সে আমাদের ছোট বোন

বিজ্ঞাপন
default-image

যদিও দেশ ছেড়ে বিদেশ–বিভুঁইয়ে আসার সময় অনিশ্চিত এক জীবনের দোলাচলে দুলতে থাকে প্রায় প্রতিটি মানুষ। কিন্তু সেই সঙ্গে দুই চোখভরা স্বপ্ন এবং বুকভরা আশাও তো থাকে। থাকে সুন্দর একটি জীবনের হাতছানি। এই আশা এবং স্বপ্ন কেবল নিজে ভালো থাকার স্বপ্ন নয়, গোটা পরিবারকে ভালো রাখার স্বপ্ন। সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে পরিবারের সদস্যদের হাত ধরে একটু একটু করে ওপরে তুলে আনার স্বপ্ন। কঠোর পরিশ্রমের মাঝে অতিবাহিত সংগ্রামী এই প্রবাসজীবনে সেই স্বপ্ন যদি সত্যিই বাস্তবে রূপ নেয়, তবেই যেন আমাদের দেশ ছেড়ে, স্বজনদের ছেড়ে ভিন দেশে আসার কষ্ট অনেকখানিই লাঘব হয়!

বলছিলাম আমাদের এক বন্ধুর কথা। যিনি নিউইয়র্কে এসেছিলেন সেই টিনএজ বয়সে, সদ্য এইচএইচসি পাস করে। জীবন আর কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকার তাগিদে একটু একটু করে নিজের পায়ের নিচের নরম মাটিকে শক্ত করেছেন। প্রবল প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে উঠে দাঁড়িয়েছেন। কাজ, পড়াশোনা আর দেশে রেখে আসা পরিবার, অর্থাৎ মা–বাবা, ভাইবোনের দেখভাল, এই তিনটি একসঙ্গে চালিয়ে নেওয়া একা একজন মানুষের জন্যে চাট্টিখানি কথা নয়!

default-image

সময়টা ছিল গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। এই শহরে আমাদের তখন ‘কোথাও কেউ নেই’ এর সময়। মনের গহিন কোণে চেনা আপনজন খুঁজে বেড়ানোর সময়। আমাদের বন্ধুদের অনেকেরই যখন কোনো পিছুটান ছিল না, কিংবা থাকলেও তা দায়সারাভাবে নিয়েছি, সেই সময়ে তিনি পুরো পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়, বিবেকের তাড়নায়, পরিবারের প্রতি অন্তহীন ভালোবাসায়। একটু গুছিয়ে উঠে মা–বাবাকে এ দেশে এনেছেন। ধীরে ধীরে একে একে ভাইবোনদের এনেছেন। যদিও এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছিল, তবু এই ২০১৯ সালের শেষের দিকে এসে বলতেই হয়, আজ থেকে দুই যুগ আগে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক তরুণকে যে সুন্দর জীবন হাতছানি দিয়েছিল, তা একটি সফল যুদ্ধজয়ের অনুকরণীয় গল্প হয়ে উঠেছে। জীবনের নানান চড়াই-উতরাই আর দীর্ঘশ্বাসের দীর্ঘ রজনী শেষে সাফল্যের সেই গল্প না হয় অন্যদিনের জন্যে তোলা থাক।

default-image

আমাদের সেই বন্ধুর ছোট বোন, প্রবাসেই যাঁর শিক্ষা এবং বেড়ে ওঠা, আজ না হয় তাঁর গল্প বলি। বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবারের বড়দের মতামতকে সম্মান প্রদর্শন, দেশীয় ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি নিয়ে অনেক নিরাশার মাঝে আশার গল্প বলি।

পরিবারের পছন্দ করা পাত্রের সঙ্গে নিজের পছন্দ মিলিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ছোট বোনের বিয়ের দিনতারিখ ধার্য হয়। আমরা বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষীরা আনন্দিত হয়ে উঠি এ ভেবে যে, এই প্রথম আমাদের একান্ত কাছের, নিজের কারও বিয়ের আনন্দ উপভোগ করব বিদেশ–বিভুঁইয়ে। বন্ধুর ছোট বোন মানেই যে আমাদের সবার বড় আদরের ছোট বোন। বিয়ের অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে শহরে এবং শহরের বাইরে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা তাদের ভাইবোনদের পরিবারের সদস্যরা এক হয়েছে কদিন আগে থেকেই। ঘরময় দেশীয় আবহে উৎসব উৎসব পরিবেশ। আগের দিন মেহেদিসন্ধ্যায় কনের স্কুল-কলেজের বান্ধবীরা ঘর সাজায়। রাতভর গায়েহলুদের অনুষ্ঠান চলে। চলে গান-নাচ এবং খানাপিনা। পরদিন পার্টি হলে অনুষ্ঠিত হয় আকদ অনুষ্ঠান। দেশীয় স্টাইলে গেটে ফিতা ধরা, ডলার আদায় করা কিছুই বাদ যায়নি।

default-image

কনেকে আনা হলো স্টেজে বরের পাশে। চমৎকার সব সাজে সজ্জিত নারীরা। শেরওয়ানি এবং পাঞ্জাবি পরা পুরুষেরা। সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, যাঁর যাঁর মতো করে। কেউ বর-কনের সঙ্গে ছবি তুলছেন। কেউবা নিজেরাই নিজেদের মতো করে এখানে–ওখানে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। কেউ ভিডিও কলে দেশে থাকা স্বজনদের দেখাচ্ছেন, কেউ আলাপচারিতায় মগ্ন। রাতের খাবারের পর্ব শেষে বিদায়ের পালা।

বিদায় বিষয়টি চিরকালই মনকে, পরিবেশকে বিষণ্ণ করে তোলে। বিদায় মানেই মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে একটি মেয়েকে চলে যেতে হয় অন্য ঘরে, অন্য পরিবেশে। চিরকালের চেনা গণ্ডি ছেড়ে নতুন পরিবেশে নতুন মানুষদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যে কত বড় ত্যাগ তা কেবল সে-ই জানে, যে তার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। আমাদের ছোট বোন যখন একে একে ভাইবোনদের জড়িয়ে ধরে হৃদয় বিদীর্ণ করা কান্নায় ভেঙে পড়ছিল, আমার কেবলই মনে হচ্ছিল এ বিদায় জানানোর কথা ছিল মা–বাবার। অথচ মা–বাবা গত হয়েছেন খুব বেশি দিন হয়নি! তাই ভাইকেই অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে হয়েছে।

default-image

যে ভাই একদিন মা–বাবাসহ ছোট্ট বোনটিকে এই বিদেশ–বিভুঁইয়ে নিয়ে এসেছিলেন। এতগুলো বছর আগলে রেখেছিলেন। মা–বাবার মৃত্যুর পর বাবা এবং মায়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন। যে ভাই একে একে অন্য ভাইদেরও এই দূরদেশে এনে চমৎকার এক জীবনের সন্ধান দিয়েছেন। মধ্যরাতে বাড়ি ফেরার সময় কেবলই কানে বাজছিল সেই গানটি, যে গান এমন স্নেহশীল ভাইদের জন্যে রচিত হয়েছে, ‘সে আমার ছোট বোন, বড় আদরের ছোট বোন...।’ আসলেই, ভাইবোন সবারই ভাগ্যলিখন!

*রিমি রুম্মান: নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন