বিজ্ঞাপন

আজকে বেশ খানিকটা বেলা থাকতেই তার কাজ শেষ হয়েছে। কিছুটা শীত শীত ভাব তখনো আছে, তারপরও কাজ একটু আগে শেষ হওয়ায় হেঁটে একটি পার্কের পথ ধরে গন্তব্য বাসার দিকে। পার্কের এক পাশ দিয়ে চলে গেছে রেললাইন, সেখানে আছে একটি পরিত্যক্ত উড়ালসেতু। সেতুটি মানুষ যাতায়াতে খুব একটা ব্যবহার হয় না। নিচ দিয়ে রেল যায় তাই ওপর দিয়ে সেতু, কোনো নদী–নালার জন্য এই সেতু নয়। বিকেলের আলো–ঝলমলে ক্ষণে সেই সেতুর পাশে বসে দুই পা ঝুলিয়ে দিয়ে খানিক বিশ্রাম করছে সাবুদ্দি। কখন যে চিন্তার ঘোরে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে, সে নিজেও জানে না।

বুকভরে বাংলা মায়ের সোঁদা মাটির গন্ধ নেবে। মনের অজান্তেই সাবুদ্দি ফিরে যায় সেই হাওরে ডিঙি নৌকায় সোনালি বিকেলে সাদা বকের সারির মধ্যে। আগে বকের কাছে গেলে নিঃশব্দেই উড়ে যেত মৃদু বাতাসের আঁচড় কেটে। কিন্তু আজ সাদা সাদা বকের ঝাঁক তাঁকে ঘিরে কী সুন্দর খেলা করছে, যেন কত যে পুরোনো বন্ধু, কাছে পেয়ে নির্ভার হয়েছে। কী যে সেই অপরূপ দৃশ্য! ওপরে নীল আকাশ, অদূরে মাথার ওপর ভাসছে কার্পাস তুলার মতো সাদা মেঘের ছাউনি, পশ্চিমে ছুটে চলেছে লাল টুকটুকে গোলক গাঢ় সবুজের পানে, সাবুদ্দি ভেসে চলেছে ডিঙির গলুইয়ে।

আসলে সাবুদ্দি মানুষটাও খুব ভালো। তার মনটাও ওই সাদা বকের চেয়েও সাদা। উপার্জনের পুরো টাকায় সে বাড়িতে পাঠাত। আশপাশের মানুষ আর নিকট আত্মীয় কেউ বলতে পারবে না সাবুদ্দির বউ আমিনার কাছে থেকে কেউ খালি হাতে ফিরেছে। আমিনাও খুব ভালো মনের মানুষ। মানুষকে দান–খয়রাত থেকে শুরু করে ধারদেনা খুব করে দিয়েছে। সাবুদ্দি বউকে বলে বাড়িতে কেউ এলে তাঁকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়ো না। হয়তো দান–খয়রাতের অছিলায় তার এই বিপদ কেটে যাবে। আমিনা তার কথা খুব মন দিয়ে শোনে। কখনো তার মুখ থেকে কথা টান দিয়ে নিয়ে নিজের কোনো বায়না ধরে না। সাবুদ্দি আমিনার কপালে চুমো দিয়ে বলে, কত দিন থেকে তোমাকে খুব কাছ থেকে আদর করা হয় না। যেমনটা আমাদের রান্নাঘরের শণের চালে চড়ুই পাখি নৃত্য করে। মনের দরজা খুলে সাবুদ্দি আমিনাকে আদর করতে চায়। হঠাৎ একজন পুলিশ নিঃশব্দে সাবুদ্দিকে ঝাপটে ধরে। অপ্রস্তুত সাবুদ্দির সংবিত ফিরে পায় এবং আশপাশে আরও কিছু রেস্কিউ পুলিশ দেখে সাবুদ্দি জ্ঞান হারায়। কে বা কারা যেন রেললাইনের ওপর পরিত্যক্ত সেতুতে সাবুদ্দিকে দেখে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বলেছে, এই জায়গায় কেউ একজন আত্মহত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখানে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিতে যতক্ষণ লাগে, ঘটনা স্থলে পুলিশ আসতে ততক্ষণ লাগে না!

default-image

সাবুদ্দির মনে ভয় তাকে পুলিশ ধরা মানে নিশ্চিত দেশে ফেরত পাঠাবে। এই পুলিশের ভয়ে কত রাত যে নির্ঘুম কাটিয়েছে, তার কোনো সীমা নেই। যে আশায় আশায় স্বপ্ন বুনে বেচে আছে সাবুদ্দি, আজ সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এই ভেবে সে বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার সাবুদ্দির সেবায় অস্থির—কখন তার জ্ঞান ফিরবে, সুস্থ হবে ইত্যাদি। একসময় যথারীতি জ্ঞান ফিরে সাবুদ্দি নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করে। আত্মহত্যার মতো এই মর্মান্তিক খবর নিতে চলে আসে মিডিয়া, মানবাধিকারকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে। কিছুটা সুস্থ হলে পুলিশ তার জবানবন্দি নেয়। কেন সে সেতুর ওপর থেকে ট্রেনের নিচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল? আত্মহত্যার পরিকল্পনা না থাকলেও পরিস্থিতি সামলে নিজের হতাশার কথা বলে। সাবুদ্দির জবানবন্দি, মনোবিজ্ঞানীর মতামত, মানবাধিকারকর্মীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ প্রতিবেদনে মানবিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সাবুদ্দির পক্ষে পুলিশ সুপারিশ আদালতে প্রতিবেদন আকারে পেশ করা হয়। চরম মানবাধিকারের বিষয় আমলে নিয়ে মহামান্য আদালত প্রণীত নির্দেশে ব্রিটেনের হোম অফিস সাবুদ্দিকে বৈধভাবে বসবাসের সুযোগ দেয়। সঙ্গে বন্দোবস্ত করা হয় সমস্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা, যা এক জীবনে সাবুদ্দির চরম ও পরম পাওয়া।
সব সময় দুঃস্বপ্নের তাড়নায় বড় অস্থির হয়ে থাকত। দেহ–মন কোনোটাই আর আগের মতো তেমন কাজ করতে পারত না। অস্ফুট বেদনায় কাতর হয়ে দেহে বেঁধেছে নানাবিধ রোগ। তবু আশায় থাকে সেই সোনালি দিনের জন্য আর ভাবে, অনেক কষ্ট করলাম জীবনে, যদি আর কয়েকটা দিন...বছর! অপেক্ষা করে যদি বৈধ বসবাসের কাগজ পেয়ে যায়, তাহলে হয়তো বাকিটা জীবন বেশ আরাম–আয়েশ করে কাটাতে পারব। জীবন–যৌবন সবই তো গেল, অন্তত শেষ বয়সে যদি নিরাপত্তার ব্যবস্থাটা হয় মন্দ নয়। হাজারো চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলেও আজ হঠাৎই কেমন যেন কল্পনাকে হার মানিয়ে বিনা মেঘে সুশীতল শান্তির বৃষ্টি বর্ষিত হলো।

আমিনার দীর্ঘ অপেক্ষার পালা বুঝি শেষ! এখন শুধুই মধুর মিলনের পালা। সাবুদ্দিওর মিলনের তর সইছিল না যেন! অনেক কিছু কেনাকাটা। ছেলে–মেয়ে, স্ত্রী, আত্মীয়–পরিজন, প্রতিবেশী, গরিব–দুঃখী সাধ্যমতো সবার জন্য কিছু না কিছু কিনেছেন। রঙিন যুগেও সাবুদ্দি খুব সাদামাটা। সে নরম সুতি কাপড়ের সাদা পাতলা পাঞ্জাবি–পায়জামা পরতে খুব পছন্দ করে। এখানে শীতের দেশে থাকায় তার পছন্দের কাপড় খুব একটা পরা হয়ে ওঠেনি। দেশে এখন গরমের সময় আসছে, তাই সে নিজের জন্য বেশ দাম দিয়ে একসেট সাদা ধবধবে পায়জামা–পাঞ্জাবি কিনেছে। বাড়ি যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। শুধু ফ্লাইটের তারিখটা আসতে যা কয়েকটা সপ্তাহ বাকি। সাবুদ্দির কাছে এই কয়েকটা সপ্তাহ যেন আগের ষোলো বছর থেকেও দীর্ঘ মনে হচ্ছে।

default-image

ইতিমধ্যে মহামারি করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক দেশের ফ্লাইট বন্ধ হলেও বাংলাদেশের ফ্লাইট নিয়ে এখনো কোনো সমস্যা নেই। করোনার ছোবল বাংলাদেশেও কামড়ে ধরেছে। রাষ্ট্রের কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তি করোনাভাইরাসের জন্য সরাসরিভাবে প্রবাসীদের দায়ী করা শুরু করল। যদিও করোনা বিশ্বব্যাপী সমস্যা, কিন্তু কে শোনে কার কথা। রীতিমতো প্রোপাগান্ডা সাধারণ জনমনেও এই ঘৃণার আগুন জ্বেলে দিল। যে প্রতিবেশী অথবা গরিব–দুঃখী মানুষগুলো প্রতি ঈদে বা কোনো দুর্যোগে প্রবাসীদের প্রতি হাত পেতে থাকত, সেই মানুষটিও এখন প্রবাসীর কথা শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে। শুধু তাদেরই–বা কী দোষ; করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মরলে তো নিজের মানুষ পর্যন্ত কাছে আসতে পারে না। তথ্যপ্রযুক্তির যুগ, দূরে হলেও সাবুদ্দি খবর পায় কিছু বিদেশফেরত কেমন বিধিনিষেধ ভঙ্গ করছে, আবার দেশের মানুষও কেমন বিরূপ আচরণ করছে। এগুলো দেখে সাবুদ্দির মন খুব খারাপ হয়ে যায়। এখনো যেহেতু বাংলাদেশে বিদেশ থেকে বিমান যাচ্ছে, তাই আশা করে থাকে সাবুদ্দি।

সাবুদ্দি আমিনাকে মোবাইলে বলে, ‘তুমি চিন্তা করিও না, আমি সময়মতো চলে আসব।’ এরপর সে ঘুমিয়ে যায়। লন্ডনের সময় খুব ভোরবেলা বাড়ি থেকে আমিনার ফোনকল আসে সাবুদ্দির মোবাইলে। হঠাৎ এত সকালে ফোন কল। তড়িঘড়ি করে সাবুদ্দি মোবাইল রিসিভ করে। আমিনা কিছু বলছে না। হাউমাউ করে শুধু কান্না করছে। সাবুদ্দির আমিনাকে সান্ত্বনা দিলে কান্না সামলে আমিনা বলে, ‘ওগো, তুমি এই সময় আর দেশে আসিও না।’ সাবুদ্দি বলে, ‘আমিনা, তুমি চিন্তা করিও না। কোনো সমস্যা হবে না।’

আমিনা বলে, ‘না, তুমি এখন কোনোভাবেই দেশে আসবে না। দেশের অবস্থা খুবই খারাপ।’ আমিনা কাঁদে আর বলে, ‘এলাকার লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এক প্রবাসীর বাড়িতে হামলা করছে। তারা বলেছে, যেকোনো বিদেশফেরতকে প্রতিহত করা হবে।’ সাবুদ্দি আমিনাকে বুঝিয়ে কান্না থামিয়ে রাখে। পরে সকালবেলা গণমাধ্যমে সবিস্তারে সংবাদ পায় বিদেশফেরতদের প্রতি ঘৃণ্য আচরণের। এদিকে সারা বিশ্ব করোনার প্রাদুর্ভাবে লকডাউন হয়ে যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা টু লন্ডন সমস্ত ফ্লাইট। তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে সাবুদ্দির জীবনাবসান ঘটে। চারদিকে মহামারি করোনার আক্রমণে প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। অনেক দেশে গণকবর দেওয়া হচ্ছে আবার অনেক দেশে পুড়িয়ে লাশের সৎকার করা হচ্ছে। আত্মীয়স্বজন ছাড়াই লাশের সৎকার করা হচ্ছে করোনারভাইরাসের প্রকোপে। কেউই জানতে পারেনি, সাবুদ্দির সবচেয়ে প্রিয় সাদা কাপড় কি তার অন্তিম সঙ্গী হয়েছিল?

*লেখক: মো. শামীম হোসেন, লন্ডন, যুক্তরাজ্য

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন