বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম প্রকাশ প্রসঙ্গে তৎকালীন কবি খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিন লিখেছেন, ‘মনে আছে, সেদিন আমাদের তরুণ মনে কী আবেগ, উন্মাদনা জেগেছিল! সারা বাংলাদেশ যেন আনন্দে, উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। পথে, ঘাটে, রেস্তোরাঁয়, চায়ের বৈঠকে শুধু এ কবিতারই আলোচনা চলছিল। তরুণ সমাজ তো বিদ্রোহীর ভাষায় বাক্যালাপ শুরু করে দিল। যুবসমাজের আড্ডায় বা রাস্তায় একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে কবিতার কোনো একটি লাইন আউড়ে সম্বোধন করছে। যেমন ‘আমি চেঙ্গিস, আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’—উত্তরে হয়তো আরেকজন বলছে, ‘আমি চির-বিদ্রোহী—বীর, বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির।’

‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলার যুবসমাজকে যেমন অনুপ্রাণিত করেছিল, তেমনি বিপ্লবীদের কণ্ঠে দিয়েছিল ভাষা এবং মানুষের মনে জাগিয়েছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনা।
কবি বুদ্ধদেব বসু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এ কথা সত্য যে রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ভাষায় নজরুলই প্রথম মৌলিক কবি। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে রবীন্দ্রনাথের পথ ছাড়াও অন্য পথ বাংলা কবিতায় সম্ভব।’

কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘পূর্বের কিছু রচনা রসিকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়ই নজরুল সমস্ত সাহিত্যজগতের কাছে সচকিত স্বীকৃতি যেন সবলে আদায় করে নেন। প্রাপ্য বিচারে ‘বিদ্রোহী’র মূল্য সকলের কাছে সমান না–ও হতে পারে, কিন্তু তদানীন্তন যুগমানসকে প্রথম এই কবিতার মধ্যে প্রতিবিম্বিত করেছে, এ কথা বোধ হয় কেউ অস্বীকার করবেন না।’

সমিল মুক্তক মাত্রাবৃত্ত ছন্দে ‘বিদ্রোহী’ রচিত। বাংলা ভাষায় নজরুলই এই ছন্দের প্রবর্তক। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় অস্থিরভাব আর উদ্যম আবেগ প্রকাশের জন্য এমন ছন্দই অপরিহার্য ছিল। হাবিলদার কবি নজরুল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে ‘বিদ্রোহী কবি’ আখ্যায় ভূষিত হয়েছেন। এ সৃষ্টি নজরুলকে অধিষ্ঠিত করেছে বাংলার অন্যতম মৌলিক কাব্যস্রষ্টার আসনে। ‘বিদ্রোহী’ ৮টি স্তবক, ১৪৯টি পঙ্‌ক্তির একটি দীর্ঘ কবিতা। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি লেখা হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে কলকাতার ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়ির একটা ঘরে। সেখানে আমার দাদু কাজী নজরুল ইসলাম ও কাকাবাবু কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমদ এক ঘরে একসঙ্গে থাকতেন।

দাদু প্রথমে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি লিখেছিলেন এক রাতে পেনসিল দিয়ে। কারণ হিসেবে কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমদ লিখেছেন, ‘এ সময় নজরুল কিংবা আমার কারোর ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বারে বারে কলম ডোবাতে গিয়ে তাঁর হাত ও মন তাল রাখতে পারবে না। এ ভেবেই সে কবিতাটি প্রথমে পেনসিলে লিখেছিল।’ রাতের লেখার পর সকালে কবিতাটি দাদু পড়ে শোনান তাঁর বন্ধু মুজাফ্‌ফর আহমদকে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন প্রশংসা ও অভিনন্দন নজরুলের ভাগ্যে জোটেনি। খ্যাতির সঙ্গে ছিল সমপরিমাণ সমালোচনা ও বিদ্রুপ। ঈর্ষান্বিত হয়ে অনেকেই এ কবিতাকে নকল, আত্মগরিমাপূর্ণও বলেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কবি মোহিতলাল মজুমদার। প্রথমে তিনি নজরুলের ‘শাত-ইল-আরব’, ‘বোধন’, ‘নিকটে’ কবিতার প্রশংসা করে মোসলেম ভারতে চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি প্রচার করে বেড়াতে লাগলেন, তাঁর লেখা ‘আমি’ প্রবন্ধের ভাবসম্পদ নিয়ে ‘বিদ্রোহী’ রচিত এবং ঋণ স্বীকার না করে তা ছাপা হয়েছে। কিন্তু মোহিতলালের ‘আমি’ প্রবন্ধ ও নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বিভিন্ন স্তবক তুলনা করলেই মোহিতলালের দাবির অসাড়তা প্রমাণিত হয়।

এ কবিতা সম্পর্কে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতামত জানা যায় সজনীকান্ত দাসের আত্মস্মৃতি থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘“বিদ্রোহী” কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা মনে লইয়া একদিন বিকেলে মফঃসলিও মূঢ়তাসহ ভয়ে সত্যেন্দ্রনাথের সম্মুখে দাঁড়ালাম এবং সংকোচে মরিয়া হইয়া শেষ পর্যন্ত “বিদ্রোহী” সম্পর্কে আমার বিদ্রোহ ঘোষণা করলাম। বলিলাম, ছন্দের দোলা মনকে নাড়া দেয় বটে, ‘আমি’র এলোমেলো প্রশংসা তালিকার মধ্যে ভাবের কোনো সামঞ্জস্য না পাইয়া মন পীড়িত হয়। এ বিষয়ে আপনার মত কী? প্রশ্ন শুনে বোধ হয় সত্যেন্দ্রনাথ একটু অবাক হয়েছিলেন। পরে একটু হেসে বললেন, “কবিতার ছন্দের দোলা যদি পাঠকের মনকে নাড়া দিয়ে কোনো ভাবের ইঙ্গিত দেয়, তাহলেই কবিতা সার্থক।”’
‘শনিবারের চিঠি’র পূজাসংখ্যায় ‘কামস্কাতকীয়’ ছন্দে সজনীকান্ত দাসের ‘ব্যাঙ’ কবিতাটি ছাপা হয়। যেটি ‘বিদ্রোহী’র প্যারোডি। প্যারোডিটি এইরকম—
‘আমি ব্যাঙ, লম্বা আমার ঠ্যাং
ভৈরব রভসে বরষা আসিলে
ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাং
আমি সাপ, আমি ব্যাঙেরে গিলিয়া খাই
আমি বুক দিয়া হাঁটি, ইঁদুর-ছুঁচোর গর্তে ঢুকিয়া যাই। ….’

আমার দাদু কাজী নজরুল ইসলাম যখন এ প্যারোডি পড়লেন, রেগে না গিয়ে তিনি খুব মজা পেলেন ও হেসে গড়িয়ে পড়লেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। কয়েকবার পড়েই তিনি প্যারোডিটি আগাগোড়া মুখস্থ করে ফেললেন। তারপর প্রথম যেদিন আমার দাদুর সঙ্গে সজনীকান্তের দেখা হলো, নজরুল স্বভাবসিদ্ধ প্রাণখোলা হাসি হেসে, হাত বাড়িয়ে ওনাকে জড়িয়ে ধরলেন ও পুরো প্যারোডি আবৃত্তি করে শোনালেন। এভাবেই হেসে সজনীকান্তের মন থেকে বিদ্বেষের বাষ্পটুকু উড়িয়ে দিলেন। সেদিন থেকে তাঁদের মধ্যে যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, তা যে না দেখেছে, সে বিশ্বাস করবে না। গর্ব করে বলতে পারি, এমন ঘটনা ঘটানো আমার দাদু কাজী নজরুল ইসলামের পক্ষেই সম্ভব ছিল।

নজরুল যখনই নতুন সৃষ্টির আনন্দে মেতে উঠেছেন, তখনই গুরুদেবের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন এবং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথও তাঁর তরুণ ভক্তটিকে অকুণ্ঠচিত্তে আশীর্বাদ করেছেন। ‘বিজলী’ পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরদিন সকালে জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গিয়ে উচ্চ স্বরে তাঁকে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্তব্ধ ও অবাক বিস্ময়ে নজরুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। বললেন, ‘আমি মুগ্ধ হয়েছি তোমার কবিতা শুনে। তুমি যে বিশ্ববিখ্যাত কবি হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তোমার কবিপ্রতিভায় জগৎ আলোকিত হোক, ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করি।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুল ইসলামকে ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করায় ও উৎসর্গপত্রে নজরুলকে ‘কবি’ স্বীকৃতি দেওয়ায়, যাঁরা মৌমাছির মতো গুরুদেবকে ঘিরে থাকতেন, তাঁরা তা মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা লিখলেন—
‘বসন্ত দিল রবি
তাই তো হয়েছ কবি।’

নজরুলের লেখার ব্যাখ্যা করে রবীন্দ্রনাথ তাঁদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা নজরুলের কবিতা পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করোনি। অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছমাত্র।’ কেউ কেউ মন্তব্য করেন, নজরুল রচনার মার্ মার্ কাট কাট অসির ঝনঝনার মধ্যে রূপ–রসের প্রক্ষেপটুকু হারিয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ তার উত্তরে বলেন, ‘কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না, এ–ও তোমাদের আবদার বটে। সমস্ত জাতির অন্তর যখন সুরে বাঁধা অসির ঝনঝনায়, যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি হয়, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি। আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও ওই সুর বাজত।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনপ্রিয়তা কাব্যবিচারের স্থায়ী নিরিখ নয়। কিন্তু যুগের মনকে যা প্রতিফলিত করে, তা শুধু কাব্য নয়, মহাকাব্য।’
গোলাম মোস্তাফা লিখলেন—
ওগো ‘বীর’,
সংযত কর, সংহত কর
উন্নত তব শির।
বাঁধন-কারার কাঁদন কাঁদিয়া
বিদ্রোহী হতে সাধ যায়?
সে কি সাজে রে পাগল? সাজে তোর?
আপনার পায়ে দাঁড়াবার মত
কতটুকু জোর আছে তোর?

সর্বোপরি, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিদ্রোহী’কবিতা সম্পর্কে বলেছেন,
‘বিদ্রোহীর জয়তিলক আমার ললাটে অক্ষয় হয়ে গেল আমার তরুণ বন্ধুদের ভালোবাসায়। একে অনেকেই “কলঙ্কতিলক” বলে ভুল করেছেন। কিন্তু আমি করিনি। বেদনা-সুন্দরের গান গেয়েছি বলেই কি আমি সত্যসুন্দরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি? আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা-কলুষিত-পুরাতন-পচা, সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। হয়তো আমি সব কথা মোলায়েম করে বলতে পারিনি। তলোয়ার লুকিয়ে তার রুপোর খাপের ঝকমকানিটাকেই দেখাইনি, এ তো আমার অপরাধ?! এরই জন্য তো আমি ‘বিদ্রোহী’! আমি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, সমাজের সকল কিছু কুসংস্কারের বিধিনিষেধের বেড়া অকুতোভয়ে ডিঙিয়ে গেছি, এর দরকার ছিল মনে করে।’

শতবর্ষ পরও তাঁর এ বহুচর্চিত, সমালোচিত কবিতা, তাঁর বিদ্রোহী ভাবনা অশান্ত-অস্থির পৃথিবীর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আজও প্রাসঙ্গিক। আমাদের চেতনাকে আরও একবার জাগ্রত করুক, উজ্জীবিত করুক, এই কামনা রইল।
*লেখক: কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পৌত্রী

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন