জিনাত-ফাতেমা এখন একসঙ্গেই কলেজে যায়। বাসে চড়ে মাইল সাতেক দূরের কলেজে গিয়ে ক্লাস করা ফাতেমার পক্ষে কঠিন হলেও সে হার মানে না। ফাতেমাকে সপ্তাহে পাঁচ দিন দুই দিক থেকে ধরে বাসে তোলে করিম আর জিনাত। ড্রাইভার-সাহায্যকারীরা বাঁকা চোখে তাকায়:

‘এই এত্ত মুটা মানসীরে বাসে চড়তি কইসে কিডা? দুই জনের সিট একজনের লাগে!’

করিম হা রে রে রে করে ওঠে: ‘ওই বে ডা কন্ডাক্টর, ওর জন্নি আমরা তিনজনের জাগায় চারজনের ভাড়া দেই, তাতে তোর এত্ত ডী কথা ক্যারে?’

কন্ডাক্টর ও পিছু ছাড়ে না: ‘আপনের এত্ত গা পোড়ে ক্যারে? কি লাগেন? ভাতার?’

আর সহ্য করতে পারে না জিনাত। সোজা পাঁচ আঙুলের দাগ বসিয়ে দেয় লোকটার গালে: ‘বাজে কথা কম কবেন, বুজসেন?’

আব্দুল করিম এবার মুখ খোলে: ‘ভাতার কলেন তো? শোনেন, উডা আমার বউ লাগে, বউ!’

ফাতেমা চমকে তাকায়: ‘কী হইল ইডা?’

জবাবে হাসে করিম: ‘ভুল কি কলাম তোরে?’

বিজ্ঞানের ফাতেমা আর মানবিকের জিনাত, দুজনই জানে লেখাপড়ার মূল্য। করিম ও ওদের সাথেই পড়ে। করিমের দোকানটা এখন একটু বড় হয়েছে। ওর সততা আর ভালো পণ্য অন্য গ্রাম থেকেও ক্রেতা টেনে আনে ওর দোকানে। আব্বাস আলী-নাজমুল আলী আপাতত কিছুদিন আনোয়ার মিয়ার বাড়ির আশপাশে ভিড়ছেন না। এমনি একদিন, আমেনা বেগম আর শরিফা বানু শাড়ি পরিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলেন মেয়েদের। জিনাতের লম্বা চুলে হাত খোঁপা করে তাতে প্লাস্টিকের ফুল কাঁটা গুঁজে দিলেন আমেনা। গোলাপি কাচের চুড়ি যেন নতুন রূপ দিল ফাতেমার ফরসা হাতকে।

‘ধরেন গো, মাইয়া গো নিয়া হেড স্যারেরে সালাম জানায় আসেন গা!’ খুকুকেও সাজিয়ে আনোয়ারের কোলে তুলে দিলেন আমেনা।

শরিফা বানু ওদের সঙ্গে আমের আচার দিতে চাইলে বাধা দেয় ফাতেমা: ‘আরে আম্মা আম্মা থামেন! স্যারে কেবল দিতি ভালোবাসেন, কিসুই নিতি চান না!’

অবাক হলেন শরিফা বানু: ‘কয় কী রে? আজিব মানুষ ডা তো!’

গ্রামের এই স্কুলটিতে ছাত্রীর চেয়ে ছাত্রের সংখ্যা অনেক বেশি। মিনহাজ হোসেন ছাত্রীর সংখ্যা বাড়াতে বাড়ি বাড়ি গিয়েও হতাশ হয়েছেন। সবার এক কথা: ‘মাইয়া মানসী শিকপি ঘরবাড়ির কাম আর বাচ্চা পালা। অত পইরে কী হবি গো? কেবল নিজির নামটুক লিখতি পারলিই হইল।’

কেবল জিনাত-ফাতেমাই একটু আলাদা। কৃষক-খামারি হয়েও ওদের বাবা মায়েরা লেখাপড়ার মূল্য দিতে জানেন। এই মেয়ে দুটিকে দেখে সব সময় গর্ববোধ করেছেন মিনহাজ।

স্কুলে নিজের অফিস ঘরটিকে নানা রকম বই দিয়ে সাজিয়েছেন মিনহাজ। গল্প, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনি, সব আছে। আর আছে খালি পাঁচ। খাতা, কলম, আর কিছু ছোট ছোট বই আছে। ছাত্র ছাত্রীরা চাইলে মাত্র পাঁচ টাকায় হেড স্যারের কাছ থেকে এ সব কিনে নিতে পারে। ছেলেদের একটু আগ্রহ দেখা গেলেও, মেয়ে রা পালায়।

‘স্যার, আসব?’ ডাক শুনে কাজ থেকে চোখ তুললেন মিনহাজ।

খুকু কোনো কথার তোয়াক্কা না করেই সোজা মিনহাজ হোসেনের পিঠে চড়ে বসল:

‘স্যার বালও, স্যার সুন্দর জামা দেসে।’

মোটেও বিরক্ত হলেন না মিনহাজ হোসেন, বরং ওকে টেনে কোলে বসিয়ে নিলেন:

‘ঈদ আসতিসে তো, আমি ঈদ ইর কাপড় দিসি তো গে। ক্যারে, আব্বা দিলি নিতি না?’

এরপর আর কার কী বলার থাকতে পারে? ফাতেমা বই দেখেই একটা নিয়ে উল্টাতে শুরু করে দিল। ব্যাপার দেখে এক চোট হেসে নিলেন মিনহাজ: ‘ই ডা তো পড়ে দেহি, অই জিনাত, তুই পড়িস না বই?’

জিনাত মেঝের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল: ফাতুর মতন পড়তি অত মন টানে না আমার, আমি ইশকুল পাশ দিসি উডার ঠ্যালায় পইরে, এহন কলেজ ও যাই উ ডার ঠ্যালায় পইরে!’

‘তয় তোর ভালো লাগে কি করতি?’ প্রশ্ন করলেন মিনহাজ।

জিনাত কিছু বলার আগেই উত্তর দিয়ে দেয় ফাতেমা: ‘ঐ তি পাক করে মেলা মজা কৈরে, আবার কোরআন ও সুন্দর পড়বার পারে, আমি ওর মতন পারি না।’

খুকুর হাতের পুতুলটার দিকে চোখ যায় মিনহাজের: ‘এই ডা আবার কিডা রে?’

‘ও মিনু, আমার মাইয়া। মিনু রে ফাতু বু বানায়ে দেসে।’

মিনু নামটা শুনেই যেন চমকে উঠলেন মিনহাজ...মিনু! তবে পরক্ষণেই সামলে নিলেন নিজেকে।

‘আরে ফাতেমা তুই এত্ত সুন্দর সিলাইতি পারিস? মাশা আল্লাহ!’

‘অই জিনাত, তুই পারিস সিলাইতি?’

জিনাত লজ্জা পায়: ‘না গো স্যার, আমি বলে সুই ধরলি হাত কাঁপায়ে ফালাই, সিলামু ক্যামনে? এসব তো উডার কাম!’

খানিক ভাবলেন মিনহাজ হোসেন: ‘ফাতেমা, তুই খেতা (কাঁথা) সিলাইতি পারবি মণিগে জন্নি?’

ঘাড় নাড়ে ফাতেমা: ‘জে স্যার, পারমু।’

মিনহাজ বলেন: ‘তুই তয় ক ডা খেতা বানাবি, আর এই রহম ক ডা মিনু, লিনু, ছিনু। আর জিনাত তুই কিসু পাক করিস। এই সব নিয়া এই সপ্তার হাটে বইবি তুরা।’

আনোয়ার মিয়া এখন একটু ভয় পান: ‘ফাতেমা মাইয়াডা পড়তি এত ভালোবাসে, অয় কলেজ যাবারই তো ঠিক কৈরে পারে না। মানশি হাজার কতা কয়, তায় আবার হাটে...’

এবার বিরক্ত হন মিনহাজ: ‘আরে ধুত্তরি তোর কথা! মানশির কতো রোগ থাহে, কারো মাসে মাসে রক্ত নিতি হয়, আবার কেউ মি ডাই খাবার পারে না, উ ডা ও রোগ, জানিস? ই রা কি কাম করে না রে?’

আনোয়ার মিয়া তবু বলেন: ‘আব্বাস মেম্বার আর তার ব্যাটা ও তো চুপ আসে, হুট কৈরে না জানি কি করবি!’

জবাবে হাসেন মিনহাজ: ‘ওই আব্বাস মেম্বারে কেবল পারে পিসে ত্তে ছুরি মারতি! উ ডা রে আমার তে ভালো কেউ চেনে না রে। লাগলি তুরা আব্দুল করিমেরে লাগা কামে।’

এই বুদ্ধিটা সবারই মনে ধরে। সে দিন স্যার এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজেদের পুরোনো ওড়না আর মায়েদের শাড়ি দিয়ে কাঁথা সেলাই করতে বসে ফাতেমা। কিছু পুতুল ও বানায় মিনুর মতো। জিনাত আচার, নারকেলের চিড়া, আলুর পরোটা এ ধরনের কিছু নাশতা বানিয়ে রাখে।

ঠিক হলো, সামনের রোববার স্কুলের মাঠে বসা সাপ্তাহিক হাটে এসব জিনিস নিয়ে বসবে আব্দুল করিম। আসলে এই হাটে মেয়েরা কেবল জিনিস কিনতে আসতে পারে, বেচতে নয়।

খুকু ও খুব খুশি, সে সবকিছু দেখে থেকে থেকে কেবল হাট হাট করে চলেছে।

শনিবার রাতে হারিকেনের আলোয় পড়তে বসেছে জিনাত। জানালার নিচে, বুবুর পাশে বসে অ আ লেখা শিখছে খুকু। হঠাৎ জানালার শিক গলে ছলাত করে কী যেন পড়ল ঘরে, সোজা খুকুর গায়ে।

হতভম্ব জিনাত কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখতে পেল কাটা কবুতরের মতো ছটফট করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়ার আগে একটা শব্দই বেরোল ছোট্ট খুকুর বুক চিরে: ‘বু উ উ উ উ ...।’

*মিনু নামটা শুনে কেন চমকে উঠেছিলেন মিনহাজ হোসেন? আব্বাস মেম্বার সম্পর্কে কি জানেন তিনি? ঘরে পড়ল কি? কী হলো খুকুর? জানবেন পরের পর্বে। চলবে...

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন