বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পর্ণা বলেন, ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে মায়ের রূপান্তর, সন্তানের হাত ধরে মায়ের যুদ্ধে প্রবেশ, ঘরের মায়ের রাজনৈতিক মা হয়ে ওঠা, মা-সন্তানের রাজনৈতিক-মানবিক সম্পর্ক মনে করিয়ে দেয় মহাশ্বেতা দেবীর আলোচিত উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’–এর মা চরিত্রটির কথা। দুটি বইয়ের প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা সত্ত্বেও মায়ের রূপান্তরসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে দুই মায়ের অন্তর্মিল আলোচনা করেন পর্ণা।
‘একাত্তরের দিনগুলি’ যে মা-সন্তানের স্মৃতিকথা ছাপিয়ে পরিপূর্ণভাবে মুক্তিযুদ্ধের দলিল হয়ে উঠেছে এবং ’৭১–এর ইতিহাস জানতে চাইলে এই বই যে অবশ্যপাঠ্য, তা উঠে আসে পর্ণার আলোচনায়। ১ মার্চ থেকে ১৭ ডিসেম্বরজুড়ে বইয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, মিডিয়ার ভূমিকা, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অত্যাচার, গণহত্যা, গেরিলাযুদ্ধ, সীমান্তে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ, বুদ্ধিজীবী হত্যা, বইয়ের অসংখ্য চরিত্রের মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ততা এসব নিয়ে বলেন তিনি এ পর্যায়ে। আরও বলেন, বইজুড়ে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ আরও অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য করেছে বইটিকে।
আলোচক তামান্না মাকসুদ পর্ণা ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে সমান্তরালে দুটো গল্প-ঘরের গল্প ও যুদ্ধের গল্প কিংবা ঘরের যুদ্ধ ও বাইরের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় উল্লেখ করেন জহির রায়হানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজনৈতিক উপন্যাস ‘ঘরে বাইরে’র কথা।

রুমীদের ঘরে যুদ্ধ প্রবেশ করলে, মুক্তিযুদ্ধে পরিবারের সম্মিলিত প্রয়াস বলতে গিয়ে পর্ণা রুমীর বাবা শরীফ ইমাম এবং রুমীর ছোট ভাই জামীর ভূমিকা তুলে ধরেন। এ পর্যায়ে পর্ণা বইটির প্রথম পাঠ ও এখনকার পাঠের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে বলেন, এ যেন অনেকটা প্রিয় শহর কিংবা প্রিয় কবিতা-গানের কাছে ফেরা। বইটিকে নতুন করে নির্মাণ, বইয়ের সঙ্গে নিজের যোগসূত্র আবিষ্কার এবং গোটা বইটিকেই পুনরাবিষ্কারের বিষয়টি বিশদভাবে তুলে ধরেন তিনি।

তামান্না মাকসুদ পর্ণা বলেন, ‘একাত্তরের দিনগুলি’ শুধু পিরিয়ড পিস বা সময়ের দলিল না। তাহলে মুক্তিযুদ্ধও কারাবন্দী হয়ে পড়ে। এটি সময়কে অতিক্রম করে গেছে অনেকটাই। এটি সময়ের দলিল এবং চিরকালীনতার হাত ধরে সমকালীনও। এই বই সব সময়ের বই। বইয়ের একদম শেষে রুমীর ভাই জামীর হাতে স্টেনগান তুলে দেওয়া যেন প্রতীকীভাবে বহমান যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়। পর্ণা বলেন, ’৭১–এর ঘাতক দালালদের শাস্তির দাবিতে শাহবাগ চত্বরের গণজাগরণ আন্দোলন জাহানারা ইমামদের কর্মের লিগ্যাসি। এবং এখনকার সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে যারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁদের অনিবার্য পথনির্দেশিকা হয়ে ওঠে ‘একাত্তরের দিনগুলি।’ সবশেষে তিনি বলেন, এই বই সন্তানহারা মায়ের শোকগাথা ছাপিয়ে দিন শেষে পুরোপুরি আশা-জাগানিয়া একটি বই।

আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র, শহীদ রুমীর ছোট ভাই সাইফ ইমাম জামী প্রথমেই বইটির লেখক মা জাহানারা ইমামের বইয়ের প্রস্তুতিপর্ব ও সে সময় নিজের সম্পৃক্ততা তুলে ধরেন। জামী বলেন, ‘একাত্তরের দিনগুলি’র প্রথম সংস্করণের কপি নিজে লিখে পুত্র জামী ও পুত্রবধূ ফ্রিডার হাতে তুলে দেন মা জাহানারা ইমাম ১৯৮৬ সালের মার্চে। সেই বইটি আসরের দর্শকদের দেখানো হয়। উল্লেখ্য, জামী ১৯৭৪ সাল থেকে স্থায়ীভাবে বাস করছেন আমেরিকার মিশিগানে এবং মা জাহানারা ইমাম তখন ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে আমেরিকায় জামীর বাসায় যান।

‘একাত্তরের দিনগুলি’ পড়ে আমরা জানতে পারি, রুমী-জামীদের পারিবারিকভাবে একটা মুক্ত পরিবেশ ছিল। সব ক্ষেত্রেই একটা প্রাগ্রসরতা ও অগ্রসর ভাবনার প্রতিফলন দেখতে পাই আমরা। এই ক্ষেত্রে মায়ের শিক্ষা, রুচিবোধ ও সার্বিক ভূমিকা তুলে ধরেন জামী তাঁর আলোচনায়। বই থেকে রুমী চরিত্রটি একভাবে নির্মিত হয় আমাদের অর্থাৎ পাঠকের কাছে। আর জামী তুলে ধরেন আরেক রুমীকে, যার সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন জামী নিজে।

জামী বইটির প্রথম পাঠ এবং পুনঃপাঠের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, পড়তে গিয়ে অনেক কষ্ট হলেও প্রতিবছর মার্চ মাসে তিনি বইটি হাতে তুলে নেন। এ পর্যায়ে তিনি তাঁকে স্পর্শ করে যাওয়া, আন্দোলিত করা, ব্যথিত করা বইয়ের নানা অংশ থেকে সুখ-দুঃখজাগানিয়া স্মৃতি নিয়ে আলোকপাত করেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে উঠে আসে ভাইয়া রুমীকে (সঙ্গে জামী, রুমীর বাবা, রুমীর চাচাতো ভাই মাসুম, রুমীর বন্ধু হাফিজ) ধরে নিয়ে যাওয়ার দিন থেকে দুই দিন, দুই রাতের দুঃসহ স্মৃতি, বাবাকে হারানোর দিনের কথা, ১৭ ডিসেম্বরে মায়ের সঙ্গে পতাকা তোলা এবং মেজর হায়দার তাঁদের বাসায় আসার স্মৃতি। জামীর কথায় যুগপৎভাবে উঠে আসে ভাই-বাবা হারানোর কষ্ট আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতা লাভের সুখস্মৃতি। জামী বলেন, এক ভাইকে হারিয়ে তিনি রুমীর সতীর্থদের পেয়েছেন ভাই হিসেবে। ভাই ও বাবা হারানোর পর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীরা তাঁকে আপনজন হারানোর ব্যথা ভোলাতে সচেষ্ট ছিলেন সব সময়।

default-image

রুমী-জামীর মা এক মা থেকে সবার মা হয়ে ওঠেন, আমরা জানি। এ পর্যায়ে জামী মাকে পুনরাবিষ্কারের গল্প শোনান। মা জাহানারা ইমাম কেন ক্যানসারাক্রান্ত অবস্থায়ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির দায়িত্ব নেন, সেটি ব্যাখ্যা করেন জামী। জামী ’৭১–এ দাঁড়িয়ে ‘একাত্তরের দিনগুলি’র বর্ণনায় ৭১, আর ২০২১–এ দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ অর্থাৎ ডায়েরির বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ, মাঝখানে সেতুর মতো শাহবাগ—এই নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন তুলে ধরেন। বর্তমান বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চ্যুতিতে তিনি যেমন বিচলিত, তেমনি আশাবাদীও নতুনদের নিয়ে। তিনি বলেন, ’৭১ ছিল একটা ফ্ল্যাশপয়েন্ট, আরেকটা ফ্ল্যাশপয়েন্ট শাহবাগ। ঠিক এমনিভাবে তরুণেরাই দেশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আরেক ফ্ল্যাশপয়েন্টের সূচনা করবে সময়মতো।

সবশেষে জামীর অনুরোধে, রুমীর খুব প্রিয় ‘গেরিলা’ কবিতাটা পাঠ করে শোনান ফারহানা আজিম শিউলী। ’৭১–এর আগস্টে মা-বাবার বিবাহবার্ষিকীর আগের রাতে রুমী এসেছিল মেলাঘর থেকে ঢাকার বাসায়। সেবারও মাকে পড়ে শুনিয়েছিল সে ‘গেরিলা’ কবিতা।

‘একাত্তরের দিনগুলি’ শুধুই একটি আত্মজৈবনিক দিনলিপি না। এই বই আমাদের অস্তিত্ব-সমগ্রতার অংশ হিসেবে স্থায়ী হয়ে আছে। এই বই একই সঙ্গে ঢাকার নাগরিক জীবন, আধুনিক বোধ, পরিবারময়তা, আদর, বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক প্রাগ্রসরতা, সামাজিক উদারতা, মানবিক অনুশীলন আর মহান মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান হয়েছে, হয়েছে চলমান মুক্তিযুদ্ধের সারথিও। এই বই এমন এক বিশ্বাসযোগ্য সমাজগদ্য হয়েছে, যা ঠিক এভাবে আর কোনো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আত্মজৈবনিক গ্রন্থে আমরা পাইনি। আদরে-আবেগে-চোখের জলে আমাদের বুকে আগলে রাখা ‘একাত্তরের দিনগুলি’ নিয়েই ছিল পাঠশালার এবারের আসর।

পাঠশালার এবারের আসরের বিষয়বস্তু হিসেবে পাঠকনন্দিত বই ‘একাত্তরের দিনগুলি’র নির্বাচন, আলোচক তামান্না মাকসুদ পর্ণার গভীর-প্রাণবন্ত-হৃদয়গ্রাহী আলোচনা, সময়ের সরণি বেয়ে অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া ‘একাত্তরের দিনগুলি’র অন্যতম চরিত্র সাইফ ইমাম জামীর আলোচনা, জামীর উপস্থিতি দর্শক-শ্রোতাদের আনন্দিত করেছে, উদ্বেলিত করেছে, করেছে আবেগময়ও। দর্শকদের অনেকেই মন্তব্য লিখে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সরবে উপস্থিত ছিলেন ভার্চ্যুয়াল এই আসরে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আয়োজিত পাঠশালার আসরের পরিকল্পনা, গ্রন্থনা ও সঞ্চালনায় ছিলেন ফারহানা আজিম শিউলী।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন