default-image

রক্ত, মাংস আর হাড় দিয়ে তৈরি আমি ব্যক্তিটা বড়ই এক জটিল মেশিন। যখন আমার সবকিছু ভালো যায়, তখন আমি সুস্থ। সুস্থতা সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া আমাদের সবচেয়ে বড় একটি নিয়ামত। সুস্থতা যে কত মূল্যবান, তা কখনোই অনুধাবন করতে পারি না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা অসুস্থ হই। অসুস্থতা আমরা কেউই কামনা করি না। তবুও আমরা অনেক সময় অসুস্থ হয়ে যাই। এই আমি ব্যক্তির যখন কোনো কিছু ঠিকমতো কাজ করে না, তখন আমি হয়ে যাই অসুস্থ।

সুস্থতা ও অসুস্থতাকে আমরা একই কম্পাসের দুটি চরম প্রান্ত হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। এ লেখায় আমি যে বিষয় নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করতে চাই, তা হলো কীভাবে সুস্থতা ও অসুস্থতা কম্পাসের সুস্থতার প্রান্তে থাকতে পারি? সুস্থতা বা স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অনেক জ্ঞানী–গুণী ব্যক্তি অনেক সংজ্ঞা দিয়েছেন। সেই সংজ্ঞাগুলো পর্যালোচনা করা মোটেও এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। এ লেখায় সুস্থতা বলতে আমি এমন এক অবস্থা বুঝাতে চাই, যেখানে আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো ও আনন্দ বোধ করব, কর্মোদ্দীপনা পাব, যেকোনো বয়সে সৃষ্টিশীল থাকব এবং যতটা সম্ভব রোগ প্রতিরোধ করতে পারব। আলোচনায় আরও প্রাধান্য পাবে, কীভাবে আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত সুস্থতা অর্জন করার চেষ্টা করতে পারি এবং তাকে ধরে রাখতে পারি।

সবার আগে আমাদের একটা কথা গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখতে হবে, ব্যক্তির সুস্থতা কিন্তু শুধু ব্যক্তির নিজের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ব্যক্তির সুস্থতা তার নিজের, পরিবারের, কর্মক্ষেত্রের এবং সর্বোপরি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যে দেশের মানুষ যত বেশি সুস্থ, সে দেশের মানুষের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদানও তত বেশি। আসুন, আমরা সবাই সুস্থ থাকার চেষ্টা করি, যাতে জাতীয় অর্থনীতিতে বেশি করে অবদান রাখতে পারি। সুস্থতা উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক। উন্নত হতে হলে আমাদের সুস্থ হতে হবে।
আমাদের স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও অসুস্থতা আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পদ। জীবনের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত এটা আমাদের নিজেকেই বহন করতে হয়। এটা অন্য কাউকে বহন করতে দেওয়া যায় না, অন্য কেউ বহন করতে পারেও না। অসুস্থতার ফলে আমরা যেমন অনেক সময় অন্যের বোঝায় পরিণত হই, যেমন পরিবার-পরিজন। অন্যদিকে আবার সুস্থতার জন্য অনেকের আনন্দের পাত্রও হতে পারি, বিশেষ করে একান্ত আপনজনদের—জীবনসঙ্গী ও সন্তানসন্ততির। অসুস্থতার যেমন অনেক কারণ আছে, একই ভাবে সুস্থতারও অনেক কারণ আছে। সুস্থতা ও অসুস্থতা বলতে গেলে দুটিই অনেকটা অর্জিত। কখনোই এ দুটি সম্পূর্ণভাবে প্রাপ্ত নয়। অর্জিত সুস্থতার সঙ্গে অসুস্থতা বিতাড়নের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। এটা অন্য ভাবেও বলা যায়, যেমন আমরা যত বেশি সুস্থ থাকব, ততই কম অসুস্থ থাকব। আবার এর বিপরীতটাও সত্য—যত বেশি অসুস্থ থাকব, তত কম সুস্থ থাকব। আর এ জন্যই এ লেখায় যে বিষয়টি আমি প্রাধান্য দিব, তা হোল কীভাবে সুস্থতা অর্জনের মাধ্যমে অসুস্থতাকে বিতাড়নের চেষ্টা করা যায়।

ব্যক্তির সুস্থতায় অনেক কিছুই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। সুস্থ থাকার জন্য আমি চরম ব্যায়ামের বা ডায়েটিংয়ের ব্যাপারে এখানে আলোচনা করব না। এ আলোচনায় সাধারণত সুস্থ থাকার দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধন্য পাবে। সুস্থ থাকার জন্য যা অনেকেই অনুসরণ করতে বা পালন করতে পারবে। এ আলোচনা প্রথমেই শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করা দিয়ে শুরু করতে পারি। শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি জরুরি, বিশেষ করে (১) করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের কথা মাথায় রেখে এবং (২) আমাদের কাজের প্রকৃতির পরিবর্তনের জন্য। শরীরচর্চা বা ব্যায়ামে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে, যা করোনার সংক্রমণ এবং তা থেকে রক্ষা পওয়ার জন্য অতীব জরুরি।

default-image

অতীতে বেশির ভাগ কাজ ছিল কায়িক পরিশ্রমনির্ভর আর এখন তার বেশির ভাগই করতে হয় মাথা খাটিয়ে এবং কম্পিউটার ব্যবহার করে। কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে থাকতে হয়। মনে রাখবেন, শুয়ে থাকার চেয়ে বসে থাকা ভালো, বসে থাকার চেয়ে আবার দাঁড়িয়ে থাকা ভালো, এমনই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে হাঁটা ভালো, অনেক সময় আবার হাঁটার চেয়ে দৌড়ানো ভালো। আর সবচেয়ে ভালো শোয়া, বসা, দাঁড়ানো, হাঁটা ও দৌড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। মোদ্দা কথা, আমাদের যতটা সম্ভব নড়াচড়া ও চলাফেরার মধ্যে থাকতে হবে, যাতে আমাদের রক্ত সঞ্চালন ভালো থাকে এবং বিপাকক্রিয়া ভালো হয়। রক্ত সঞ্চালন ও বিপাকক্রিয়া ভালো হলে আপনার হৃৎপিণ্ড ভালো থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সম্ভাবনাও অনেকটা কমে যাবে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের জীবনটা মূলত সময়ের সমষ্টি। এতে রয়েছে সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস ও বছর। দিনরাত মিলে হাতে আসে ২৪ ঘণ্টা সময়—এর বেশিও নয়, আবার কমও নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা সাধারণ পরিস্থিতিতে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার সুপারিশ করে থাকে। তাই আট ঘণ্টা কাজ করুন, সৎভাবে জীবিকা অর্জনের জন্য এবং স্বাভাবিকভাবে বাঁচার জন্য প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা ঘুমান, আর বাকি ৮ ঘণ্টা নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজসেবা ও শরীরচর্চায় কাটান। দেখবেন, জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে, আপনি ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।

দেহ যন্ত্রকে যত নড়াচড়া করানো যায়, দেহ যন্ত্রের কর্মক্ষমতাও ততই বেড়ে যায়। কর্মের প্রকৃতি, জীবন ধারণের ধরন এবং খাদ্যের জন্য আজকাল সহজেই আমরা অনেক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছি, তার মধ্যে ডায়াবেটিস ও মেদবহুলতা অন্যতম। বলতে গেলে ডায়াবেটিস ও মেদবহুলতা এখন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পাওয়া যাবে। এ দুটি জীবনকে বেশ জটিল করে দেয়, কমিয়ে দেয় কর্মক্ষমতা। ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে ও মেদবহুলতা হ্রাসে যেমন খাবার ব্যাপারে আপনাকে সচেতন হতে হবে, তেমনি শরীরচর্চায়ও মনোনিবেশ করতে হবে। যেহেতু ৩০ বছর বয়সের পর আমাদের শারীরিক গঠন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং ত্রিশ বছর বয়সের পর কার্বোহাইড্রেটের পরিবর্তে প্রোটিনের দিকে বেশি ঝুঁকতে হবে, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন একটি ভালো বিকল্প হতে পারে প্রাণিজ প্রোটিনের চেয়ে।

প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে লক্ষ রাখতে হবে যে কী খাচ্ছি, কতটুকু খাচ্ছি এবং কোথায় খাচ্ছি। মনে রাখবেন বাড়ির তৈরি খাবার সব সময়ই বাইরে থেকে কেনা খাবারের তুলনায় অনেক উত্তম। সকালের নাস্তা একটু বেশি করে খান, দুপুরের খাবারের ব্যাপারে একটু সংযত হোন এবং খাবার সারুন বেলা দুইটার আগেই। রাতের খাবারের প্রতি দৃষ্টি দিন, রাতে ভরা পেটে ঘুমাতে যাবেন না। রাতের খাবারটা হতে হবে হালকা এবং খাবার সেরে নিন রাত আটটার মধ্যে। সুস্থ থাকার জন্য খাবারে তিনটা জিনিস যতটা কম পারেন ব্যবহার করুন—তেল, লবণ ও চিনি। তবে ভালো তেল কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের জন্য ভীষণ দরকার, যেমন মাছ ও জলপাইয়ের তেল। লাল মাংস যতটা কম খাওয়া যায়, ততই ভালো, বিশেষ করে ৪০ বছর বয়সের পর।

খাদ্য ছাড়া আমরা যেমন বাঁচতে পারি না, তেমনি শরীরচর্চাও জীবনের নিত্যদিনের অবিচ্ছেদ্য অভ্যাসে পরিণত করা উচিত। এই লেখা সাধারণ মানুষের জন্য, তাই বলছি না যে আপনাকে জিমে গিয়ে প্রতিদিন শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করতে হবে। শরীরচর্চা যেকোনো স্থান থেকে, যেকোনো সময় করা যেতে পারে। শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের অংশ হিসেবে আপনি সপ্তাহের দিনগুলোকে ভাগ করে নিয়ে বাইসাইকেল চালানো, হাঁটা, দৌড়ানো, যোগব্যায়াম, ভার উত্তোলন এবং কিছু খেলাধুলা করতে পারেন। লক্ষ রাখতে হবে, প্রতিদিন যেন অন্ততপক্ষে ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করা হয় এই ‘আমিকে’ সুস্থ রাখার জন্য।

default-image

খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চার সঙ্গে জীবনধারায়ও পরিবর্তন আনতে হবে ব্যক্তিগত সুস্থতার নিমিত্তে। জীবনধারায় পরিবর্তন অনেকভাবে আনা যেতে পারে। ধরুন, কর্মস্থলে আপনি দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে কাজ করেন, এর পরিবর্তে আপনি কিছু সময় বসার পর একটু হাঁটাহাঁটি করতে পারেন বা কোনো কোনো সময় সম্ভব হলে দাঁড়ায়েও কাজ করতে পারেন। ধরুন, আপনি অফিস থেকে বাসায় ফিরে দীর্ঘ সময় টিভি দেখেন অথবা সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যান, এর পরিবর্তে আপনি অফিস থেকে ফিরে বাইরে হাঁটতে যেতে পারেন একা বা আপনার গোটা পরিবার নিয়ে। ধরুন, আপনি রাত ১১টায় খাবার সেরে সোজা ঘুমাতে যাচ্ছেন, এর পরিবর্তে আপনি রাত ৯টার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করেন, পরিবারের সবার সঙ্গে একটু গল্পগুজব করে ঘুমাতে যান। এমন কতভাবেই না আমরা জীবনধারায় পরিবর্তন আনতে পারি। এতে প্রথমেই যা দরকার, তা হলো একটু ইচ্ছা। মনে রাখবেন, আনন্দগুলো অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করলে তা অনেক গুণ বেড়ে যায়। একইভাবে দুঃখগুলোও আপন জনের সঙ্গে শেয়ার করলে দুঃখের ভার অনেকটাই কমে যায়। আনন্দ ও দুঃখ যেমন এ জীবনের দুটি অংশ, ঠিক তেমনই সুস্থতা ও অসুস্থতাও। সুস্থতাকে আমরা অর্জন করার চেষ্টা করতে পারি খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা ও জীবনধারায় পরিবর্তন আনার মাধ্যমে। আসুন, সুস্থতা অর্জনে আমরা সবাই উদ্যোগী হই।
*লেখক: ড. কাজী ছাইদুল হালিম, শিক্ষক ও গবেষক

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন