফি জগতে আবার প্রবেশ। ছবিই আমার ধ্যান, জ্ঞান। শ্রদ্ধেয় এম, এ, বেগ স্যার বললেন, আপনি বাংলার ছাত্র। ফটোগ্রাফি নিয়ে লিখুন। বেগ স্যারের অণুপ্রেরণায় ফটোগ্রাফি নিয়ে লিখি, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। ভারত থেকে বই প্রকাশিত হলো।
সাহিত্য সংগঠনগুলো লেখক সৃষ্টির ক্ষেত্রে অনবদ্য ভূমিকা রাখছে। আশির দশকে আমার লেখা নিয়ে ‘প্যাপিরাস’ ও ‘প্রগতি সাহিত্য পরিষদের’ সাহিত্য সভায় গিয়েছি।

১৯৯০ এর পর গত ৩০ বৎসর অণুগল্প আর লিখিনি। আমার অণুগল্পের পথ প্রদর্শক, জীবনানন্দ গবেষক, বন্ধু নজরুল আলম মিন্টু আটলান্টিকের ওপার থেকে ফোনে বললো, ফটোগ্রাফিতে গিয়ে ভালোই করেছো, কিন্তু অণুগল্প না লিখে তুমি অবিচার করেছো, তোমার মেধার অপচয় করেছো। আমি চাই তুমি আবার অণুগল্প লিখো।
হার্ট এ্যাটাকের পর ধরাশায়ী হলে দুই সপ্তাহ বাসায় ছিলাম। ত্রিশ বৎসর পর আবার নজরুল আলম মিন্টুর অনুরোধে আমার অণুগল্পের জগতে প্রবেশ ও লেখালেখি শুরু। করোনাকালে পৃথিবী বিপর্যস্ত হলে গৃহবন্দি সময়ের পুরোটাই লেখালেখির ভুবনে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। এই স্বর্ণালি সময়ে দেড়শ' অণুগল্প, স্মৃতিচারণ, রম্য বিষয়ক ও মোবাইল ফোনে ফটোগ্রাফি চর্চা লিখেছি।

আহমদ মতিউর রহমান ফটিক, নজরুল আলম মিন্টু, রেজা ফারুক ও প্রয়াত বেগ স্যারের অণুপ্রেরণায় আমার লেখালেখির জগতে প্রবেশ। তাঁদের সবার জন্য শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে ইত্তেফাক পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেখি যে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উদ্যোগে এক পাঠচক্র চালু হবে। কেন্দ্রে এসে নিয়মানুযায়ী আবেদনের পর সাক্ষাৎকার পর্বে আনোয়ারা আপা বললেন - আমরা যা পড়াবো, তুমি তো আমাদের সিলেবাসের সব বই পড়ে ফেলেছো। পাঠচক্রের ক্লাসের শুরুতে স্যার বললেন - আমরা লেখক সৃষ্টি করতে চাই, এজন্যই এই পাঠচক্রের আয়োজন। প্রতিসপ্তাহে বিকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে বাংলামোটরে এসে ক্লাস সেরে বাসে রাতে বাসায় যাওয়া এবং পাঠাগারে গিয়ে বই সংগ্রহ কষ্টকর হওয়ায় সৃষ্টিশীলতার বিচ্যূতি ঘটে। নব্বইয়ের দশকে বাংলা একাডেমি লেখক প্রকল্প চালু করলে আবেদনের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বয়সের দৌঁড়ে পিছিয়ে যাই। "মেঘ দেখে করিসনে ভয় আড়ালে তার সূর্য হাসে"। সৃষ্টিকর্তা সূর্যের আড়াল থেকে হয়তো বলছেন - তুই জানিস না, তোর সৃষ্টিশীলতাকে বেগবান করার জন্য সূর্যের আড়াল থেকে আমিই ঐ চারজনকে দূত হিসাবে পাঠিয়েছি।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন