default-image

আজ ভয় হয় টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখতে ৷ ভয় করে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাতে। না জানি আজ কোন অসুন্দর দেখে আমায় আঁতকে ওঠায়, আজ কোন নবজাতক টের পেয়ে যায়, জন্ম নেওয়ার আগেই বুঝে ফেলে কী ঘটছে তার মাতৃভূমিতে। বুঝে ফেলে, যে মাতৃভূমিতে তার জন্ম হতে চলেছে, সেখানে হয়তো পৃথিবীর আলো দেখার আগেই অনেককে চলে যেতে হচ্ছে ৷ তাই ভয় করে মানুষ নামক জীবের হাতে ঘটা কোন অসুন্দরে চোখ রাখতে। কিন্তু চোখ না রাখলেও মনের চোখও এখন আর কোনো সুন্দরের প্রতিচ্ছবি কল্পনায় আনতে পারে না।

সুন্দরগুলো কেন জানি অসুন্দররূপে ধরা দেয়। সুন্দরগুলো কেমন মূক হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, সব সুন্দর তার ভাষাজ্ঞান খুইয়ে ফেলেছে। কবিতার পাতাগুলো আর ঝংকার তুলছে না। কবিতাগুলো আজ আর কবিতাই মনে হয় না। কবিতাগুলোকে মনে হয় একেকটি মৃত্যু উপত্যকার মতো। তাহলে আমাদের চারপাশের সুন্দরগুলো কি শুধুই অসুন্দরে ভরে গেছে? কবিতার ভাষাগুলো কি ছেয়ে গেছে কেবলই স্বজন হারানোর বেদনায়?

আমাদের সুন্দর মাতৃভূমির সব সুন্দর কি এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে? আজ কেন কল্পনায় আসে শুধু পোড়া গন্ধ? জীবন্ত পুড়ে যাওয়া মানুষের গন্ধ। স্মৃতিতে ভাসে শুধু পুড়ে যাওয়া শিশুর লাশ, সন্তানহারা মায়ের আহাজারি, অগ্নিশিখার ধ্বংসাত্মক রূপ। কোথায় গেল আমার সুন্দর শ্যামলিমার শ্যামল রূপ? এর মধ্যে কি কোনো সৌন্দর্য আছে? না, নেই। কোন সৌর্ন্দযই থাকতে পারে না। রয়েছে শুধুই বীভৎসতা, কদর্যতা আর মানুষ নামক জীবের অসুন্দর রূপ।

তবু বলব, এখনো অসুন্দরের থেকে সুন্দরের আধিক্যই আমাদের মধ্যে বেশি। আমাদের মধ্যে থেকে দেশপ্রেম একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। আমরা সবাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুন্দর দেশ উপহার দিতে চাই। আর এটা কোনো অলৌকিক চাওয়া বা স্বপ্ন নয়। দেশে এখনো দেশপ্রেমিকের সংখ্যাই বেশি, ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি, সুন্দরের আধিক্যই বেশি। প্রয়োজন শুধু সবাই একজোট হয়ে সোচ্চার হওয়ার। 

আমরা কেউই চাই না আমাদের পরিচয় একটি তালেবান বা জঙ্গি রাষ্ট্রের মতো হোক। বিশ্বের বুকে আমাদের পরিচয় দাঙ্গা-হাঙ্গামা আর বোমাবাজির দেশ হিসেবে পরিচিত হোক। জাতি হিসেবে আমরা কেউই চাই না বিদেশের মাটিতে মাথা নিচু করে থাকতে। সুন্দরের আভা দিয়ে আমাদের অসুন্দরটুকুকে সুন্দরে রূপ দিতেই হবে। তবেই তো সুন্দরে ছেয়ে যাবে আমাদের দেশ।
কিন্তু এ সুন্দরের মাঝে অসুন্দরের আরেকটি রূপ ষড়যন্ত্রের একটা লুকোচুরি চলছে না তো? আন্তর্জাতিক রাজনীতি আমি বুঝি না, আর বুঝতেও চাইও না। আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ। আমি এটুকু বুঝি, সেটা হচ্ছে আমার মাতৃভূমির মঙ্গল। আজ যদি আমরা অন্য মুসলিম দেশগুলোর দিকে তাকাই সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক নিজেরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে পরিশেষে কী পেয়েছে? পেয়েছে মৃত্যু, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, প্রিয়জন হারানোর বেদনা আর চোখের সামনে প্রিয় মাতৃভূমির ধ্বংসাত্মক রূপ। আর তাদের এ লড়াইয়ের পেছনে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না তো?

default-image

আমরা নিশ্চয়ই কেউই চাই না আমাদেরও ভাগ্যে জুটুক সেই একই পরিণাম। একটি দেশ, একটি জাতি ধ্বংসের জন্য অন্য কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। জাতিগত দ্বন্দ্বই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। দেশের স্বার্থে যখন সবাই এক থাকে, তখন কখনোই কোনো পরাশক্তিই প্রবেশ করতে পারে না, জয়ী হওয়া তো আরও পরের কথা। অন্তত এই একটি স্বার্থে আমাদের এক হওয়া উচিত। আমরা তো জাতি হিসেবে মেধাহীন নই। তুলনা করলে আমরা অন্য কোনো জাতির তুলনায় অনেক বেশি মেধাবী। এই দেশেই তো জন্ম নিয়েছে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন বলিষ্ঠ নেতা, একজন নোবেলজয়ী ইউনূস, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, খ্যাতিমান স্থপতি এফ আর রহমানের মতন মেধাবীরা। মেধায় তো আমরা পিছিয়ে নেই ৷ তবে আজ এই মেধা কি আমরা শুধুই অসুন্দরের জন্য ব্যবহার করব?
যখন নিজের স্বার্থকে দেশের স্বার্থে একটি জাতি কল্পনা করতে পারে না, সেই জাতি কোনো দিনও উন্নতি করতে পারে না। যখন বিশ্বের অন্য দেশগুলো নিজেদের সবদিক থেকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাচ্ছে, তখনও আমরা লড়াই করছি নিজেরা নিজেদের মধ্যে। দেশের স্বার্থ হানি করে কি কখনো দেশের স্বার্থ উদ্ধার হতে পারে? এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যখন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে পারমাণবিক ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর উন্নতির স্বাক্ষর রেখেই যাচ্ছে, সেখানে আমরা এখনো নিজেরা নিজেদের পুড়িয়ে মারছি। রক্ত ছাড়া কি প্রতিবাদের কোনো ভাষা আমাদের জানা নেই। নাকি রক্তহীন, মৃত্যুহীন প্রতিবাদের কোনো মূল্যই আমাদের কাছে নেই। আজ যদি সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাকের দিকে তাকাই, সেখানে শুধু মানুষের আহাজারি আর কান্নার রোল ছাড়া কিছুই নেই। যে লড়াই একটি দেশকে ধ্বংস করে ফেলে, সেসব লড়াইয়ের আদত কি কোনো মূল্য থাকতে পারে? আমরা কেউই আমাদের দেশকে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়ার মতো অবস্থায় কোনোভাবেই দেখতে চাই না। আমরা বাংলাদেশের নাগরিকেরা যদি এখনও আমাদের কণ্ঠ উঁচিয়ে না তুলি, তাহলে হয়তো একদিন আমাদেরও সেই পরিণতি দেখতে হবে।
স্বাধীনতার পর থেকে আমরা একটু একটু করে অনেক দূর এগিয়েছি ৷ আমরা আর পেছনে ফিরে তাকাতে চাই না। আর বিশেষ করে যাঁরা জীবন ও জীবিকার তাগিদে বিদেশের বুকে পাড়ি জমিয়েছেন, তাঁদের প্রথম পরিচয়ই তো একটি দেশ। আর যখন একজন নাগরিক একটি উন্নত, শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রের হয়, তখন তার দিকে বিদেশিরাও চোখ নিচু নয়, উঁচু করেই তাকায়। আর আমরা যারা বাইরে থাকি, আমরা সবাই চাই আমাদের দিকে অন্যরা চোখ নিচু নয়, উঁচু করেই তাকাবে। যদি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কথা বলি, তাদের চলচ্চিত্র, কালচার, ক্রিকেটের কারণে খ্যাতি এখন বিশ্বজুড়ে। তারা খুব গর্ব করে বলে, আমি ভারতীয়। ভারতীয়দের সঙ্গে আমাদের চেহারার মিল থাকায় অনেকে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসে পরিচিত হতে, আবার অনেকেই দেখে গেয়ে ওঠে বলিউডের কোনো মুভির জনপ্রিয় গান।
আমরা চাই আমাদের দেশও বিদেশে স্বনামধন্য একটি দেশ হিসেবে পরিচিতি পাক। আমাদেরও গর্ব করার মতো অনেক বিষয় আছে। তবে আজ কেন আমরা সেগুলোকে পায়ে ঠেলে দেব। আজ কেন অসুন্দরের জয় হবে? সুন্দরের জয়ই তো চিরকাল হয়ে এসেছে। সব স্বার্থকে পেছনে ফেলে আজ একটি স্বার্থে, দেশের স্বার্থে এক হতে পারলে আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে কোনো অসুন্দরই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। সোনার বাংলা আবারও ছেয়ে উঠবে সোনায়। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিচয় হবে একটি সবুজ, সুন্দর দেশের নাগরিক হিসেবে। আমরা বুক উঁচিয়ে বলব, আমি ভারতীয় নই, আমি পাকিস্তানি নই, আমি বাংলাদেশি। দেশ আমার বাংলাদেশ, ভাষা আমার বাংলা। আমি গর্বিত বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে। এই সুন্দরের স্বপ্ন শুধু আমার নয়, আমার, আপনার, আমাদের সবার৷

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন